নারীর বাজেট ও বাজেটের গল্প

শনিবার , ১৩ জুলাই, ২০১৯ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ
29

ভালো খবর শুনতে কে না ভালোবাসে? মন্দ খবরে কমবেশি সবাই আমরা মুষড়েও পড়ি। নারী তার নিজের পরিবারের বাইরে নারীসমাজের ভালো-মন্দ নিয়ে যৎসামান্য মাথা ঘামালেও সমাজের বা রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন বা পিছিয়ে পড়া নিয়ে কতটা উৎসাহী বা উদ্বিগ্ন হন বলা মুশকিল। এই বাজেট নিয়ে চারদিকে যখন এত কথা তখন আমরা কেবল তক্কে তক্কে থাকি দেখি তো মেয়েরা কি পেল, কতটুকু পেল। এখানে ‘আমরা’ মানে কারা তারও একটা ব্যাখ্যা হতে পারে। একজন প্রিয় প্রিয়শ্রী সেন গুপ্তকে আমি জানি, (বিপ্লবী কুন্দপ্রভা সেনগুপ্তার কন্যা তিনি; সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে ছিলেন অর্থনীতির অধ্যাপক) জানি একজন আনোয়ারা আলমকে অর্থনীতির কিছু কিছু বিষয় নিয়ে মাঝে মধ্যে আমি তাঁদের শরণাপন্ন হই। এই আমরার মধ্যে আমাদের আরও অনেকে রয়েছেন মোটা দাগে নারীর অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে যাঁরা ভাবেন। প্রিয়শ্রীদি অসুস্থ বেশ কিছুদিন ধরে। মাঝখানে কিছুদিন থেকে থেকে বাজানো আমার ফোন একবার উত্তর পেল তাঁর পুত্রের গলায়; মা ভীষণ অসুস,্থ হাসপাতালে, নিবিড় পরিচর্যায়। তারপর আজ অব্দি বাজিয়ে যাচ্ছি মাঝে মধ্যে; কেউ তুলছেন না। কায়মনে চাই দিদি ভালো হয়ে উঠুন।
এতদিনে প্রিয় পাঠক, যখন আষাঢ়ের শেষপ্রান্তে এসে আমাদের আকাশ ছেয়ে স্বরূপে আষাঢ় আবির্ভূত হলো তখন কিনা আপনাদের শোনাতে বসেছি বাজেটের গল্প। ধরে নিই এই আমাদের আষাঢ়ে গল্পো। সত্যিই হয়তো বা তাই। আসলে বাজেট অধিবেশনের দিনেই তো একটা মোক্ষম গল্প তৈরি হয়েছিল আমাদের জন্য। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৈশোর-চাঞ্চল্যে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে সাহায্য করবেন বলে এগিয়ে এসেছিলেন। বাজেট খতিয়ান পাঠও যে আনন্দদায়ক হতে পারে আমরা কি তা কখনও ভাবতে পেরেছিলাম? ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না, শুধু বলছি। খুব আনন্দ হয়েছিল আমাদের। আমরা শুধু জানতাম প্রধানমন্ত্রীত্বের পাশাপাশি ১৯৭০-৭১ অর্থ বছরে অর্থমন্ত্রী হিসেবে ভারতের লোকসভায় বাজেট পেশ করেছিলেন প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু সুপ্রসন্ন মন-মেজাজে আমাদের কৌতুকপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন একটা বিরস বিষয়কে যেভাবে সরস করে তুললেন তার কৃতিত্ব তাঁকে দিতেই হবে। বাজেট নিয়ে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের একটা খবরে অন্যরকম আনন্দ হলো আমাদের। ভারতের প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন মোদী সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট পেশ করেছেন গত ৫ জুলাই ২০১৯ এ। ৭২ বছরের নিয়ম ভেঙে বহি-খাতা (ব্রিফ কেসের পরিবর্তে লাল কাপড়ে মোড়া বাজেট) দুহাতে ধরে লোকসভায় প্রবেশ করেন নির্মলা সীতারামন। সোনালী সরু জরিপাড় লাল শাড়ি-ব্লা্‌উসে ছিমছাম সজ্জিত তাঁর দুহাতে সোনালী জরির ফিতায় বাঁধা লাল কাপড়ে মোড়া ‘বহি-খাতা’ (বাজেট খতিয়ান) হাতে অর্থমন্ত্রী যেন উপহারের প্যাকেট নিয়ে উৎসব প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছেন। আমাদের জাতীয় সংসদে আমরা একজন শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সুন্দর শুদ্ধ বাংলা বাচনভঙ্গির সৌরভ ছড়াতে দেখছি বহুদিন ধরে। নির্মলা সীতারামনের মতো একজন অর্থমন্ত্রীর জন্য আমাদের বেশিদিন আশা করি অপেক্ষা করতে হবে না।
এবারে মূল গল্পে আসা যাক। আমাদের বলা হলো রাইসকুকার, ব্লেন্ডার, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদিতে যেহেতু নারীর কাজের সুবিধা হয় তাই এসব যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা কর অবকাশ সুবিধা পেলে প্রকারান্তরে নারীই উপকৃত হলো। হ্যাঁ, ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসব পণ্য উৎপাদনকারীরা কর অবকাশ সুবিধা পাচ্ছেন। হ্যাঁ, উৎপাদনকারী নারী হলে নারী উপকৃত হবে নিশ্চয়ই কিন্তু এখনও ভাত রাঁধা, কাপড় কাচা, মশলা পেশা একা নারীর কাজ ভাবতে পারছি না। আসলে এভাবে আমরা আর ভাবতে চাই না। রপ্তানীমুখী হস্তশিল্পের কর অবকাশ সুবিধার মেয়াদও ৫ বছর বেড়েছে এতে নারী উপকৃত হবে কারণ হস্তশিল্পের সৌকুমার্যের সঙ্গে নারীর নরম হাত ও চাঁপাকলি আঙ্গুলের সরাসরি একটা সম্পর্ক রয়েছে। তরুণ-তরুণীদের জন্য ১০০ কোটি টাকার ‘স্টার্ট-আপ ফান্ডে’র দাবীদার তরুণ-তরুণীরা। হ্যাঁ, সৃজনশীল ব্যবসায় যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত দেখার স্বপ্ন দেখে সেই তরুণীরা উপকৃত হবে তরুণদের নিয়ে একসঙ্গে। নারী উপকৃত নিশ্চয়ই তবে বিশেষভাবে নয়।
আমরা জানি বিউটি পারলার এবং ক্যাটারিং ব্যবসার ক্ষেত্রে নারীরা বেশ জুড়ে আছেন। এসব ক্ষেত্রে এতদিন প্যাকেজ ভ্যাটে কাজ চলতো। এই প্যাকেজ ভ্যাট তুলে দেওয়া হয়েছে অথচ ভ্যাট অব্যাহতির তালিকায় বিউটি পারলার নেই। ক্যাটারিং এর ক্ষেত্রেও একই বিষয়; ভ্যাট নিয়ে স্পষ্ট কথা নেই। এসব ক্ষেত্রে ১৫% দূরের কথা ১০% হারে ভ্যাট বসলেও বহু উদ্যোক্তা নারীর পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে।
অনলাইনে পোশাক ইত্যাদি বিক্রিতে অত্যুৎসাহীরা ভ্যাটের হার পাঁচ শতাংশ থেকে বেড়ে সাত শতাংশে দাঁড়ালে কি দমে যাবেন? মোটেই না। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দর্জির দোকানে যাঁরা পদধূলি দান করেন ১০% ভ্যাটে তাদের কিছু আসবে যাবে? এসব ক্ষেত্রে ধনীরা (এবং ধনীরা) আরও এক্সক্লুসিভ হবার আনন্দে গদগদও হতে পারেন। এরা নারী হোন বা পুরুষ হোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না-দেশের, জাতির বা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর। ভোগনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এঁরা সহায়ক শক্তি। হ্যাঁ, শিশুদিবাযত্ন কেন্দ্রকে ভ্যাটমুক্ত রাখা হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে উত্তম সিদ্ধান্ত। নারী উদ্যোক্তা এক্ষেত্রে করসুবিধা পাবেন এটিও সুখবর ।এতে পরিচালন ব্যয় কমবে। শিশুর নিরাপত্তা বিশেষ করে নারীর জন্য মহাস্বস্তিদায়ক একটা প্রণোদনা।
আরও আছে। ছোটখাট প্রতিষ্ঠান করে পোশাকের নকশা বা ডিজাইনের কাজ যাঁরা করেন, করছেন বা করতে চান তাঁদের ভ্যাটভাবনা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটাও এমন প্রণোদনা যা কিনা নারী-উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করবে। আরও একটি বিশেষ খবর। নারীকর্মী দিয়ে শো-রুূম বা বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করালে ঐ বিক্রয়কেন্দ্রের ভাড়ার ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য হবে না। এতে নারীর কাজের সুযোগ বাড়বে এবং ব্যবসায়ীর পরিচালন ব্যয় কমবে। ফলে পণ্যের দাম কমাবার সুযোগ থাকবে।
নারীর বাজেট নিয়ে বলতে গেলে সঞ্চয়পত্রের কথা আসবেই। নারীক্রেতার জন্য সঞ্চয়পত্র সামাজিক সুরক্ষার নামান্তর। ব্যাংকের সুদের হার নেমে যাবার পরে রাতারাতি সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বেড়েছে। উচ্চবিত্ত এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কারা কত লক্ষ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, সীমার বাইরে কিনেছেন কিনা, তা যাচাই করার কোনও গরজ বা ব্যবস্থা কারও আছে কিনা, থাকলেও এর ফলে গণ্যমান্য ক্রেতাদের কিছু যায় আসে কিনা আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি ৪৫ লক্ষ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কেনার একটা সীমা রয়েছে। এই ৪৫ লক্ষ অব্দি যাবার ক্ষমতা ক’জন ছাপোষা মধ্যবিত্ত নারীর আছে আমরা তাও জানি না। ২ কপি ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের সহজ নিয়ম মেনে আমাদের অনেকেই এই সুবিধাটুকু নিয়েছেন যার যার সাধ্যমতো। আয় করসীমার মধ্যে না হলে সরকার ৫% শতাংশ হারে কর কেটে রাখবেন তাতে আপত্তিও ছিল না কারো। কিন্তু এবারের বাজেটে ১০% কর কেটে নেবার ঘোষণা আসায় আকাশ ভেঙে পড়েছে নারীর মাথায়। সুদহার না বাড়িয়ে উৎসকর বাড়ানোর ফলে গত ৩০ জুনের মধ্যে সঞ্চয় ব্যুরো, পোস্ট অফিস এবং সোনালী ব্যাংকে নারীদের যে লম্বা লম্বা লাইন পড়েছিল তার শিকার হয়েছিলেন আনোয়ারা আলম। তাঁর প্রায় অর্ধ দিবসের কষ্টকর অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি। আর এবারে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনাই তো কঠিন হয়ে গেল আমনারীর পক্ষে। আয়কর নিবন্ধন না থাকলে সঞ্চয়পত্র সোনার হরিণ। ওই যে বিপুল ঋণখেলাপী সাধুরা রয়েছেন, কত কায়দা কানুন করে সুবিধা নিচ্ছেন, পার পাচ্ছেন অথচ সঞ্চয়পত্রের এইটুকু সুবিধাভোগী নিম্ন আয়ের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সুখ মহাজনদের সইলো না? সবশেষে স্যানিটারি ন্যাপকিনের কথা। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায়, ঝঞ্ঝাটমুক্তিতে এবং সময় বাঁচানোতে এমনকি নারী শিক্ষায়ও নানাভাবে এই পণ্যটি নারীর জন্য অত্যাবশ্যক। ৩০০ কোটি টাকার ডায়াপার ও ন্যাপকিনের বাজারের ৯০% শতাংশ দেশীয় কোম্পানিগুলোর দখলে। তাঁরা বলছেন, তাদের ৯০ টাকার একটি স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট থেকে সাড়ে ১২ টাকা শুল্ককর যায় সরকারি কোষাগারে। এর মধ্যে ১০ টাকা ভ্যাট এবং অন্যান্য কর বাবদ বাকিটুকু। আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্রে এই খাতে কর নেই; গত অর্থবছরে তুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা কিন্তু বাজেটে এ নিয়ে আশার কথা কিছু শুনতে পেয়েছিলাম। তার উত্তরে চারদিক থেকে বলা হলো আমাদের সরকার স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দিলে দাম কমতো; নারী উপকৃত হতো। গত ৩০ জুন (২০১৯) এক প্রজ্ঞাপনে এনবিআর জানিয়েছে, ন্যাপকিনের ৭টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে। বেশ। কিন্তু কোম্পানিগুলো বলছে, এর ইতিবাচক প্রভাব খুব বেশি পড়বে না কারণ আমদানি পর্যায়ে কাঁচামালে আগে থেকেই তেমন কোনও সম্পূরক শুল্ক ছিল না। আর ভ্যাট যা ছিল তা সরবরাহ পর্যায়ে দেওয়া ভ্যাট থেকে রেয়াত নেয়া যেত। (দৈনিক প্রথম আলো ৪ জুলাই ২০১৯) শেষ পর্যন্ত হিসেবটা তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো? বিশেষজ্ঞজনেরা আমাদের মতো কালাদের বেদমন্ত্র শোনানোর মতো বা অন্ধকে হাতি দেখানোর মতো যা শোনালেন, দেখালেন তাতে এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয় না যে কোথাও একটা ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। আসলে কৃতিত্ব যাঁরা চান (যে কোনো কাজে) তাঁদের কাজে এবং কথায় স্বচ্ছতা, সততা এবং স্পষ্টতা থাকা চাই।
শেষ কথাটা হলো যে দেশে ঘুমন্ত মা-বাবার মাঝখানে ঘুমন্ত কন্যা শিশুটি ধর্ষকের পৈশাচিকতার শিকার হয়ে প্রাণ হারায়, পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়া ক্লান্ত ঘুমন্ত কিশোরী জেগে উঠে নিজের বিবস্ত্র, ক্ষত-বিক্ষত দেহ আবিষ্কার করে ধানক্ষেতে বা পাটক্ষেতে, যে দেশে ধর্ষিতা কন্যা থানায় বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশের হাতে আবার ধর্ষণের শিকার হয়, যেখানে ‘মা হাওয়া’র নামে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার অধ্যক্ষের লালসার শিকার হয় শিক্ষার্থী, অধ্যক্ষের নির্দেশে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে যৌন হয়রানির বিচার চাওয়ার অপরাধে ছাত্রীকে পুড়িয়ে মারা হয়, বিয়ের কথা বলে প্রেমিক প্রেমিকাকে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে গণধর্ষণে মেতে ওঠে সেদেশের নারী নারীবান্ধব পরিবেশ পাবে কোথায় আর বাজেট দিয়েই বা করবেটা কি? তবু বাজেট তো বাজেট আর গল্প গল্পই।

x