নারী রোগী ও পুরুষ চিকিৎসক বিষয়ক দু’চার কথা

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ২৯ জুন, ২০১৯ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ
29

একটি খবর বেশ কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। খবরটি আমার কাছে- একজন নারী হিসেবে- অনেক সাহস জাগানিয়া। আশা জাগানিয়াও বটে। কেননা, খবরটির বিষয় পুরনো হলেও এ নিয়ে অভিযোগ করার বিষয়টি ও অভিযুক্তের ‘শাস্তি নিশ্চিত’ করাটা কিছুটা বিরলই বলতে হবে- অন্তত: এই সময়ে- এই দেশে। উপরন্তু, বিষয়টি নিয়ে কথা বলার একটি ক্ষেত্র তৈরি হতে যাচ্ছে জেনেও ভালো লাগছে।
যাই হোক, কথা না বাড়িয়ে খবরটি বলা যাক। খবরটিতে বলা হয়, ‘ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী অভিযোগ করেছেন, মুখে ব্রণের সমস্যা নিয়ে তিনি একজন চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। রাজধানীর ‘প’ আদ্যক্ষরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গত ১৫ জুন শনিবার সকালে ওই চিকিৎসকের চেম্বারে যান। সে সময় তাকে ইনজেকশন দেয়ার সময় আপত্তিকর আচরণ করেন এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করছেন ওই তরুণী।
একপর্যায়ে তরুণী নিজেকে ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টার সময় চিকিৎসক তার গালের ইনফেকশন দেখার নাম করে গালে চুমু খান বলে অভিযোগ ওই নারীর। এরপর ওই তরুণী বাড়ি ফিরে তার বোনকে সব খুলে বলেন। ফোন করে চিকিৎসকের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি টেলিফোনে দুঃখ প্রকাশ করেন। বিকেলে হাসপাতালে গিয়ে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন ওই তরুণী’ (সূত্র: বিবিসি.কম, ১৭ জুন, ২০১৯)।
খবরে আরও বলা হয়- ‘…ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালটির মানবসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, অভিযোগটি পাওয়ার পরেই হাসপাতালের পক্ষ থেকে তদন্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।
অবশ্য পরে তিনি (ওই কর্মকর্তা) বলেছেন- “আসলে ঘটনাটির সময় অন্য কেউ ছিল না। তাই মেয়েটির অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি পুরো ঘটনা অস্বীকার করে বলেছেন, ‘এরকম কোন কিছুই সেখানে ঘটেনি’। তারপরেও অভিযোগ যেহেতু উঠেছে, তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি- ওই চিকিৎসকের চেম্বার আর এখানে থাকবে না।”
প্রকৃত প্রস্তাবে- এর আগেও বাংলাদেশে অনেক সময় চিকিৎসক বা হাসপাতালকর্মীদের বিরুদ্ধে নারী রোগীদের সঙ্গে অশালীন বা আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ ওঠেছে। কিন্তু দুঃশ্চিন্তার কথা হচ্ছে- এ থেকে প্রতিকারে কোনো সুনির্দিষ্ট বিধানই নেই- চিকিৎসকদের পেশাগত দিকগুলো তদারকি করা প্রতিষ্ঠান- ‘বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসি’র আইনে! আরও সুস্পষ্ট করে বলা যায়- বিএমডিসি’র চিকিৎসক নীতিমালায় চিকিৎসক ও রোগীদের সম্পর্কের কিছু নীতিমালা থাকলেও, যৌন হয়রানি বা বা নিপীড়নের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন নীতিমালা এখনও নেই।
বিএমডিসি’র নীতিমালায় যা বলা আছে তা হচ্ছে- ‘…চিকিৎসক ও রোগীদের পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস রক্ষার ওপর চিকিৎসক পেশা অনেকাংশে নির্ভরশীল, সুতরাং সেখানে পেশাদারী সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। এই সম্পর্ক যাতে কোনক্রমেই নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে চিকিৎসকদের সতর্ক থাকতে হবে।’ নীতিমালাটির কোড অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট, এটিকেট এন্ড এথিকসের ৫.১.৩-এ বলা হয়েছে, রোগীদের গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করা, অর্থনৈতিক বা অন্য কোনরকমের সুবিধা আদায় করা বা রোগী বা রোগীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোনরকম রোমান্টিক বা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা এই নীতি ভঙ্গের কারণ হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ‘…যে রোগী বা তার কোন স্বজনের সঙ্গে চিকিৎসকের পেশাদারী সম্পর্ক রয়েছে, তার সঙ্গে যেকোন ধরণের যৌন আচরণ অসদাচরণ বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে কাউন্সিল কঠোর ব্যবস্থা নেবে। অনেক সময় কাছাকাছি কাজ করার কারণে চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে চিকিৎসককে সতর্ক থাকতে হবে, যেন সেটা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ বা আস্থা ভঙ্গের পর্যায়ে না যায়। এ ধরণের কোন অভিযোগ যাতে না ওঠে, সেজন্য চিকিৎসকদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। কোন নারী রোগীকে যখন একজন পুরুষ চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন, সেখানে একজন নারী বা পুরুষ নার্সের উপস্থিতি থাকতে হবে।…’
কিন্তু এসব ভঙ্গ হলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা পরিষ্কার করা হয়নি ওই নির্দেশনায়। তবে ধর্ষণ বা গুরুতর অসদাচরণের জন্য প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। থানা বা আদালতে মামলা করার মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পেতে পারেন।
তবে আশার কথা হচ্ছে- বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রার ডা. মোঃ জাহেদুল হক বসুনিয়া বিবিসি’র ওই প্রতিবেদককে বলেছেন- ‘…বর্তমান পরিস্থিতি দেখে নিজেদের তাগিদ থেকেই কিছুদিন আগে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা ঠিক করবে, এ ধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলায় কী করা হবে, কীভাবে করা হবে। যেখানে শুধুমাত্র ডাক্তার ও রোগী থাকেন, সেখানে যখন এ ধরণের অপরাধের ঘটনা ঘটে, সেটা কীভাবে প্রমাণ করা হবে, কোন্‌ প্রক্রিয়ায় তদন্ত হবে, মানসিক বিশেষজ্ঞ থাকবে কিনা- সেসব এই কমিটিই ঠিক করবে।’
তিনি এও বলেন- ‘অনেক সময় রোগীদের এমন সমস্যা থাকতে পারে যেখানে চিকিৎসককে হয়তো তাদের স্পর্শকাতর স্থান দেখতে বা স্পর্শ করতে হতে পারে। কিন্তু সেটা যাতে কোনক্রমেই যৌন হয়রানি বা অশালীন না হয়, শুধুমাত্র চিকিৎসার প্রয়োজনেই হয়, সেটা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও তৈরি করতে হবে আমাদের’ (সূত্র: বিবিসি.কম, প্রাগুক্ত)।
পরিশেষে একজন নারী হিসেবে আমি চাই- আমরা চাই- এ ব্যাপারে বিএমডিসি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করুক। আবার ওই নীতিমালার যাতে অপব্যবহার কেউ করতে না পারে, সে ব্যাপারেও আমাদের সজাগ থাকা উচিত। তবেই একটি সুন্দর নারীবান্ধব চিকিৎসা ব্যবস্থা বাস্তবে গড়ে ওঠবে। সেইদিনের অপেক্ষাতো করতেই পারি। কী বলেন, প্রিয় পাঠক?

x