নারীর অংশগ্রহণ নেই কোথায়? কিন্তু…

অনামিকা চৌধুরী

শনিবার , ২৮ জুলাই, ২০১৮ at ৭:২২ পূর্বাহ্ণ
31

বাংলাদেশে ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে মাত্র পাঁচজন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে সংসদে প্রায় ৫০ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এছাড়া মন্ত্রিসভায় নারী আছেন, প্রধানমন্ত্রী নারী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী দলীয় নেতা নারী, এমনকি জাতীয় সংসদের স্পিকারও নারী দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশে সরকারের নীতি নির্ধারণে মন্ত্রীদের পরই যাদের ভূমিকা, তাঁরা হলেন সচিব। এই সচিব বা আমলারাই নীতি নির্ধারণ এবং নীতি বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করেন। আর সেখানে নারীদের অবস্থান দেখলে সহজেই বোঝা যাবে নীতি নির্ধারণ এবং নীতি বাস্তবায়নে নারীর অবস্থান।

২০১৭ সালের মাঝামাঝির এক হিসেব অনুযায়ীবর্তমান সরকারের প্রশাসনে সচিব পদমর্যাদায় কাজ করছেন মোট ৭৮ জন কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে মাত্র সাতজন নারী সচিব। দুই জন ভারপ্রাপ্ত সচিব। সবমিলিয়ে বলা যায়, নারী সচিব রয়েছেন মাত্র নয় জন। শতকরা হিসেবে মাত্র ১১ ভাগ।

এবার কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে নারী কর্মকর্তাদের হিসাব দেওয়া যাক। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে মোট ১৩৪ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারী ৩৫ জন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ৬৭ জনের মধ্যে নারী কর্মকর্তা ১২ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৫৭ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারী ৯ জন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ১১৬ কর্মকর্তার মধ্যে নারী ২৮ জন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ২২ জনের মধ্যে নারী কর্মকর্তা তিনজন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ২৬ জনের মধ্যে চার জন নারী কর্মকর্তা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৬৫ কর্মকর্তার মধ্যে নারী ১৫ জন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মোট ৩৮ জনের মধ্যে নারী কর্মকর্তা ছয় জন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ৪৬ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১১ জন নারী। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অবস্থা এরচেয়ে ভালো না। কোনো মন্ত্রণালয়েই নারীদের অবস্থান শতকরা ২০ ভাগের বেশি নয়।

এছাড়া সরকারি এবং আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৩৩৪টি। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮৩ হাজার ১৩৩, অর্থাৎ শতকরা ৭ দশমিক ৬ ভাগ। উপসচিব থেকে সচিব পদ পর্যন্ত নারীদের সংখ্যা গড়ে মাত্র ২ শতাংশ বা তারও কম। বিচার বিভাগে বিচারক পদের ১০ শতাংশ নারী হলেও হাইকোর্টে প্রধান বিচারপতি পদে এখনো কোনো নারীকে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৯৭ জন। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৭৬ লাখ প্রবাসীর মধ্যে ৮২ হাজার ৫৫৮ জন নারী। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ৮০ ভাগ কর্মীই নারী। আর দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহারকারীও নারী (তথ্যঋণ: ডয়েচেভেলে নিউজপোর্টাল)

আশার কথা হচ্ছেসংখ্যায় কম হলেও সব সেক্টরেসবখানে ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের নারীসমাজ। রাখছে দক্ষতার স্বাক্ষর। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও আমাদের নারীরা আপন পরিচয়ের স্বাক্ষর রাখছে। নারীরা এখন পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীতেও ভালো করছেন৷

কিন্তু, তবুও খটকা রয়েই গেছে। কেননা, যেভাবে নারীশিক্ষার হার বাড়ছে, যেভাবে কর্মক্ষেত্রে নারী নিজের দক্ষতার ছাপ রাখতে পারছে, সেভাবেসে হারে কি নারী প্রতিটি ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণ ও নীতির বাস্তবায়নে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পেরেছে? যদি নারী নীতি নির্ধারণে তাঁর অবস্থান সংহত করতে না পারে, তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন কীভাবে আমরা আশা করতে পারি? যদি বড়বড় পদে, ভালোভালো পদে নারী থাকার পরও প্রকৃত অর্থে নারীসমাজের প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব না হয়তবে সেটাকে কি নারীর ক্ষমতায়ন বলা যাবে? ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক তথ্য মতেনারীপুরুষের সমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক এগিয়ে থাকলেও মজুরি বৈষম্য যথাযথভাবে মোকাবেলায় বড় বেশি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি আমরা।

সুতরাং, নারীর অগ্রযাত্রায়, নারীর কর্মযাত্রায় পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আধিপত্য যতোদিন না কমবেনারীর কায়িক ও মানসিক শ্রমকে যতোদিন না পর্যন্ত যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবেযতোদিন না নীতিনির্ধারণ পর্যায়ের সকল স্তরে নারীকে রাখা হবেততোদিন পর্যন্ত নারীর সত্যিকারের ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে না। সময় পাল্টেছে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে না পাল্টানোর কোনো বিকল্প আছে কি?

x