নারীর চার পর্যায়

নাহিদা সুলতানা

শনিবার , ৬ জুলাই, ২০১৯ at ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
69

‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। বিশ্বে যা কিছু এল পাপ-তাপ, বেদনা- অশ্রুবারী, অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।’ (কাজী নজরুল ইসলাম)
আমাদের সমাজে নারীদেরকে কেবল অশ্রু আর অনুতাপের ভার বয়ে যেতে হয়। কল্যাণের কৃতিত্বটুকু থেকে তারা সর্বদাই অনেক দূরে থাকে। তবে সামগ্রিক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নারীদের অবস্থান তুলনামূলক অগ্রগতির পথে। এই ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রাখতে হলে আমাদেরকে প্রতিবন্ধকতাকে চিহ্নিত করে নির্মূল করতে হবে।
বাংলাদেশের সব নারীই বিভিন্ন কাজ করে থাকে। তবে যারা অর্থের বিনিময়ে কাজ করে শুধুমাত্র তাদেরকেই আমরা কর্মজীবী নারী বলে থাকি। নারীর যে বিশাল অংশ দিনরাত পরিশ্রম করে, পরিবার ও সন্তানের দায়িত্ব পালন করে তাদের কাজকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ২০১০ সালে এদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ, বর্তমানে তা প্রায় ২ কোটিতে উন্নিত হয়েছে। দ্য গ্লোবাল জ্যান্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ১৪৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭ তম। অর্থাৎ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতায়নের বিষয়টি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসনের সাথে সম্পৃক্ত। ক্ষমতায়নের ফলে সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়। যদিও বাংলাদেশের নারীরা ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তথাপি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের যোগান দিতে কেবল ১১.৩ শতাংশ নারী স্বীকৃতি পেয়ে থাকে। স্বীকৃতি পেলেও কেবল ৩.৬ শতাংশ নারী উৎপাদন বিষয়ে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়। আইনে বলা আছে, সম্পত্তির মালিকানায় নারীর অধিকার পুরুষের অর্ধেক। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, কেবল ৪.৬ শতাংশ সম্পদে নারীর মালিকানা রয়েছে। এই ৪.৬ শতাংশের মধ্যে মাত্র ৭.৫ শতাংশ নারী সম্পদের ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ পরিবারের পুরুষ সদস্যরা রাজী না হলে নারীরা সম্পদের ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরের ক্ষমতা রাখেনা। উৎপাদন বা উপার্জনের সাথে জড়িত থাকলেও মাত্র ১৫.৮ শতাংশ নারী আয়কৃত অর্থের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। মাত্র ১৬.৭ শতাংশ নারী সর্বসাধারণের সাথে মিশতে পারে। ভৌগলিক অবস্থান, বয়স, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, মিডিয়া এক্সপোজার ইত্যাদি বিষয়ের উপর বিভিন্ন সূচকে নির্ভর করে নারীর ক্ষমতায়ন। সহজভাবে বলা যায়, যে নারী অধিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারছেন, ক্ষমতার দিক থেকে তিনিই এগিয়ে। এই সুযোগ-সুবিধাগুলো হতে পারে বস্তুগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানবিক, তথ্যগত, মনস্তাত্ত্বিক ইত্যাদি যা মানুষ তার লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োগ করে।
আজকের নারী সমাজকে সামগ্রিক অবস্থান থেকে আমরা চারটি পর্যায়ে বিশ্লেষণ করতে পারি।
১ম পর্যায়: যেসব নারীরা শিক্ষার আলো হতে অনেক দূরে তারা এ পর্যায়ের। পরিবারে এই শ্রেণির নারীরা অর্থনৈতিক দিক থেকে অন্যের উপর নির্ভরশীল। অনেকে নিজের বা পরিবারের সচ্ছলতার জন্য কাজ করে থাকেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতা তেমন থাকে না। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের ঘটনা অহরহ হলেও প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকেনা। সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে এরা অনেক পিছিয়ে থাকে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নীরবে সয়ে যায়। নিজেকে নিরুপায় ও ক্ষমতাহীন দেখতে অভ্যস্ত হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এসব নারীরা নিষ্ক্রিয়।
২য় পর্যায়: এই পর্যায়ের নারীরা স্বল্প শিক্ষার আলো লাভ করে। পরিবারের অন্য সদস্যের উপর অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নির্ভরশীল থাকেন। তবে অনেকে সাধারণত নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের এসব নারীরা পোশাক কারখানা বা ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীর কাজ করে থাকেন। ১ম পর্যায়ের নারীদের মতো ২য় পর্যায়ের নারীরাও পরিবারে কম মর্যাদা পান। তাদের উপার্জন পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যক্তির গুরুত্ব সামান্যই। অর্থনৈতিক বা পারিবারিক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পরনির্ভরশীল হতে হয়। এ পর্যায়েও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন পরিলক্ষিত হয় এবং এরা সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতাহীন।
৩য় পর্যায়: এ পর্যায়ে রয়েছে শিক্ষিত নারী। শিক্ষিত নারীরা পরিবারে ১ম ও ২য় পর্যায়ের নারী অপেক্ষা কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকে। পরিবারে ছোটখাট বিষয়ে মত প্রকাশ করতে পারে, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কম থাকে। পেশাজীবী নারীরা কিছুটা স্বনির্ভর হয়। তবে তাদেরকে ঘরে ও কর্মক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বাজায় রাখতে হয়। এ পর্যায়ের নারীরাও কিন্তু শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়। তবে আত্মমর্যাদার জন্য তারা অধিকাংশ সময় চুপ থাকে। আবার কিছু ঘটনা পত্রিকার পাতায় নজরে আসে। সামাজিকভাবে ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।
৪র্থ পর্যায়: উচ্চশিক্ষিত নারীরা রয়েছেন এ-পর্যায়ে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রেই এই নারীরা অন্য সব পর্যায়ের নারী হতে ভালো অবস্থানে থাকেন। তবে অনেক সময় পরিবারে অথবা কর্মস্থলে তারাও নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়। উদাহরণ স্বরূপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার কথা স্মরণ করতে পারি, যিনি স্বামীর নির্যাতনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। আবার সেই মহিলা চিকিৎসকের কথাও বলতে পারি, যিনি কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষিত হয়েছিলেন।
নারীরা যেই পর্যায়ে বা যেই অবস্থানে থাকুক না কেন- কোনো বয়সেই, কোথাও তারা নিরাপদ নন। পরিবারে, সমাজে সর্বত্র তাদের অবস্থান অনেক পেছনে। অথচ নারী ছাড়া পৃথিবীর চলমান প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে বর্তমানে নারীরাই সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকলেও বৃহত্তর অংশটির উন্নতি সামান্যই। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, শিক্ষামন্ত্রী, বিচারপতি, সেনাপ্রধান এ জাতীয় গুরত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা মহাকাশে কোথাও পিছু হটেনি নারীরা। তবুও তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি, সম্মান ও নিরাপত্তাটুকু কেন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছেনা? সামপ্রতিক সময়ে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নারী হয়ে যে দক্ষতার ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন তা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। মহান সৃষ্টিকর্তা নারী ও পুরুষকে পরস্পরের সঙ্গীরুপে পাঠিয়েছেন। তাই নারীদের সম্মান, অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় নারী ও পুরুষ উভয়ের সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

x