নাসিকা গর্জন

সত্যব্রত বড়ুয়া

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
51

কুম্ভকর্ণ নাকি ছ’মাস ঘুমাতো। বিরাট দেহী এই রাক্ষসটি নিশ্চয়ই এ সময় নাক ডাকতেন। এটাকে অনেক সময় আমরা নাসিকা গর্জনও বলে থাকি। ইচ্ছে করলে নাসিকা নাদও বলা যেতে পারে। আমরা যখন অনেকক্ষণ ঘুমাই তখন আমাদের কুম্ভকর্ণের সাথে তুলনা করা হয়। ছেলেবেলায় আমি মনে করতাম সুন্দরী মহিলারা নাক ডাকেন না। নাক ডাকেননা সিনেমার নায়িকারাও। আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিলো স্কুলের হেড মাস্টাররা কখনো নাক ডাকেন না। আমি এ পর্যন্ত কোনো পাগল-পাগলিকে ঘুমের মধ্যে নাক ডাকতে দেখিনি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো যারা নাক ডাকে তারা কখনো স্বীকার করেনা যে তারা নাক ডাকছেন। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। আমাকে একবার এক ভদ্রলোক খুব গর্বের সাথে বলেছিলেন তাদের পরিবারের নাক ডাকার ঐতিহ্য রয়েছে। তাঁর বাবাও ঠাকুরদাও নাকি নাক ডাকতেন। তিনি বিয়ের আগে বাবাকে বলেছিলেন যে, নাক ডাকা মেয়ে ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে তিনি বিয়ে করবেন না। তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ীই বিয়ে হয়েছিলো। আমি তাঁকে বললাম আমাকে এক কোটি টাকার লোভ দেখালেও আমি কখনো কোনো নাক ডাকা মেয়েকে বিয়ে করতাম না। তিনি হেসে বললেন তাদের ছেলে মেয়েরাও নাক ডাকে। সবার তাদের সুনিদ্রা হয়। আমি এমন কিছু স্বামী-স্ত্রী দেখেছি যারা একজন ঘুমের মধ্যে নাক ডাকলে অন্যজন ডাকেন না। আমি বুঝতে পারিনা এরা কিভাবে এক বিছানায় ঘুম যেতে পারেন। ছোটো থাকতে আমি আমার মা’র মুখে অনেক ভূত-পেত্নীর গল্প শুনেছি। তিনি কখনো বলেননি ভূত-পেত্নীরা ঘুমের মধ্যে নাক ডাকে। আমার মনে হয় মানুষ মরে ভূত হলে আর ঘুময় না। ভূত-পেত্নীরা তাই নাকও ডাকেনা। আমি নাক ডাকা মানুষ পছন্দ না করলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় নাক ডাকার কারণেই আমার প্রাণ রক্ষা পেয়েছিলো। এ সময় আমি গ্রামে থাকতাম। খান সেনারা মাঝে মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে গ্রামে এসে হানা দিতো। দুপুর বেলা আমি বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা মিলেটারি জিপ এসে ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। মিলেটারি দেখে ঘরের সবাই তাড়াহুড়া করে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলো। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বলে আর পালাতে পারলাম না। মিলেটারি এসে ঘরে ঢুকলো। আমি আওয়াজ পেয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলেও এমন ভাব দেখলাম যে আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, শুধু তাই নয় নাক ডাকাও শুরু করে দিলাম। কয়েকজন খান সেনা আমাকে ঘুম থেকে জাগাবার জন্যে আমার দিকে এগিয়ে আসতেই ওদের অফিসার জোরে চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘হল্ট্‌’। সৈনিকরা থেমে গেলো। অফিসারটি এগিয়ে এসে কান পেতে গভীর মনোযোগের সাথে আমার নাক ডাকা শুনলেন। তিনি আমাকে ঘুম থেকে না জাগিয়ে সেনাদের নিয়ে জিপে এসে উঠলেন। আমার ধারণা অফিসারটির ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার অভ্যেস রয়েছে। নাক ডাকার মর্ম তিনি বুঝেন বলেই আমাকে ‘ডিসটার্ব’ করেননি। আমি প্রাণ বাঁচানোর জন্যে জেগে জেগে ঘুমোলেও এমন কিছু মানুষ রয়েছে যারা ইচ্ছে করেই জেগে জেগে ঘুমোন এবং নাকও ডাকেন। এদের ঘুম কখনো ভাঙানো যায় না। থামে না ‘নাসিকা গর্জন’ও।

x