নারী নিগ্রহের প্রতিবাদে এগিয়ে আসুক পুরুষও

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ২ জুন, ২০১৮ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
12

আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ার তারানা বুর্কে নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী ১৯৯৭ সালে ১৩ বছর বয়সী এক মেয়ের ‘যৌন নিগ্রহের শিকার’ হওয়ার কাহিনী শুনছিলেন। অনেক খারাপ লাগছিলো তাঁর। বলতে পারছিলেন না যেণ্ড ‘এমনটা’ তাঁর নিজের জীবনেও ঘটেছে। কিন্তু নানাভাবে নানাকারণে নানাস্থানে যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়া নারীদের জন্য কিছু করার পরিকল্পনা তখন থেকেই তাঁর ছিলো।

অতঃপর ২০১০ সালে এসে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘জাস্ট বি ইন্স’ নামের একটি অলাভজনক সংগঠন যার কাজ নারীদের অধিকার ও নারীর উপর চলা যাবতীয় নিগ্রহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। এখান থেকেই মূলত আসে ‘মি টু’ আন্দোলন। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ বলে তাঁর ওই আন্দোলন শ্বেতাঙ্গ নারীবাদীদের চোখে পড়েনি। পরিণতিতে, তাঁর সেই আন্দোলনের কথা কেউ তেমনভাবে জানতেও পারেনি এতোদিন।

কিন্তু ২০১৭ এর অক্টোবরের প্রথম দিকে ঘটে গেলো একটা ঘটনা। হলিউডের ম্যুুভিমুগল বলে পরিচিত হারভে ওয়েনস্টেইন তার নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ‘দ্যা ওয়েনস্টেইন কোম্পানি’ থেকে চাকরিচ্যুত হন। এর পেছনে কাজ করে তার দ্বারা সংঘটিত অসংখ্য যৌন নিগ্রহের ঘটনা। নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের অসংখ্য অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে এবং তাকে এইসব অভিযোগে চাকরিচ্যুত করে তার নিজের প্রতিষ্ঠানেরই পরিচালকবৃন্দ।

তো, এই ঘটনা ঘটার পরপরই হলিউডের আরেক দাপুটে অভিনেত্রী, এ্যাকটিভিস্ট, সাবেক গায়িকা ও প্রযোজক এলিসা মিলানো তাঁর টুইটার একাউন্টে যৌন নিগ্রহের শিকার নারীদের সাপোর্ট দিতে হ্যাসট্যাগসহ ‘মি টু’ ক্যাম্পেইন পুনরায় চালু করেন এবং এটি মুহূর্তেই এতোটা ভাইরাল হয়ে যায় যেণ্ড জেনিফার লরেন্সসহ দুনিয়া কাঁপানো প্রায় কুড়িজনেরও অধিক তারকা ওই টুইটে ‘মি টু’ লিখে তাঁদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এমনকি জেনিফার লরেন্স প্রকাশ্যে তাঁর শারীরিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার অতীত কাহিনীও তুলে ধরেন। সিএনএনএ সেটি প্রচারও করা হয়।

মূলত: তারানা বুর্কে, এলিসা মিলানো, জেনিফার লরেন্সসহ সবারই মত এটি যেণ্ড এই ‘মি টু’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে একটা নাড়া দেওয়া সম্ভব এবং এর মাধ্যমে পুরুষের ‘সম্বিত’ ফিরে পাবে বলে তাঁরা মনে করেন।

যাই হোকণ্ড এরই মাঝে পত্রিকায় চোখে পড়লো আরও একটি সংবাদ। এই বিষয় সংশ্লিষ্টই। এতে দেখলাম এই ‘মি টু’ ক্যাম্পেইন’কে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের নারীরা জানাচ্ছেন নিজ নিজ জীবনে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির কথা (সূত্র: প্রথম আলো)। ওই খবরে বলা হয় ‘দেশবিদেশে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন অনেক নারী। পুরুষও আছে অনেক। এরই ধারাবাহিকতায় বিবিসি প্রচার করেছে একটি ভিডিও। ভিডিওতে বিবিসির সাংবাদিক মুখোমুখি হয়েছেন কয়েকজন পুরুষের। সরাসরি জানতে চেয়েছেন, কর্মস্থলে নারীদের যৌন হয়রানির শিকার হতে দেখে তাঁরা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? লন্ডনের চলতি পথে কয়েকজন পুরুষের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে নানা তথ্য। পরিস্থিতির চাপে অনেক পুরুষই প্রতিবাদ করতে পারেননি বলে স্বীকার করেছেন। অনেকে আবার প্রতিবাদ করবেন বলে জানিয়েছেন।’ এরপর এরকম ভিডিও তৈরি হয়েছে অনেক।

এরকম কয়েকটি ভিডিও আমি দেখেছি। একটি ভিডিওর এক পর্যায়ে জানতে চাওয়া হয়ণ্ড কর্মস্থলে নারীদের যৌন হয়রানির শিকার হতে দেখে কী করেছেন? এর জবাবে মধ্যবয়সী একজন পুরুষ বলেন, ‘সেটি ছিল আমার প্রথম চাকরি। সে সময় নারীদের যৌন হয়রানির শিকার হতে দেখেছি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাবান পুরুষেরাই এমন আচরণ করেছেন। চাকরির ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারিনি। এখন আমার ব্যবসা রয়েছে। এখন প্রতিবাদ করার ক্ষমতা রাখি। লন্ডনের আরেক পথচারী পুরুষও প্রায় একই কথা জানালেন। তাঁর বক্তব্য, কাজ ও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের চাপের কারণে চাইলেও এ ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেননি। চাকরি হারানোর ভয়ও থাকে এ সময়। কর্মস্থলে যৌন হয়রানির শিকার নারীদের কীভাবে সাহায্য করেছেনণ্ড জানতে চাইলে আরেক পথচারী বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় অনেক সময় তিনি আর্থিকভাবে সহায়তা করেন।

অন্য একজন বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, এ রকম কিছু ঘটলে কোনো ভয় বা সংকোচ ছাড়াই প্রতিবাদ করবেন। আরেক পথচারীও কাঁধ ঝাঁকিয়ে একই মতামত জানালেন। বললেন, অপরাধীকে শাস্তি দেবেন। প্রতিবাদ ও সমালোচনা করবেন।

এসব নিউজ পড়ে ও এ সংক্রান্ত ভিডিও দেখে মনে হলোণ্ড ‘মি টু’ এর মতো কোনো ম্যুভমেন্ট কি আমাদের পুরুষতান্ত্রিক হৃদয়ে কোনো নাড়া দেবে? আচ্ছা, এ ধরনের কোনো ক্যাম্পেইন কি আমাদের দেশে সম্ভব? কেনো জানি মনে হয়, সম্ভব না। কারণণ্ড এ বিষয়ে প্রকাশ্যে যে কোনো আলোচনাকে এখনো আমরা সামাজিকভাবে ‘অশোভন যোগাযোগ’ (ট্যাবু কমিউনিকেশান) হিসেবেই বিবেচনা করি। আচ্ছা যদি, এরকম কোনো সুযোগ দেওয়া হয় এদেশের শিশুকন্যা, ছাত্রী, নারী বা বৃদ্ধাকেণ্ড তবে কেমন হবেণ্ড ভাবা যায়? অথবা যদি এরকম কোনো স্টাডি পরিচালনা করা হয় যেখানে তাঁরা একেএকে বলবে তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া নানাকিসিমের নিগ্রহের ঘটনা। তবে যে চিত্র উঠে আসবে তাতে কি মুখ দেখাতে পারবে এদেশের পুরুষ সমাজ? উত্তর আপনাদের ওপরই রইল প্রিয় পাঠক।

তবে, আমি এটুকু বলতে পারিণ্ড কোনো নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটলে এর প্রতিবাদে পুরুষতো এগিয়ে যেতেই পারে। যাওয়াই উচিত। এক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া মানুষ হিসেবে আর কোনো বিকল্প আছে কি পুরুষের জন্য?

x