নারীর জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক

শনিবার , ৩০ জুন, ২০১৮ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ
64

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার এই কিশোরী তার অসুস্থ পিতা, বাকপ্রতিবন্ধী ছোট দুটি বোন, নাবালক দু’টি ছোট ভাই এবং মাসহ ৭ জনের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসেবে অসুস্থ পিতার রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে সাবেক এক ইউপি সদস্য এবং স্থানীয় রিকশাচালক সমিতির সভাপতির নির্দয় ভর্ৎসনার শিকার হয়েছে এই কিশোরী। পথচারী তো বটেই খোদ রিকশা চালকদেরও টিটকিরি ও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে তাকে। মাজেদা ও তার পরিবারের জন্য দৈনিক সমকালের সম্পাদকীয় উদ্বেগ আমাদের ছুঁয়ে গেছে।

আজ ৩০ শে জুন (২০১৮)। মাসশেষের এই দিনটিতে এসে বলতে ইচ্ছে করছে এ মাসটি বিশ্বনারীর জন্য বেশ একটি পয়মন্ত মাস ছিল নিঃসন্দেহে। প্রথমত ঘরের কথা বলি। পারিবারিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক একশ একটা বাধার মুখে দাঁড়িয়ে সংসারের প্রয়োজনে, জীবিকার টানে অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়ে জীবনের নানা ক্ষেত্রে পথ খুঁজে নেবার ইতিহাস তৈরি করেছে এদেশের নারী। আজ দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও দেশের যা কিছু কৃতিত্ব তার অনেকখানি জুড়ে আছে নারীর অবদান। কৃষি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিত্য নতুন যত জরিপকর্ম হচ্ছে তার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে উঠে আসছে নারীর সাফল্যের কথা, অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে তার এগিয়ে যাবার কথা। কথার কথা বা জরিপের কথা দিয়ে পয়মন্ত মাস বোঝানো যাবে না। আসুন সরাসরি মাঠে যাই।

এই জুনের প্রথমার্ধে আমাদের ক্রিকেটের মেয়েরা দেশের জন্য নিয়ে এসেছে একটি আন্তর্জাতিক শিরোপার সম্মান। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ৭ম এশীয় কাপ (নারী) ক্রিকেটের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে ওরা একটা দারুণ ঘটনা, একটা বিশেষ ঘটনা ঘটিয়েছে, তৈরি করেছে একটি ঐতিহাসিক দিন। ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব ১৪ এ এফ সি কাপে ভারতকে ৪০ গোলে হারিয়ে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ নারী দল। তখন ওদের জন্য বা আজকের বিজয়ী ক্রিকেট দলের (নারী) তৈরি হবার জন্য, মাঠ পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ওদের উত্তীর্ণ হবার জন্য কোনও বিশেষ প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষণা বা পরিকল্পনা ছিল না। এদের জন্য ভালো কোচ, ধারাবাহিক অনুশীলন, এদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং আর্থিক নিশ্চয়তার বিষয় নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হয় নি। ওদের টিকে থাকার কথাটাই ভাবা হয়নি অথচ ওরা জয় করেছে, জয়ী হয়েছে। ওদের জয়রথ এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য, ‘জয়কে অভ্যেসে পরিণত করার জন্য’ যা কিছু করা দরকার এখন সংশ্লিষ্ট সকলে তা নিয়ে ভাবছেন। ওরা এঁদের ভাবতে বাধ্য করেছে যে বিশ্বমানের খেলার জন্য প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয় এবং সে যুদ্ধে নতুন করেই জয়ী হতে হয়। আমরা জানি দু’দুবার এমন একটি স্বপ্নের শেষ প্রান্তে গিয়েও শেষ বলে তুফান তুলে জয় ছিনিয়ে আনতে পারেন নি আমাদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খেলোয়াড়রা। তাঁরা যা পারেন নি তা করেছেন এই নারী ক্রিকেটাররা। ওদের ম্যাচ ফি বা ঘোষিত পুরস্কারের টাকার অঙ্ক নিয়ে আমরা কথা বলবো না। আমরা শুধু চাই যে ওদের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক।

গত ১৪ ই জুন শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশ্বকাপের ৮৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একজন নারী বিশ্বকাপের রেফারীর দায়িত্ব পালন করছেন। ব্রাজিলের ফার্নান্দা কলম্বো উইলিয়ানাকে আমাদের অভিনন্দন। ২০১৭ সালে অনূর্ধ্ব১৭ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের এসথার স্টাউব্লি নামের এক নারী প্রথম বারের মতো রেফারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এক বছরের ব্যবধানে ২৫ বছর বয়সী ‘বিউটি উইথ ব্রেইনস’, ইউনিভার্সিটি অব সান্তা কাতারিনায় শারীরিক শিক্ষায় স্নাতক ইউলিয়ানা সিনিয়র পর্যায়ের বিশ্বকাপে রেফারির দায়িত্ব পেলেন। এর আগে সহকারী রেফারি হিসেবে ব্রাজিলের প্রথম বিভাগ ফুটবলে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ফুটবল ভালবাসতেন বরাবর তবে ভালো খেলতে পারেন নি বলে রেফারিং কোর্সে ডাক পেয়ে আনন্দিত হন। মাঠের বাইরে মডেলিং করেন এই নারী। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের ক্লাব ক্রুজেইরো এবং আতলেতিকো মিনেইরোর ম্যাচে একটি ভুল অফসাইডের সিদ্ধান্ত দিয়ে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন কর্তৃক দু’সপ্তাহের জন্য বরখাস্ত হওয়া কবুল করেন। মানোন্নয়ন কোর্স মেনে নেন। শুধু তাই নয়, লিঙ্গ বৈষম্যমূলক এবং নিকৃষ্ট ধরনের যৌন সংবেদনশীল মন্তব্যের শিকারও হয়েছেন এই নারী। ক্লাব ক্রুজেইরোর কোচ বলেছিলেন, রেফারিং ছেড়ে পুরুষদের ম্যাগাজিনে ছবির জন্য উইলিয়ানার নগ্ন হওয়াই উচিত। কিন্তু মনোবল হারাননি তিনি। প্রস্তুতি নিয়েছেন, পড়াশোনা করেছেন এবং লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। উইলিয়ানাকে অভিনন্দন, আরও একবার।

গত ২৪ শে জুন গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রেখে পথে নেমেছেন সৌদি নারী। যার যার নিজের মতো করে দিনটি তাঁরা উদযাপন করেছেন। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার নারী ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে গেছেন এবং ২০২০ এর মধ্যে ৩০ লক্ষ নারী লাইসেন্স পাবেন। চলতি মাসেই রিয়াদ ও জেদ্দায় ড্রাইভিং শেখার প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে প্রচুর। অঘটন যে ঘটেনি তাও নয় তবে আজ সেসব কথা নয়।

সৌদি আরবের নারী অধিকার কর্মী হানা আল খামারি বলেন, এ ঘটনা সামাজিক ও লিঙ্গ বৈষম্য মোকাবেলায় সৌদি নারীকে অধিকতর সক্ষম করে তুলবে। সৌদি আরবের থিঙ্কট্যাঙ্ক অ্যারাবিয়া ফাউন্ডেশনের সিনিয়র বিশ্লেষক নাজহ আল ওতাইবি বলেন, সৌদি নারীর জন্য এটা পরিত্রাণের মতো। এর ফলে নারীর কর্মসংস্থানের যে সুযোগ সৃষ্টি হলো তা জাতীয় অর্থনীতিতে ৯০ বিলিয়ন ডলার যোগ করবে। সৌদি নারীর জন্য এই যে একটা দিন, ২৪ জুন ২০১৮, একি শুধুই যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন২০৩০ এর আওতায় তাঁর জারিকৃত এক ডিক্রি বলেই সম্ভব হলো? এতো অবশ্যই সত্য যে তাঁর সংস্কার পরিকল্পনায় সৌদি নারীর দীর্ঘদিনের অনেক স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, কিছু নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটেছে। সেই সঙ্গে এও সত্য যে শত বিধিনিষেধ সত্ত্বেও সৌদি নারীরা নিজেদের সংগ্রামটি কিন্তু করেই যাচ্ছিলেন। ১৯৯০ সালের ৬ নভেম্বর ৪০ জন নারী নিষেধাজ্ঞা ভেঙ্গে গাড়ি নিয়ে পথে নেমেছিলেন। ১ দিনের জন্য তাদের কয়েকজন কারাবরণও করেছিলেন। ২০০৭ এর সেপ্টেম্বরে গাড়ি চালানোর অধিকার দাবি করে হাজারেরও বেশি সংখ্যক নারী সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর কাছে আবেদন করেছিলেন। পরের বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসে (৮ মার্চ) ওয়াজেহা আলহুদাইয়া নিজে গাড়ি চালানোর ভিডিও ইউটিউবে পোস্ট করেন। ২০১১ সালের ১৭ জুন একদল নারী অধিকারকর্মী ফেসবুকে ‘উইমেন টু ড্রাইভ’ প্রচারে নামেন। এর দুসপ্তাহের মধ্যে ৭০ জন নারী গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামেন। অনেকে গ্রেপ্তার হন। মানতেই হবে যে ৩২ বছর বয়স্ক মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ হওয়ার পর গত ১ বছরের মধ্যে নারীর জন্য বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন।

২৩ জুন ২০১৮’র সৌদি নারী যখন গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন, যখন নারীর কর্মসংস্থানের নতুন পথ খুলে যাওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদানের অঙ্ক নিয়ে হিসেব নিকেশ হচ্ছে তখন আমাদের এক কিশোরী মাজেদাকে নিয়ে দৈনিক সমকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার এই কিশোরী তার অসুস্থ পিতা, বাকপ্রতিবন্ধী ছোট দুটি বোন, নাবালক দু’টি ছোট ভাই এবং মাসহ ৭ জনের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসেবে অসুস্থ পিতার রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে সাবেক এক ইউপি সদস্য এবং স্থানীয় রিকশাচালক সমিতির সভাপতির নির্দয় ভর্ৎসনার শিকার হয়েছে এই কিশোরী। পথচারী তো বটেই খোদ রিকশা চালকদেরও টিটকিরি ও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে তাকে। মাজেদা ও তার পরিবারের জন্য দৈনিক সমকালের সম্পাদকীয় উদ্বেগ আমাদের ছুঁয়ে গেছে। আমরাও চাই স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিবেচক ও দরদী মানুষদের সহায়তায় মাজেদা তার পছন্দের পেশা খুঁজে পাক বা ফিরে পাক। এবং এই অসহায় পরিবারটির পাশে আমরা ওই মহাজনদের চাই।

সহৃদয়, সচেতন মানুষেরা পাশে দাঁড়ালে কি হয় তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত পাকিস্তানের খাদিজা সিদ্দিকী। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আইনের ছাত্রী খাদিজা তাঁর প্রেমে প্রত্যাখ্যাত সহপাঠী যুবকের হামলার শিকার হন প্রকাশ্যে, রাস্তায়। ২৩টি ছুরিকাঘাতের ক্ষত সারাতে তাঁকে ৩ সপ্তাহ হাসপাতালে কাটাতে হয়। ২০১৬’র এ ঘটনার বিচারে লাহোরের আদালত ২০১৭’য় আসামীকে ৭ বছরের কারাদন্ডে দণ্ডিত করে। কিন্তু প্রভাবশালী আইনজীবী পিতা আপিল করে অপরাধী পুত্রকে বেকসুর খালাস করিয়ে নেন। খাদিজা মুষড়ে পড়েননি। সোচ্চার হয়েছেন বিচারের দাবিতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘উই আর উইথ খাদিজা’ হ্যাশট্যাগে সচেতন মানুষেরা জনমত গড়ে তুলেছেন। এ জনরোষ আদালতকে স্পর্শ করেছে। লাহোরের সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি খতিয়ে দেখার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা নিশ্চয়ই আশাবাদী।

x