‘নারী বা পুরুষ, কে ফ্লাইট পরিচালনা করছে হেলিকপ্টার তো আর তা বুঝতে পারে না’

মাধব দীপ

শনিবার , ৬ জুলাই, ২০১৯ at ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
73

খবরটিই অন্যরকম। ভালো লাগার। মনে ধরার। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে ইতোমধ্যে। আর তা হচ্ছে- জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত বাংলাদেশের দুই নারী পাইলট এখন রোল মডেলে পরিণত হয়েছেন। এই দুই নারী পাইলট হলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নায়মা হক ও তামান্না-ই-লুতফী। তারা দু’জনই বাংলাদেশের প্রথম নারী সামরিক পাইলট যাঁরা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে (এমওএনইউএসসিও) বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন। ২০১৭ সালের নভেম্বরে তাঁরা ওইপদে যোগদান করেছিলেন।
জাতিসংঘের মতে, এ অঞ্চলে নারী ও কিশোরীদের নানা প্রতিকূল অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তাঁরা মানে তামান্না ও নায়মা এখন রোল মডেল। তাঁদেরকে নিয়ে বিশেষ ভিডিও তৈরি করেছে খোদ জাতিসংঘ। ৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটিতে তাঁদের স্বপ্নের কথা, তাঁদের চ্যালেঞ্জের কথা এমনকি তাঁরা কীভাবে অন্যান্য আটপৌরে বাঙালি নারীর জন্য মডেল হতে পারেন সেই কথারই বর্ণনা দিয়েছেন।
ভিডিওতে পাইলট তামান্না বলেন, ‘নিজেকে একজন নারী হিসেবে পরিচয় দিতে চাই না। আমার পরিচয় আমি একজন শান্তিরক্ষী কর্মী। আমি হেলিকপ্টারের একজন পাইলট।’
এর পরপরই বললেন তিনি- ‘নারী বা পুরুষ, কে ফ্লাইট পরিচালনা করছে হেলিকপ্টার তো আর তা বুঝতে পারে না।’ এই বাক্যটি যেনো পুরুষতন্ত্রের জন্য অনেক বড় একটি চপেটাঘাত। অন্তত: তাদের জন্য যারা নারীদের এই অবস্থানে দেখতে চান না।
২০১৪ সালে প্রথম তারা সামরিক পাইলট হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। সে সময় তারা এ সুযোগ অর্জনে খুবই গর্ব অনুভব করেছিলেন। কারণ এর আগে নারীদের জন্য এ সুযোগ আসেনি। পাইলট তামান্নাকে আরও বলতে দেখা যায়, ‘আমরা খুবই গর্বিত। কারণ, সত্যি নারীরা এগোচ্ছে।’ নায়মা ও তামান্না দু’জনই মনে করেন, ‘অন্যকে সহযোগিতা করা মহৎ কাজ।’ এ কারণেও তাঁরা এ পেশায় এসেছেন।
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নায়মা বলেন, ‘আমরা স্থানীয় নারীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারি। তারা যখনই আমাদের দেখে, উৎসাহ পায়। স্থানীয় তরুণীরা আমাদের দেখে উৎসাহিত হয়ে ভাবে, তাদেরও শিক্ষিত হতে হবে। অধিকারের জন্য তাদের লড়াই করতে হবে। কোনো কিছু অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’
বলতে আনন্দধারা বয় মনে যে- নারীর ক্ষমতায়নে আরও একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হল খোদ জাতিসংঘের এই স্বীকৃতির মাধ্যমে। এর আগে গেলো বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর আমরা মেজর জেনারেল পদে ডা. সুসানে গীতিকে পেয়েছিলাম যিনি ছিলেন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে প্রথম নারী মেজর জেনারেল।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার, সংসদ উপনেতার দায়িত্বেও নারীরা সমাসীন। এই সরকারের আমলেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারক হিসেবে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নারীদের দায়িত্ব পালন শুরু হয়। আমি মনে করি, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বশান্তি ও নারীর ক্ষমতায়নের উপর ভিত্তি করে দারিদ্র্য, বৈষম্যহীন ও সংঘাতমুক্ত যে সমাজ গড়ে তুলতে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনের চেষ্টা করছে পুরো বিশ্ব এই অগ্রগতি এরই অংশ মাত্র।
ভাবতে ভালো লাগছে যে- আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যেখানে নারীদের এগিয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। গত বছর কমনওয়েলথের সরকার প্রধানদের ২৫তম সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ২০ মিনিটের বক্তব্যে নারীর ক্ষমতায়ন এবং শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ও তাঁর সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে যথার্থই বলেছিলেন যে- ‘সম্ভবত বাংলাদেশের সংসদই বিশ্বের একমাত্র সংসদ যেখানে স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা চারজনই নারী।’ বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতিকে এ বক্তব্য উৎসাহিত করবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসেবে, ১৪৪টি দেশের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৫৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। আমরা দেখতে পাচ্ছি- বাংলাদেশে সশস্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করে স্বীয় যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন সাহসিকতার সাথে। বিমান চালনা, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাষ্ট্রদূতের মতো উচ্চ পদগুলোতেও বাংলাদেশের নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, এভারেস্ট জয়ের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে ক্রিকেটেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে আমাদের নারীরা। এমনকি নারী ফুটবলার হিসেবেও আকাশচুম্বী জয় ছিনিয়ে আনছেন আমাদের মেয়েরা।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আমাদের ভাষা-আন্দোলনে নারীদের ত্যাগ ও সংগ্রাম এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গঠনে নারীদের অংশগ্রহণ কোনোঅংশেই কম ছিল না। অন্যদিকে- পত্রিকার খবরে জানা যায়- দুই কোটি নারী কৃষি কাজে এবং পোশাক শিল্পে ৪৫ লাখ চাকরিজীবীর ৮৫ শতাংশই নারী। তার মানে- অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখছে আমাদের নারীরা। স্যালুট জানাই সেইসব সংগ্রামী নারীদের।
যাই হোক, লেখাটি শেষ করতে যাওয়ার সময় শুধু কানে বাজছে- ‘নারী বা পুরুষ, কে ফ্লাইট পরিচালনা করছে হেলিকপ্টার তো আর তা বুঝতে পারে না।’ সত্যিই তো, হেলিকপ্টার তো তা আর বুঝতে পারে না। কিন্তু, যারা নারীর উচ্চাসনে আসীন হওয়াটাকে আটকাতে চান- তাদের বোধোদয় হবে কবে?

x