নারী কেবল কর্মের কর্তৃত্ব্বের হবে কবে?

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ৪ মে, ২০১৯ at ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ
21

এমন এক সময় ছিল যখন সমাজে নারী ও পুরুষের মর্যাদা, ক্ষমতা সমান ছিল। এমনকি পরিবার প্রথা অর্থাৎ বিয়ের প্রথা চালু হওয়ার পরও কিছুকাল বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের কর্তৃত্ব সমান ছিল। এরপর ধীরে ধীরে নারীকে কেবলই অন্দরমহলের বাসিন্দা বানানো হল। সন্তান জন্মদান, সন্তান লালন-পালন, ঘরের সেবা করা মানে ঘরের সেবা করার মাধ্যমে সব পুরুষের মন সন্তুষ্ট রাখাই হয়ে পড়ে একসময় নারীর নিয়তি। আর তখনই শুরু হয় বৈষম্য। অন্তত সমাজের ইতিহাস তাই বলে। একসময় নানা আন্দোলন-সংগ্রামের পরিণতিতে নারী আবার ঘরের বাহির হল সত্য। উপার্জনও শুরু করল। কিন্তু নারীর নিয়তি থেকে বৈষম্যের ধারাবাহিকতা ঘুচল না। ফলে, চাকরি করলেও পুরুষ সহকর্মীদের থেকে কম বেতন পেতে লাগলো নারী। অতঃপর একসময় সেই অবস্থারও পরিবর্তন ঘটলো। আজকে যে নারীরা একই পদমর্যাদার চাকরিতে পুরুষের সমান বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে সেটা নারীর নিজস্ব আন্দোলনেরই ফসল। আন্দোলন করেই তাঁকে এই অধিকার আদায় করে নিতে হয়েছে।
বাইরের চাকরির কথা বাদ দিলে আজও কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে নারীকে ঘর-কন্নার যাবতীয় কাজ করতে হচ্ছে। অফিস নামক সংসার সেরে নারীকে আবার পারিবারিক সংসারের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। একই অফিসে, একই পদমর্যাদায় চাকরি করে বাসায় বা বাড়ি ফিরে এসে কিন্তু পুরুষকে সেই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে না। কারণ, বাসার কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করা পুরুষের আত্মমর্যাদার জন্য ‘হানিকর’ হিসেবেই এই মূল্যবোধ পরিবারে জিইয়ে আছে এখনো। অবশ্য, ব্যতিক্রম হিসেবে কেউ টুক-টাক কাজ করলেও পুরুষের এই কাজকে ‘নারীর মতো সংসারধর্ম’ পালন বলা যাবে না কোনোমতেই।
অথচ এই নগর-শহরের পাঁচ তারকা হোটেল থেকে শুরু করে বড়-বড় তিনতারকা হোটেল ও অন্যান্য অভিজাত হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোর বেশিরভাগেই এখন শেফ (পযবভ) হিসেবে কাজ করছে পুরুষ। সেখানে এই কর্মের জন্য বড় অংকের অর্থ বেতন হিসেবে পেয়ে থাকেন এই পুরুষ শেফরা। এমনকি পৃথিবীর বড় বড় শেফও কিন্তু পুরুষ। কারণ সেখানে বিশাল অংকের অর্থকর্তৃত্ব জড়িত। ঘরের কাজ করাতো বেশিরভাগক্ষেত্রেই পুরুষের জন্য ‘কর্তৃত্বহীনতার’ই পরিচায়ক! জেনে-শুনে পুরুষ তথা পুরুষতন্ত্র এই ‘কলঙ্ক’ মাথায় নেবে কেনো?
এদেশের প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাক কারখানার কাজও নারীর জন্য একই ধরনের অর্থাৎ সেখানেও নারী কর্মে আছে, কর্তৃত্বে নেই। অন্যভাবে বলা যায়- এটিও নারীর একধরনের কর্তৃত্বহীন সামাজিক শ্রম। যেখানে নারী কেবলই শোষণের হাতিয়ার- অনুগতের মতো শোষিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। পুঁজিবাদী সমাজে মালিকপক্ষের মুনাফার স্তূপ নির্মাণে নারী এখানে ব্যবহৃত হয় কেবলই। যেহেতু নারী ঘরকাজে অভ্যস্ত ও অনুগত, সেহেতু এই পোশাক কারখানার কাজও নারীর গৃহস্থালীর কাজের মতোই আটপৌরে ও একঘেয়ে। এখাতে নারীর সস্তা শ্রমমূল্যকে পুঁজি করে বিনিয়োগকারীরা একে ‘মুনাফা বৃদ্ধির’ একটি সুযোগ হিসেবে নেয়।
“…এই পুরুষই কিন্তু আবার ‘সস্তা শ্রমমূল্যের এই নারী’কে ভবন নির্মাণের মতো ভারী কাজে নিয়োজিত করে। অর্থাৎ নারী ‘দুর্বল’ নাকি ‘সবল’ বা কোথায় নারীকে ‘দুর্বল’, কিংবা ‘অক্ষম’ হিসেবে ট্রিট করতে হবে, কোথায় নারীকে ‘পারদর্শী’ বা ‘সক্ষম’ হিসেবে ট্রিট করতে হবে তাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে পুরুষতন্ত্র। এবং তা নিজের স্বার্থ হাসিলের স্বার্থেই। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে- এইসব পোশাক কারখানার বিনিয়োগকারীদের একাধিক সাক্ষাৎকার থেকে প্রকাশিত হয় যে- তারা শহরের নারীশ্রমিকদের চেয়ে গ্রাম থেকে আসা নারীশ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেয় এই কারণে যে, দ্বিতীয়োক্ত শ্রেণিটি অধিকতর অনুগত, বাধ্য, নিয়মানুবর্তী এবং তাদের পক্ষ থেকে দর কষাকষি বা দর যাচাই করার সম্ভাবনা কম (সূত্র: পোশাক শিল্পে নারী, ঋতা আফসার, পৃষ্ঠা ১৬৯ ও ১৭০, সেলিনা হোসেন ও দয়মন্তী বসু সিং সম্পাদিত গ্রন্থ ‘নিঃশব্দ বিপ্লব, বাংলাদেশে নারীমুক্তির তিন দশক’)…।”
সুতরাং দেখা যাচ্ছে এক্ষেত্রে নারীর আর্থিক উপার্জন নারীর অর্থনৈতিক শক্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রে কিছুটা আশা জাগালেও তা গৃহকর্মের মতো সমগোত্রীয় কর্মের কারণেই হয়েছে।
এবার বলা যাক, চিকিৎসা সেবায় নারী অংশগ্রহণ নিয়ে। আমরা দেখি- চিকিৎসকদের মধ্যে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা আমাদের দেশে বেশি। কিন্তু পুরুষতন্ত্রের এই চেহারা পাল্টে যায় সেবা-শুশ্রুষাদানকারী নার্স হবার বেলায়। এদিক দিয়ে আবার পুরুষ, নারীর তুলনায় বহুগুণ পিছিয়ে আছে। তাই, নার্স শব্দটি কারও মুখে উচ্চারণের সাথেসাথেই আমাদের চোখের সামনে সাদাপোশাক পরিহিত কোনো নারীর মুখই ভেসে ওঠে। এর কারণ, পুরুষ সেবাগ্রহীতা হিসেবেই নিজেকে সবসময় দেখতে চায় ও দেখতে অভ্যস্ত, সেবাপ্রদানকারী হিসেবে নয়। নারীর নরোম-কোমল-মোলায়েম হাত, সুরেলা ও অনুত্তেজিত কণ্ঠ, ধীরগতির চলাফেরা, মায়াময় চাহনি ইত্যাদি উৎকৃষ্ট সেবিকারই লক্ষণ- এমনই সব মিথকে ‘বাস্তব’ হিসেবে সমাজে হাজির করেছে পুরুষতন্ত্র। কেবলমাত্র এ কারণেই পুরুষতন্ত্র নার্স হিসেবে হাসপাতালে বা পুরুষের পাশে বেশিসংখ্যক নারীর উপস্থিতি জোরালোভাবে সুপারিশ করে। কোথায় যেনো পড়েছিলাম- এদেশের নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি ৪৫ জন নারীর বিপরীতে ভর্তি করা যায় মাত্র ৫ জন পুরুষ। নারীর প্রতি রাষ্ট্রের এমন মনোভাবের কারণেই একইভাবে ছোটোবেলার স্কুল থেকে বড়বেলার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ‘গার্হস্থ্য অর্থনীতি’ হয়ে ওঠে শুধু নারীরই পাঠ্য।
সবশেষে বলবো- ঘরে নারী যতই কর্ম করুক না কেনো সেই কর্ম কখনো তো অর্থের মূল্যে পরিমাপ করা হয়ই না বরং উল্টো নারীকে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, আশ্রয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় এবং আটপৌরে জিনিসের জন্য পুরুষের উপর নির্ভরশীল বলে এখনও ভাবা হয় এই সমাজের বেশিরভাগ পরিবারে। এমনকি নারী নিজে উপার্জন করলেও প্রত্যাশা করা হয় যে নারী তাঁর পিতা, শ্বশুর, স্বামী, ভাই বা পুত্রের অধীনেই থাকবে।
বলতে গেলে- কয়েক হাজার বছর ধরে পুরুষতন্ত্র এভাবেই নারীর পায়ের তলা থেকে তাঁর নিজের ‘মাটি’টুকু খুঁড়ে খুঁড়ে নিয়ে চলেছে। এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। নারীর সালোয়ার-কামিজ বা শাড়িতে অর্থ রাখার মতো কোনো পকেট না থাকা এরই উদাহরণ বলে মনে করি। নারীর অর্থ প্রয়োজন হলে সে পুরুষের নিকট হাত পাতবে, পুরুষই তার বুকপকেট বা পেছনের পকেট থেকে টাকার যোগান দিবে- সেই উদাহরণ কি এই বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয় না? আর নচেৎ যদি নারীর অর্থের প্রয়োজন হয়-ই তবে নারীর পক্ষে সেই টাকা বহন করার জন্য আলাদা একটি ভ্যানিটি ব্যাগ (প্রসাধন সামগ্রী রাখার জন্য বিশেষ ব্যাগ) বহন করাই ভালো।
আজ- এই আধুনিক সময়ে এসেও নারীকে ঘরমুখী করে তাঁর চেতনায় এমন এক ‘ইনজেকশন’ পুশ করে রাখা হয়েছে যে অনেক নারী এখনও নিজেই ভাবে- ঘরের পুরুষকে ডিঙিয়ে কোনো কাজ তা যত ইতিবাচকই হোক না কেনো তার ফল ভাল হয় না। অথচ যেকোনো চাকরিতে- যেকোনো সামাজিক স্তরে নারী নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। প্রয়োজন শুধু কার্যকর অর্থে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পুরুষতন্ত্রকে বুঝতে হবে- নারীর উপার্জন নারীর ইচ্ছেমতো ব্যয় বা ব্যবহারের মধ্যেও কিন্তু নিহিত রয়েছে নারীর একধরনের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বীকৃতি।

x