নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ‘মোবাইল এ্যাপ’ সেবা

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ
32

এদেশে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন তার জীবনে কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে দুজন স্বামী বা অন্তরঙ্গ বন্ধু (বিপরীত লিঙ্গের)/ পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নির্যাতনের শিকার এসব নারীর মাত্র ৪০% কারো না কারো সাহায্য চেয়ে থাকেন এবং এদের মাত্র ১০% আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সাহায্যের আবেদন করেন।

সংবাদপত্রের পাতা কিংবা টেলিভিশন সেটের সামনে বসলেই বুঝতে পারি- নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়েছ, ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যৌতুকের কারণে নির্যাতন বাড়ছে, যৌন হয়রানি বাড়ছে, নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। প্রায়শই সহিংসতার শিকার হয়ে নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এককথায়, মিডিয়ায় গড়ে প্রতিদিন অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রচার ও প্রকাশিত হচ্ছে।
এক হিসেবে দেখা গেছে- এদেশে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন তার জীবনে কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে দুজন স্বামী বা অন্তরঙ্গ বন্ধু (বিপরীত লিঙ্গের)/ পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নির্যাতনের শিকার এসব নারীর মাত্র ৪০% কারো না কারো সাহায্য চেয়ে থাকেন এবং এদের মাত্র ১০% আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সাহায্যের আবেদন করেন।
বিবিসি ও ইউএনএফপিএ প্রদত্ত অপর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ গৃহ (পারিবারিক) সহিংসতার শিকার, ওই নারীদের ৭৭ শতাংশ প্রতিনিয়ত প্রহৃত হয়, এদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ নির্যাতিত নারীর চিকিৎসা প্রয়োজন হয়, এক-তৃতীয়াংশ নারী স্বামী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন। নির্যাতিতদের ৫০ শতাংশ নারী ১৪ বছরের আগেই ধর্ষণের শিকার হন। এসিড নিক্ষেপ, আগুন দেওয়া, সমাজচ্যুত করা, জোরপূর্বক তালাকু এগুলোর হিসাব রাখাতো দুষ্করই বলা চলে।
বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় পর্যায়ের অপর একটা জরিপে ওঠে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর সব তথ্য। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী নিজ ঘরেই অনেক বেশি অনিরাপদ। ঘরের ভেতরে স্বামী এবং অন্যান্য আপনজনদের কাছেই নারী অনেক বেশি নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে থাকে এবং নির্যাতনের শিকারও হয়। জরিপে ৭ শতাংশ নারী জানিয়েছে, নির্যাতনের কারণে তারা আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন।
কিন্তু এসব ঘটনায় কয় শতাংশের মামলা হয়? কতোজন নারী এধরনের নির্যাতন কেবল নীরবে সয়ে যান? আমি নিশ্চিত, এর সত্যিকার তথ্য পাওয়া গেলে- অধঃপতনের চিত্র দেখে আমাদের পিলে চমকে যাবেই। কিন্তু, কেনো হচ্ছে এরকম? আমি মনেকরি, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু কীভাবে জানবো সেই আইন-কানুন সম্পর্কে? কে সহায়তা করবে? নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমি প্রথম কোথায় যাবে? কার কাছে যাবো? কীভাবে পদক্ষেপ নেবো? এককথায়, নারী নির্যাতন রোধে কী কী আইন আছে আমাদের দেশে সেই তথ্য আমি কোথায় পাবো? হ্যাঁ, এসব কিছুর জন্য দরকার একটু সময় ও সুযোগ। তথ্য-প্রযুক্তির এই সময়ে এসে এখন সবকিছুই জানা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
ধরুন, আপনার হাতে স্মার্টফোন আছে। তার মানে কিন্তু আপনি ওইসব আইন-কানুনের প্রায় প্রতিটির সাথেই নিজে-নিজে পরিচিতি হতে পারেন। আপনি যদি কোনোভাবে ‘ভিকটিম’ হোন তবে নিজেকে রক্ষা, সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেই ভূমিকা রাখতে পারেন। কেননা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, এসিড অপরাধ দমন আইন, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রিকরণ) আইন, মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, সালিস আইন, গ্রাম আদালত আইন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার আইন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, বাংলাদেশ শ্রম আইন, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, সাইবার আইন, তথ্য ও প্রযুক্তি আইন- ইত্যাদি সম্বন্ধে আপনি বিস্তারিত তথ্য এক লহমায় জেনে নিতে পারেন যেকোনো স্থানে যেকোনো সময়ই। কারণ, এর প্রায় প্রতিটি বিষয়েই ‘মোবাইল এ্যাপ’ রয়েছে বাংলা ভাষাতে। শুধু দরকার সেটের ‘গুগল প্লে স্টোরে’ গিয়ে ডাউনলোড করা। এমনকি বাংলাদেশ পুলিশের সকল সদস্যের মোবাইল নাম্বার এখন আপনি পাচ্ছেন একই ধরনের এ্যাপ্লিকেশনে। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে ‘তথ্যআপা’ নামে একটি ওয়েব প্রকল্প। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন প্রকল্পের ওয়েব পোর্টাল এটি। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় মহিলা সংস্থা কর্তৃক এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এমনকি ওই ওয়েব পোর্টালের সাথে যুক্ত রয়েছে ‘উইমেন টিভি’ও। বিশাল তথ্য ভাণ্ডারতো রয়েছেই। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জেন্ডার, আইনী সহায়তা এবং ব্যবসা বিষয়ক ছয়টি বিভাগে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এ তথ্য ভাণ্ডার। উপরন্তু, উইমেন টিভির মাধ্যমে নারী বিষয়ক বিভিন্ন অনুপ্রেরণামূলক সংবাদ, ভিডিও চিত্র, বিশেষ অনুষ্ঠান ইত্যাদি প্রচার করা হচ্ছে। উপরন্তু, বর্তমানে যেকোনো মোবাইল সেট থেকে যেকোনো বিপদে যেকোনো স্থান থেকে আপনি ৯৯৯-এ ফোন করলেই পাচ্ছেন পুলিশের সেবা। ২৪/৭ মানে সপ্তাহের প্রতিটি মুহূর্তেই আপনি পাচ্ছেন এই সেবা।
অধিকন্তু, একজন নারী হিসেবে আপনি যদি মামলা করতে অসমর্থ হন বা কোনো হুমকির সম্মুখীন হন, তাহলে কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে যারা আপনাকে সহযোগিতা করতে পারে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড (ব্লাস্ট), আইন ও সালিশ কেন্দ্র, (আসক), বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল প্রভৃতি। এই প্রতিটি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান সম্বন্ধেই বিস্তারিত জানার জন্য নির্দিষ্ট ওয়েবে আপনি ঢুঁ মারতে পারেন।
সবশেষে বলবো, সারা পৃথিবীতে যেখানে বলা হচ্ছে- তথ্যই শক্তি। তথ্যই ভয় দূর করে। সেখানে কি আমাদেরও পিছিয়ে থাকলে চলে? আর আমরা এগিয়ে থাকলে বিচারব্যবস্থাকে কি আমরা আরও শক্তিশালী করতে পারবো না?

Advertisement