নারী জাগরণ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

সৈয়দা আইরিন পারভীন

মঙ্গলবার , ৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ
87

শিশুবেলা থেকে পড়েছি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার সংগ্রামী জীবন। সমাজের অন্ধকার পথকে কিভাবে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে এই বিষয়ে তিনি লিখেছেন অসংখ্য লেখা। নারী পুরুষের ভেদাভেদ দূর করে কিভাবে একই সঙ্গে সমাজের উন্নয়নে কাজ করবে এই বিষয়ে এই মহীয়সী নারীর কোন তুলনা নেই।

আরো মনে পড়ে বিপ্লবী নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। যিনি কিনা ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবী সৈনিক।
আমার দেখা বেগম সুফিয়া কামাল যিনি কিনা নারীর শিক্ষা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। সুফিয়া কামাল সপ্তাহের শুক্রবারে কচিকাঁচার মেলায় পুরানা পল্টন অফিসে আসতেন। সঙ্গে থাকতেন নুরজাহান বেগম যিনি নারী সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক। সুফিয়া কামাল প্রতিটি আলোচনায় বলতেন সেই সময় নারীরা স্কুলে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। তারপরও তাঁরা ঘরে বসে লেখাপড়ার পাশাপাশি সাহিত্য চর্চাও করেছেন। সমাজের অবহেলা ও প্রবঞ্চনার হাত থেকে শিশুদের বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশের জন্য উনি ১৯৫৬ সালে কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন। সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০শে নভেম্বর মৃত্যুর পর বাংলাদেশে নারী হিসাবে তাকে প্রথম রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। অতঃপর তাঁর মৃত্যুর পর সমস্ত দায়ভার আসে নুরজাহান বেগম ও তার স্বামী শিশুসাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই এর উপর। সেই সময় নুরজাহান আপা নারিন্দার কাটের পুলের কাছে উনার নিজ বাড়িতে থাকতেন। তখন আমি ও আমার অনেক বন্ধু নুরজাহান আপার বাসায় যেতাম। নুরজাহান আপার মেয়ে মিতু আমাদের সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে এবং লিখাপড়ার কোন সমস্যা হলে সাহায্য করতেন। নারীরা যেন লেখালেখিতে ফিরে আসে এবং তাদের মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে তাই তিনি ১৯৪৭ সালে সাপ্তাহিক পত্রিকা’ বেগম’ প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়ে তাঁর বাবা মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মেয়েকে সাংবাদিকতায় ও সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার জন্য ব্যাপক সাহায্য করেন।
নারী জাগরণের ক্ষেত্রে নারীদের অবদান দুই চার দিন লিখলেও শেষ করা যাবে না। নারী জাগরণের আরেক যোদ্ধা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। উনার লিখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ কতবার যে পড়েছি। পড়ার সময় শরীর এর রক্তগুলো যেন টগবগ করে ফুটে ওঠে। নারী জাগরণের এই ধারাবাহিকতার ফসল আমাদের আজকের এই অবস্থান।
সরকার গত ৯ বৎসরে নিরন্তর প্রচেষ্টায় বর্তমানে দেশে নারী শিক্ষার হার ৫০% থেকে ৫৪% এ শতাংশে উন্নীত করেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক বৎসরের মধ্যে একজন নারীও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে না।
নারী শিক্ষার প্রতি বর্তমান সরকার বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়ায় ইতিমধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি হয়েছে এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে ছাত্রের সংখ্যার সমতা অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
দেশের কোনো কাজে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ঐকমত্য থাকলে তার ফলাফল কী হতে পারে এর অনন্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে নারী শিক্ষা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল এবং ২০০৮ সাল থেকে বর্তমান সময় অব্দি প্রধানমন্ত্রী নারীদের শিক্ষামুখী করার লক্ষ্যে যুগান্তকারী বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় দেশে ক্রমেই নারী শিক্ষার হার বাড়ছে।
ছেলেরা লেখাপড়া ও কর্মে এগিয়ে যাবে, আর মেয়েরা ঘরের কাজ করবে এমন ধারণার অবসান হয়েছে অনেক আগে। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের ভর্তির হার প্রায় শতভাগ। ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ও ৯০ দশক থেকে উপবৃত্তি চালুসহ বেশকিছু সরকারি পদক্ষেপে শিক্ষায় এখন ছেলেমেয়ের ব্যবধান নেই। তবে কর্মবাজারে প্রবেশ ও কর্মপ্রাপ্তিতে নারী এখনও বেশ পিছিয়ে রয়েছেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যোগ্য হয়েও শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছেন ৩ কোটি ৬১ লাখ নারী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত পরিবারে বাড়তি সময় দেয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে নারী পিছিয়ে আছেন। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও সন্তান লালন-পালনসহ পরিবারের গৃহস্থালি কাজ এখনও নারীদেরই করতে হচ্ছে। এতে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই কর্মে প্রবেশ করতে পারছেন না।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৮৪ লাখ নারী শ্রমিক পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন বিনা পারিশ্রমিকে। উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতেও নারী এখনও সম্মুখীন হচ্ছেন বেশ কিছু বাধার। নারায়ণগঞ্জ সুইপার কলোনীর প্রথম গ্রেজুয়েট সানু রানী। যারা কিনা এক সময় সঠিক ভাবে বাংলায় পড়তে পারতো না। আমি যখন সেগুন বাগিচা প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন দেখতাম হরিজন সমপ্রদায়ের শিশুরা আমাদের সাথে পড়তে পারতো না। কিন্তু এখন হরিজনরাও পড়ালেখা করছে। সনু ও তার দুই বান্ধবী মিনা ও পুজা নারায়ণগঞ্জের হরিজনদের মধ্যে প্রথম এসএসসি পাস করেন। সত্যি কথা বলতে কি একজন নারী যখন বুঝবে তার লেখাপড়া করা দরকার তখন তাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না। আমি আমার মাকে দেখেছি লেখাপড়া কম করেছিল বিধায় সারাজীবন আফসোস করতো। মা অষ্টম শ্রেণী পাস করে নবম শ্রেণীতে উঠতেই বিবাহ হয়ে যায়। মা সব সময় বলতেন শিক্ষিত হলে তোমাকে সংসারের যে কোন কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করবে। আর তাই মা আশির দশকে আমার দুই বুবুকে মাস্টার্স করিয়ে বিবাহ দেন। অথচ তাদের বিয়ের ঘর আসছে সেই নাইন ক্লাস থেকে। কিন্তু মা অনড় গ্রেজুয়েশন এর আগে কোনভাবেই বিয়ে নয়। আমার বেলায় তদ্ররুপ বাবা গ্রেজুয়েশন এর আগে বিয়ে দেয়নি। এখন মনে হয় একজন মা চাইলেই তার সন্তানদের শিক্ষায় দীক্ষায় মানুষ করা যায়। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হয় প্রতিটি মা’ই সমাজ জাগরণের অগ্রদূত।

লেখক : প্রাবন্ধিক

x