নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতায়নের বিকল্প আছে কি?

নিপা দেব

শনিবার , ৪ আগস্ট, ২০১৮ at ৯:০০ পূর্বাহ্ণ
7

গেলো ২৪ জুন আরও একধাপ এগিয়ে গেল সৌদি নারীরা। ডয়েচেভেলের একটি খবরে পড়লামওইদিন গাড়ি চালানোর অধিকার পেলো ওই দেশের নারীরা। আর তাতেই আনন্দে ভাসছে সেখানকার নারীরা। প্রায় প্রতিদিনই গ্লোবাল মিডিয়ায় আসছে এ সংক্রান্ত নানা খবর। এরই মধ্যে সৌদিগায়িকা লিসার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়তিনি গাড়ি চালাচ্ছেন, এ্যাঙিলেটরে চাপ দিচ্ছেন, গিয়ার বদলাচ্ছেন এবং সেই সাথে উচ্ছল ভঙ্গিতে গান গেয়ে চলেছেন। তিনি লিখেছেন– ‘আমি রসিকতা করছিনা, অমি আজ গাড়ি চালাতে পারি।’

গাড়িচালকের আসনে বসে র‌্যাপ সঙ্গীত গেয়ে সেটি রেকর্ড করে এর ভিডিও তিনি নিজেই তুলে দেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। গানের কথা এরকম– ‘আমাকে কেউ নিয়ে যাবে, তার আর দরকার নেইআমার সাথে রয়েছে ড্রাাইভিং লাইসেন্স।’

একই সংস্থার অপর একটি সাম্প্রতিক খবরে দেখলাম, কুংফু শিখছে আফগান মেয়েরা। আফগান নারীরা যেখানে ঘরেই সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার বলে বিভিন্ন দেশে পরিচিত, যে দেশের নারীর কথা বলতে গেলেই হয়ত চোখের সামনে ভেসে উঠবে নিকাব পরা নারীদের ছবি। যুদ্ধবিগ্রহে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম রাষ্ট্রটিতে এখনো যেখানে নারীর অধিকারের কথা বলাও যেন অপরাধ। সেখানকার মেয়েরা কুংফু শিখছে! সত্যি এটাই যে, কাবুলের তুষারাচ্ছাদিত পাহাড়ের চূড়ায় একদল আফগান নারী কুংফু চর্চা করছেন। সেখানকার হাজারা সমপ্রদায়ের মেয়েরা এতে অংশ নিয়েছেন। চীনে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এই আত্মরক্ষামূলক খেলায় আফগান মেয়েদের অংশগ্রহণের ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে গেছে।

আরও বলে রাখা ভালো যে, যেখানে আফগানিস্তানের মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যেখানে প্রচলিত অধিকাংশ খেলাতেই তাঁরা অংশ নিতে পারেন না। সেখানে হাজারা সমপ্রদায়ের মেয়েদের কুংফু চর্চাকে ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবেই দেখছে পুরো বিশ্ব। প্রশিক্ষক হিসেবে রয়েছেন ইরান থেকে কুংফুতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী সীমা। বিশ বছর বয়সি সীমা আজিজি। তিনি বলেন, মূলত আত্মরক্ষার জন্য কুংফু শেখা হলেও এতে শারীরিক এবং মানসিক প্রশান্তিও মেলে। কাবুলে গত বছরখানেক ধরে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। এতে তাঁর বাবার সমর্থনও রয়েছে।

আরও একটি খবরে মনটাকে ইতিবাচক পরিবর্তনের ঢেউ লাগলোআর সেটি হচ্ছেখবরের কাগজে দেখলামভারতে পুরোহিত হিসেবে ডাক পড়ছে নারীদেরও। বছর কয়েক আগে দুজন হিন্দু বিধবাকে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের একটা মন্দিরে পুরোহিত হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। সেটা নিয়ে তখন খুব হৈচৈ হয়েছিল। সম্প্রতি শুধু মন্দিরে নয়, পারিবারিক ক্রিয়াকর্মের জন্যও ভারতে ডাক পড়ছে নারী পুরোহিতের। নারী নির্যাতন, ভ্রূণ হত্যা, শিশু বিবাহ, ধর্ষণএগুলো লেগেই আছে মূলত পিতৃতান্ত্রিক ভারতবর্ষে। আজও সেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে গণধর্ষণ হচ্ছে, ডাইনি অপবাদে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে নারীকে। এ কারণে বিদেশে ভারতীয় নারীর ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে, খাচ্ছে প্রতি পদে পদে। এরই মাঝে যখন দেখিসম্প্রতি পুণে শহরে একটি শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে ডাক পড়ে নারী পুরোহিত বর্ষা গাডগিলের। তখন তো অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করবেই। বর্ষার কথায়, ‘হাজার বছরের ঐতিহ্য, পরম্পরাকে ভেঙে এ পেশায় আসাটা সহজ ছিল না। অনেকে তো মনে করেন মেয়েরা নাকি এত কঠিন কঠিন সংস্কৃত শ্লোক, মন্ত্র ইত্যাদি মুখস্থ করে ঠিকমতো উচ্চারণই করতে পারবে না।’

অবশ্য শুধু বর্ষা গাডগিল নয়, পুণেতে এমন আরো কয়েকজন মহিলা পুরোহিত হিসেবে কাজ করছেন। অর্থাৎ খালি গা, গলায় গামছা আর ধুতি পরা পুরুষ পুরোহিতের জায়গায় একেবারে শাড়ি পরা পুরোহিতনারী স্বাধীনতার এ এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত নয় কি?

উপরের উল্লেখিত বিষয়গুলোর ধারাবাহিকতায় আরও একটি খবর দিতে চাই আপনাদের। আর সেটি হচ্ছেগতবছর ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) বৈঠকে প্রকাশ করা বিশ্বের সেরা দেশের তালিকার সবার ওপরে এসেছে জার্মানির নাম। ৬০টি দেশ স্থান পেয়েছে এই তালিকায়। বিশ্বের ৩৬টি দেশের ১৬ হাজার ২৪৮ জনের মাঝে জরিপ চালিয়ে তৈরি করা এই তালিকার শীর্ষে স্থান পেল জার্মানি। আর জার্মানি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডসকে ডিঙিয়ে নারীদের জন্য সবচেয়ে ভালো দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে ডেনমার্ক। বলা যায়নারীদের জন্য প্রায় স্বর্গের দেশ এখন ডেনমার্ক। অন্যদিকে নারীদের জন্যও এশিয়ার সেরা দেশ হিসেবে রয়েছে জাপানের নাম।

এবার আসি আমাদের দেশের প্রসঙ্গে। এদেশে বহু আগেই আমাদের নারীরা কুংফু, কারাতে থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের শরীরচর্চা ও আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ নিতে পারছে। গাড়ি চালাতে পারছে। সরকারিবেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উঁচুপদে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারছে। তবে যে জায়গাটায় আমরা অন্যান্য অনেক দেশের মতো এখনো পিছিয়ে আছিসেটা হচ্ছেনারীপুরুষের সমতা অর্জন। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম (ডাব্লিউইএফ)-এর ২০১৫ সালের রিপোর্ট বলছে, বেতনের পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীপুরুষের মধ্যে সমতা পুরোপুরি আসবে ২১৩৩ সালে, অর্থাৎ আজ থেকে ১১৫ বছর পর।

আমি মনেকরি, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অনেক বেশি মনোযোগ দিতে হবে। এখনো কেনোনারীর বেশিশ্রম পুরুষের কমশ্রমের সাথে তুল্য হবে। এখনো কেনো আমাদের সমাজে নারীর দুইদিনের পারিশ্রমিক বা মজুরি পুরুষের একদিনের পারিশ্রমিক বা মজুরির সমান হবে? গ্রামের কৃষিকাজ কিংবা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ অথবা শহরের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় এধরনের মজুরি বৈষম্য এখনো চরমে। কেনো এখনো নারীদের বেশিরভাগ শ্রমকে আর্থিকভাবে ‘অবিনিময়যোগ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে?

আমরা তো চাইসমতার বিশ্ব। কেননা, এই সমতার চর্চা ভবিষ্যতের সুন্দর মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলবে। সমতার পৃথিবী সুন্দর পৃথিবী। উন্নয়নের দৃশ্যত প্রমাণ নারীর জাগরণ। দেশের প্রগতির মাপকাঠি নির্ণয়ে সহজ পন্থা হচ্ছেনারীর মুক্তি। জাতীয় অগ্রসরতার উপায় হচ্ছেনারীর ক্ষমতায়ন। তাই এগিয়ে যাওয়া বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে আজকের বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতায়নের বিকল্প আছে কি?

x