নারী কাহিনী : আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান

রেজাউল করিম

শুক্রবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ
48

আনোয়ারা বেগম বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্যে পরিচিত একটি নাম। নারীদের নিয়ে তাঁর চিন্তাধারা, লেখনী আবর্তিত। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এদেশের নারীরা পাশ্চাত্য নারীদের চেয়ে ভিন্ন। তাদের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। পাশ্চাত্য নারীর অবয়ব বাংলাদেশি নারীদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশ্চাত্যকে যদি নারীবাদের উৎপত্তিস্থল হিসেবে দাবি করা হয়, তবে বাংলাদেশে সহজাত নারীবাদের সৃষ্টি হয়েছে, যা পাশ্চাত্যের চেয়ে ভিন্ন ধাচের। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মনে করতেন নারী সামাজিক জীব, নারীকে নিজের কথা নিজেকে সমস্বরে বলতে হবে, অন্য কেউ নারীর হয়ে বলবে না। ‘এ কোন বাংলাদেশ! বিস্ময় জাগে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যে বৈষম্যমূলক সে সমাজে আমরা বাস করছি। সেখানে নারীর কর্ম, যোগ্যতা, সম্মান, সক্ষমতাকে পুরুষ অনেক সময় মেনে নিতে পারছে না। নারীর কর্মেও অধিকার, সর্বোপরি আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করছে। ক্ষমতার দৌরাত্ম্য বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে। ফলে ঘরে বাইরে নারী তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সত্য বলার অপরাধে নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। চলন্ত মাইক্রোবাসে গারো তরুণী ধর্ষণের ঘটনা আমাদের এ কঠিন সত্যের মুখোমুখি করেছে। নারীর বঞ্চনার গল্পের শেষ নেই।’ (নারী কাহিনী : পৃষ্ঠা-৯৭)। প্রবন্ধকার আগামীর প্রক্ষেপণ করে ফেলেছেন। আসলে নারী বঞ্চনার শেষ নেই। মাদরাসা ছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা বর্বর যুগকেও হার মানিয়েছে। এ কোন সমাজের বাসিন্দা আমরা। একে ‘আধুনিক বর্বর যুগ’ বললে ভুল হবে না।
উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি সবকিছু নয়। পাশ্চাত্যের কথা হামেশা বলে আমাদের উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা। মানসিকতার দিকটি তারা খুব একটা আমলে নেন না। ‘মধ্যযুগের গ্রামে যেখানে অন্তত: নারীদের ছিল একটা মুখ্য অর্থনৈতিক ভূমিকা যেটা স্বীকৃত ছিল। সতেরো শতকের মধ্যে নারী প্রবঞ্চিত হলো অর্থনৈতিক ও মতাদর্শিক উভয়ভাবে, মতাদর্শিকভাবে দ্বিতীয় সারির হিসেবে সেরকম মানুষ হিসেবে যারা নিজেদের বাদ দিয়ে অন্যদের যত্ন করে এবং সাহায্য করে যারা পৃথিবীতে সক্রিয়। অর্থনৈতিক এবং মতাদর্শিক পরিমণ্ডলের মধ্যে প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজের তুলনায় উৎকণ্ঠা কম, কারণ নারীর মূল দুইটি অর্থনৈতিক কার্য হয়ে পড়েছিল। প্রথমত, গৃহস্থালির সংগঠন যে গৃহস্থালি আর উৎপাদনের কেন্দ্রীয় একক হিসেবে বিদ্যমান নেই এবং দ্বিতীয়ত সস্তায় শ্রম যোগানের প্রস্তুতি। সতেরো শতকে পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির বিকাশের মাধ্যমে যে ধাঁচ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উনিশ শতকে এসে তা শিল্পভিত্তিক পুঁজিবাদের গঠনের সহায়তায় আরো শক্তিমত্তা পেল এবং সম্প্রসারিত হলো। যেমনভাবে শ্রম-বিভাজন আরো সূক্ষ্ম হয়ে উঠল এবং পেশার বিশ্লেষণ বেড়ে গেল, তেমনি লিঙ্গীয় শ্রম-বিভাজন অনড় হয়ে উঠল।’ (নারী কাহিনী : পৃষ্ঠা-২৭)। ক্ষতিপূরণযোগ্য পুনরুৎপাদনশীল শ্রমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রচারণা হচ্ছে আন্তর্জাতিক গৃহকর্মের
আনোয়ারা বেগম তাঁর নারী কাহিনী গ্রন্থে নারীর প্রতি পুরুষের আচরণ, সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, নারীশিক্ষা, নারীর প্রতি সামাজিক অবমাননা, নারীর অধিকার এবং নারী জাগরণের প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। আবার শোষণমুক্ত সমাজ নিয়ে সংশয় প্রকাশও করেছেন। তিনি সমাজতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে সবকিছুকে সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস চালিয়েছেন।
পশ্চাদপদ ধ্যান-ধারণা ও কুপমূণ্ডকতার বিরুদ্ধে সুস্থ সামাজিক চেতনা ও মুক্ত উদার মুক্তিবোধ প্রতিষ্ঠা নারী কাহিনী গ্রন্থের প্রতিপাদ্য। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারী শিক্ষা, বাল্যবিবাহ, দুরবস্থা, বিপন্নতা, স্বপ্ন-সংগ্রাম মুক্তির উপায়, স্বাবলম্বী হওয়া, সহিংসতা রোধে করণীয়, উৎসব, সংস্কৃতি ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিষয়ে ভূমিকা রাখা ইত্যাদি বিষয়ের উপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞানের চিন্তাভাবনার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অনগ্রসরতা বিষয়টি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাংলার নারীদের মন-মানসিকতা, আত্মমর্যাদার লড়াই ও সংগ্রামের সমাজচিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে গ্রন্থের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে। মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি গ্রাম্যতা ভেঙে নারীরা কিভাবে সমাজে ক্ষমতায়নের পথ খুঁজে নিচ্ছে তার গতি প্রকৃতি স্থান পেয়েছে আলোচনায়। নারীর হারজিতের খতিয়ানের লড়াই সর্বত্র একই। সমাজ, দেশ, জাতি, অবস্থান ভেদে তারতম্য অবশ্য রয়েছে। নারীচর্চা ক্ষেত্রে নারী কাহিনী প্রবন্ধ সংকলনের বক্তব্য ও রচনাশৈলী এতটাই সাবলীল যে পাঠক এই রচনা সংকলন থেকে ভাবনা ও চিন্তায় নতুনভাবে উদ্বেলিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। নারী কাহিনী গ্রন্থে চারটি অধ্যায়ে আঠাশটি প্রবন্ধ সংযুক্ত হয়েছে। প্রবন্ধগুলোর বিষয়গত ভিন্নতা থাকলেও নারীর উত্থান-পতনের কাহিনী সন্নিবেশিত রয়েছে। পুরুষাধিপত্য ও পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্র ও শিক্ষা, বালিকা শিক্ষা, গৃহিণীর ইতিহাস, নারী ভাবনায়-নারী মুক্তি, আত্মপ্রতিষ্ঠায় মেয়েরা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাবলম্বী হওয়া, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রভাব, দাম্পত্য সঙ্কট, স্বপ্ন ও সংগ্রাম, রাজনীতি ও নারী নেতৃত্ব, নারীর স্বাতন্ত্র্য, ঘর ও নারী, প্রকৃতি ও নারী, সংস্কৃতির উৎসবে নারী, চলচ্চিত্র ও নারী, লোকায়ত নারী, শিশু অরিত্রীর মৃত্যু, কন্যাশিশুর উন্নয়ন মানবতার জাগরণ, ধর্ষণ রোধে করণীয়, ঘরে বাইরে নারীর দুরবস্থা, বিপন্ন নারী, নারীর ব্যক্তিসত্তার পর্যালোচনার আখ্যান, শিশু নির্যাতন রোধে করণীয়, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ জরুরি, নারী কাহিনী, মাকে প্রভৃতি।
আনোয়ারা বেগম নারী কাহিনী গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন-অবরোধবাসিনী থেকে নারীর সফল হওয়ার দীর্ঘ পথ কণ্টকাকীর্ণ ছিল, কুসমাস্তীর্ণ নয়। এসব ভাবনা নিয়ে নারী পথ চলছে, নিজের মত করে। আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা বোধের লড়াই নারীকে পথ চলতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে। সময়ের প্রয়োজনে নারী তার পথ একটু একটু করে তৈরি করছে। সময়, স্থান ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে যখনই সুযোগ পেয়েছে নারী নিজেকে মেলে ধরেছে। নারীর দুরবস্থা, দাম্পত্য সংকট, বাল্য ও বিধবাবিবাহ নারীর মনোজগতকে মাঝে মাঝে ঝাপসা ও অস্পষ্ট করেছে। তারপরও নারী নীরবতা ভেঙে নিজেকে নির্মাণ করে তৈরি করেছে গল্প। সে গল্প কখনো বঞ্চনার কখনো সফলতার। পরিবারের মধ্য দিয়ে নারীর প্রান্তিকীকরণের জীবন প্রবাহের শুরু। নারীর জীবন-চক্রে রয়েছে হতাশা, পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষ, বাধা প্রতিবন্ধকতা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দীর্ঘ পথ। সমাজে নারীর হীনাবস্থা, অসহায়ত্ব, শৈশব ও কৈশোরের জীবনপোলদ্ধির মধ্যে দিয়ে শিখেছে আচার-কানুন, নিয়ম-নীতির খোলসে তার জীবন কিভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি তার শৈশবের উজ্জ্বল হাসিকে করছে মলিন। (এ গ্রন্থে রয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক বেষ্টনীতে বেড়ে উঠা নারীদের জীবন ও কর্ম, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা, ঘটনা প্রবাহ, তর্ক-বিতর্ক ও ভাবনা-চিন্তার সমন্বয়)।
নারী কাহিনী আনোয়ারা বেগমের তৃতীয় প্রবন্ধগ্রন্থ। ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবর জন্মগ্রহণকারী ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বর্তমানে। ১২৮ পৃষ্ঠার গ্রন্থের অসাধারণ প্রচ্ছদ করেছেন বরেণ্য শিল্পী দিলারা বেগম জলি। প্রাবন্ধিক নারীবাদ নয়, নারীশিক্ষার কথাও তুলে ধরেছেন। ‘মেয়েরা যখন শিক্ষিত হলেন, তখন কলম তুলে নিলেন বহুজনে, যেমন স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৮৫), শরৎকুমার চৌধুরানী (১৮৬৪), অনুরূপা দেবী (১৮৮২)। তারা পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন। ভারতী, প্রবাসীরা ভারত বর্ষ-এ নিজ নামে পুস্তক প্রকাশ করতেন। মেয়েরা মেয়েদের জন্য লিখতেন। চলত মত ও মন বিনিময় লেখিকা ও পাঠিকাদের মধ্যে।’ (নারী কাহিনী : পৃষ্ঠা-৩৩)
আনোয়ারা বেগম সাবলীলভাবে প্রবন্ধসমূহে নারীর প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে প্রবহমানতায় শিক্ষা-সংস্কৃতি, উন্নয়ন-ক্ষমতায়নের সাথে বৈষম্যের চিত্র সুচারুরূপে তুলে ধরেছেন। তবে সাময়িক ঘটনাবলীকে তিনি সাধারণীকিকরণ না করে বরং ঐতিহাসিক-সমাজ ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। নারীমুক্তি ও ক্ষমতায়নের কথা যতো বলি না কেন বৈষম্য জিইয়ে রেখে কাঙ্ক্ষিত ফল সম্ভব নয়। কয়েকটি উচ্চাসনে নারী থাকলে তার ক্ষমতায়ন হয়ে গেছে এমনটি করা যৌক্তিক নয়। নারী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলে ক্ষমতায়নের পথটি প্রসারিত হবে।
(নারী কাহিনী : আনোয়ারা বেগম, প্রচ্ছদ : দিলারা বেগম জলি, প্রকাশক : ডা. মুহাম্মদ আইয়ুবুর রহমান, প্রথম প্রকাশ ২০১৯, পৃষ্ঠা-১২৮,
দাম-১২০ টাকা)।

x