নারীর ‘এ্যা রুম অব হার ওউন’ নিশ্চিত হবে কবে?

নিপা দেব

শনিবার , ২৭ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
26

‘…সমাজে পুরুষ মানেই সক্রিয়, কর্মতৎপর, জগৎ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ও সমাজ পরিবর্তনে সক্ষম। আর নারী মানেই লাজুক, অলস, কর্মবিমুখ, বহির্জগতে প্রভাব বিস্তার করার গুণ ও ক্ষমতাহীন। পুরুষ জীবননাট্যেও অভিনেতা, নারী দর্শকমাত্র।’
হ্যাঁ, নারীর জীবনের এই বাস্তবতা বহু পুরনো। যতো শিক্ষিতই হোক তার জীবনে নিজের জন্য কোনো সুখ থাকতে নাই। তার সব সুখই পরের জন্য ‘নিবেদিত’। বিয়ের পর কিংবা আগে, কী বাপের বাড়ি কিংবা স্বামীর বাড়ি- অধিকাংশ পরিবারেই ঘরকন্নার কাজে অর্থাৎ চুলাতেই নারীর সব খুশি ‘জ্বালাতে’ হবে। এটাই নারীর নিয়তি। এর ব্যতিক্রম হওয়া যাবে না। একটু অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নারী রসাতলে গেলো বলে চোখ লাল করবে সমাজ। কিন্তু, নারী ব্যতীত পুরুষের অস্তিত্ব কোথায়? পৃথিবীর বিকাশ কীভাবে সম্ভব? এ ভাবনা পুরুষ ভাবতে চায় না, পাছে যদি পুরুষের মাথা নত হয়ে যায় নারীর গৌরবের কাছে?
মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে সবকিছু মানিয়ে চলতে শিখিয়ে দেন আমাদের মা-বাবারা। মুরব্বি-স্থানীয়রা। পান থেকে চুন খসতেই বেশিরভাগ গ্রামবাংলার পরিবারে দায়ী করা হয় নারীকেই। প্রতিকার চাইলে বলা হয় নারীকেই সবার আগে শ্বশুরবাড়ির সবার সাথে মিলিয়ে চলতে হবে। ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’, কথা কম বলা নারীরা ধৈর্যশীল-সর্বংসহা, বাচালতা নারীর সৌন্দর্যহানি ঘটায়, মুখে বুঁজে সহ্য করা নারীরা অবলা এবং এটাই নারীর গুণ- এসব মিথ বাস্তব হিসেবে নারীকে মেনে চলতে শেখানো হয়। আর এ পাঠ শেখানো হয় নারীর বুঝের বয়স হওয়ার পর থেকেই। আর এভাবেই নারী ধীরে ধীরে পুরুষের সম্পত্তি হয়ে ওঠেন। এভাবেই উত্তারাধিকার সূত্রে নারীর এই সম্পত্তি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি সমাজে জারি রয়ে যায়।
কথাসাহিত্যিক উম্মে মুসলিমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েই বলা যাক। তিনি তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, ‘সম্পত্তির সংজ্ঞা কী? যা আমার অধিকারভুক্ত তাই সম্পত্তি। জড় পদার্থ, অবলা প্রাণী, ক্রিতদাস মানুষের স্থাবর সম্পত্তিরূপে পরিগণিত। পুরুষের চোখে এই তিন গুণাবলির আধার হচ্ছে নারী। এখনো পুরুষেরা স্ত্রীকে নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সময় তিনটা পোটলা প্রস্তুত করলে গোনার সময় গোনেন চারটি। বলাই বাহুল্য চতুর্থ পোটলাটি হচ্ছে স্ত্রী। অনেক স্ত্রী এখনো পোটলা পরিচয়েই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।’
বিখ্যাত সাহিত্যিক শেক্সপিয়ারও ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ লিখে অবলা নারীদের নারী-সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। আর পৃথিবীর এই একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পুরুষ- নারীর সহযোদ্ধা না হয়ে, হয়ে উঠে তার স্বামী তথা প্রভু। নারী তখন হয়ে পড়ে ক্রীতদাস, পুরুষের স্থাবর সম্পত্তি, যখন ইচ্ছে ব্যবহার করা কিংবা কেনা-বেচার জন্য পুরুষের ‘ঘটে তোলা জল’। এভাবেই সমাজে নারীকেন্দ্রিক আবহ নির্মিত হয়েছে। সারাদিন ঘরে কাজ করবে নারী, স্বামীকে পাগলের মতো ভালোবাসবে- এমন স্ত্রী-ই সমাজের চোখে লক্ষ্মী। আর এর বিপরীত আচরণ যদি কোনো পুরুষ করে তখন তাকে শুনতে হয় ‘স্ত্রৈণ’, ‘বউপাগলা’ এমন সব আপত্তিকর শব্দ। স্ত্রীর প্রতি পুরুষের অনুরাগকে প্রকাশ্য করে তোলা এ সমাজে ভাঁড়ের কাজ। ইজ্জতের প্রশ্ন। জেনে-শুনে পুরুষ নারীর প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করে এমন ‘কলঙ্ক’ মাথায় পেতে নিতে চায় না।
তবু সব ছাপিয়ে এটা এখন আশা জাগানিয়া ব্যাপার যে- নারীবাদী আন্দোলন এখন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারীর নিজস্ব পরিসর সন্ধানের এই আন্দোলন এখন পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সাধারণ সচেতন মানুষের আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে।
ভার্জিনিয়া উলফের বিখ্যাত সেই উক্তির সুর ধরেই বলতে চাই- নারীর জন্য ‘এ্যা রুম অব হার ওউন’ -নিশ্চিত করতে হবে। সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবী বলেছিলেন, ‘মানুষের গড়া সমাজে মানুষের এমন দুর্গতি কেন? কেন এত অসাম্য?’ ‘এই পৃথিবী আমার-ই জন্য’ ক্ষমতাবানদের এমন নির্লজ্জ চিন্তা কেন? তুচ্ছের জন্য মানুষ এভাবে নিজেকে বিকোয় কেন? মেয়েদের সবকিছুতে এত অধিকারহীনতা কেন? তাদের উপর অন্যায় শাসনের জাঁতা চাপানো কেন? তার জীবন অবরোধের মধ্যে কেন?’ -এই হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। চুলাতেই নারীর সব খুশি ‘জ্বালিয়ে’ দেওয়া যায় না। শুধু নারী পুরুষের জন্য নিবেদিত হবে কেনো? নারীকে ঘিরে পুরুষের সকল ‘নিবেদন’ কেবল কবিতা কিংবা সাহিত্যেই আমরা দেখতে পাই। বাস্তবের সাংসারিক জীবনে নারীর পাশাপাশি পুরুষ কবে নিবেদিত হবে? এভাবে কি ভাবতে সমাজ কখনও প্রস্তুত? এখনও প্রস্তুত?? সে যাই হোক, নারীকে তার নিজের অধিকার নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি চেতনাগত শৃঙ্খল থেকে নারীর মুক্তি নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে। পুরুষকে হতে হবে গণতান্ত্রিক। তার মনোভূমি থেকে উপড়ে ফেলতে হবে নারীকে দাবিয়ে রাখার ‘প্রবণতাগাছ’। তবেই ঘুচবে বৈষম্য। তবেই দেশ হবে নারী-পুরুষ সকলের। সকল মানুষের।
লেখক: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, চট্টগ্রাম

x