নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য

শুক্রবার , ৫ জুলাই, ২০১৯ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ
34

সমাজের সাম্প্রতিক বড় ব্যাধি হলো নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও সহিংসতা। সমাজ ও সভ্যতা যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই যেন এ প্রবণতা বেড়ে চলেছে। মানুষ যতই সচেতন হচ্ছে, ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাদের অজ্ঞতা; বৃদ্ধি পাচ্ছে উদাসীনতা। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অশিক্ষাসহ নানা কারণে নির্যাতিত হচ্ছে নারীরা। যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে অসংখ্য নারীর জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, তালাকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। তাছাড়া এসব আইন সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ সচেতনও নয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, পৃথিবীব্যাপী এসব সহিংসতার শিকার হয়ে প্রতি বছর অসংখ্য নারীর মৃত্যু হচ্ছে। তাদের সবার কথা প্রকাশ পায় না। কেননা কথা বলতে দেওয়া হয় না তাদের। নির্যাতিত হওয়ার পর তাদের থাকতে হয় চাপের মুখে।
গত ৩রা জুলাই দৈনিক আজাদীতে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা রুখবে কে, ১৬ দিনে নির্যাতনের শিকার ১৪ জন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দারিদ্র, বেকারত্ব, অশিক্ষা, যৌতুক, পরকীয়া, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, ধর্মীয় গোঁড়ামিসহ নানা কারণে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের খামখেয়ালিপনা, প্রচলিত আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আন্দোলনকারী বিভিন্ন সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী এবং পুলিশের তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ঘরে-বাইরে সর্বত্র নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। পিতার হাতে ধর্ষিত হচ্ছে কন্যা, চাচার হাতে ৯ মাসের ভাতিজি। গত ১৬ দিনে চট্টগ্রামে ১৪ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশের নারীরা যখন রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের রোল মডেল হিসেবে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত হচ্ছেন, সেই সময় দেখতে পাচ্ছি, আসলে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কী অবস্থা আমাদের। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেগুলো নানা গবেষণায় উঠে এসেছে । নারীরা যতই রাজনীতি অঙ্গনে বিরাজ করুন না কেন, তাঁদের অগ্রযাত্রা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকে বিশ্বাস করেন এখনো-নারীর স্থান ঘরেই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নারীরা বোঝেনই না যে তাঁদের সঙ্গে সহিংসতা হচ্ছে। তাঁরা হয়তো নির্যাতন বলতে বোঝেন খুন অথবা ধর্ষণকে। মানসিক চাপকে তাঁরা নির্যাতন হিসেবে ভাবেন না। এ কথা স্বীকার্য যে বর্তমানে আমরা বৈশ্বিক লিঙ্গসূচকে অনেক এগিয়েছি। এটি মূলত হিসাব করা হয় একটি দেশের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় কতজন নারী নেত্রী রয়েছেন তার ওপর। সে হিসাবে আমাদের সূচক অনেক ওপরে। কিন্তু এর পরবর্তী স্তরসমূহে আমাদের অবস্থা ততটা সুবিধাজনক নয়। আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেক ঘাটতি আছে। দিন দিন আমাদের আইনগুলো কঠিন করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে শুধু আইন কঠিন করলেই হবে না, আইনের বেশ কিছু ফাঁকফোকর থাকে, যা আইন প্রয়োগে বাধার সৃষ্টি করে।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন জরুরি। মানসিকতা এক দিনে তৈরি হয়নি, এক দিনে পরিবর্তন সম্ভব না। এ জন্য আমাদের মৌলিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিছু কাজ করা উচিত। তাই বলা যায়, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। আর এ মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য পরিবার থেকেই কাজ করতে হবে। আমরা যদি আমাদের ছেলে সন্তানদেরকে নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে শিখাই এবং পুরুষরা যদি নারীর প্রতি সহিংসতা থেকে বিরত থাকেন তাহলে সমাজ থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব। এ বিষয়ে মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গি ও চিন্তা ভাবনার পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হবে। মানুষের সুকুমার হৃদয়বৃত্তিকে জাগিয়ে, বিনোদন-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জাগরণ মানুষকে তৃপ্ত করে, ভরিয়ে দিয়ে মানুষের পরিশুদ্ধ চিন্তা ও ভাবনা প্রকাশে সহযোগিতা করতে হবে। আমাদের হৃদয়কে বড় ও মহৎ করে তুলতে হবে-তাহলেই নারীকে তার যোগ্য আসনে বসাতে পারব আমরা। কাজ করতে হবে এমনভাবে- যাতে করে নারী আর কোনও সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের শিকার না হয়। এজন্য সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

x