নাফ নদীর বুকে ট্রানজিট জেটি

উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, টেকনাফ

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৪:৪৬ পূর্বাহ্ণ
26

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশ-মিয়ানমার ট্রানজিট জেটি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উক্ত জেটিসহ দেশের বেশ কিছু প্রকল্প উদ্বোধন করেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত এসব প্রকল্প উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
১৯৮১ সালের দিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার চুক্তি অনুযায়ী ১ দিনের জন্য টেকনাফ-মংডু যাতায়াত চালু হয়। এরপর হতে টেকনাফ থেকে মিয়ানমারে যাতায়াত করতে হতো কাঠের জেটি দিয়ে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হত। এজন্য এলজিইডি জেটিটি নির্মাণ করে। কিন্তু ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর মিয়ানমারে সৃষ্ট জাতিগত সহিংসতার জের ধরে ট্রানজিট যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দুই বছর পার হলেও এখনও তা আর চালু হয়নি। তবে এ জেটি দিয়ে ট্রানজিট যাতায়াত বন্ধ থাকলেও সেন্টমার্টিন, শাহপরীর দ্বীপ যাতায়াত ও নাফ নদীতে ভ্রমণ সহজ হয়েছে। এটি এখন টেকনাফের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জানা যায়, নাফ নদী বিভাজিত না হলেও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমা রেখাকে করেছে বিভাজন । প্রায় ৫২ কিলোমিটার নৌ সীমান্ত রেখা দু’দেশের নাফকে ঘিরে। কঙবাজার জেলার একমাত্র আর্ন্তজাতিক নদী নাফ। যার পশ্চিম অংশে বাংলাদেশ অন্যদিকে মিয়ানমার। টেকনাফের সৌন্দর্য ও নামকরণে নাফ নদীর প্রসঙ্গ চলে আসবেই। স্বচ্ছ স্রোতস্বিনী এ নদীর সৌন্দর্য বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না, এর সৌন্দর্য সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে হলে সরাসরি যেতে হবে সেখানে। প্রত্যক্ষ করতে হবে নাফ নদীর বহমান স্রোতধারা, জালিয়ার দ্বীপ, লাল দ্বীপ, ছোযার দিয়াসহ একাধিক ছোট ছোট দ্বীপের সৌন্দর্য্য। আশপাশের পাহাড়ের গঠন অপূর্ব। দেখতে হবে নাফ নদীর উপর নির্মিত পরিবেশ জেটি, সড়ক ও জনপথ রেস্ট হাউজ জেটি, শাহপরীরদ্বীপ জেটি ও টেকনাফ-মংডু ট্রানজিট জেটির মনোরম দৃশ্য। নাফের পশ্চিমে কেওড়া গাছের সবুজ বেস্টনী যেন প্রকৃতির অপূর্ব এক লীলাভূমি। নির্মল হাওয়ার সঙ্গে উপকূলের মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করতে নাফ নদীর তীরে এবং বেড়িবাঁধে প্রতিদিন ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। এর উপর সদ্য নির্মিত দৃষ্টিনন্দন সুবিশাল ট্রানজিট জেটি এলাকার পর্যটন খাতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। টেকনাফ পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে নাফ নদের উপর নির্মিত এ ট্রানজিট জেটি দেখতে প্রতিদিন শত শত নারী, পুরুষ, শিশু ছুটে আসছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেটি এবং এর আশপাশের সৌন্দর্য ঘুরে-ফিরে দেখছেন অনেকেই। স্থানীয়দের পাশাপাশি টেকনাফ ভ্রমণে আসা পর্যটকরাও এ জেটি দেখতে আসছেন। সংশ্লিষ্টরা জানায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩১ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এ জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ৫৫০ মিটার, প্রস্থ ৪.০৫ মিটার। ল্যান্ডিং এরিয়ার দৈর্ঘ্য ৪২ মিটার এবং প্রস্থ ৩১ মিটার। জেটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এবং নির্মাণ শেষ হয় চলতি বছরের মার্চ মাসেই। জেটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রামাগার,শৌচাগার, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ব্যবহারের জন্য ৭টি সিঁড়ি রয়েছে। এ ছাড়া পর্যটকদের সুবিধার্থে জেটির সম্মুখভাগে ৯০ মিটার দীর্ঘ ও ৬০ মিটার প্রশস্ত গাড়ি পাকিংয়ের জায়গা নির্দিষ্ট আছে। নৌকা ভিড়ানোর উপযোগী কিছু রাবার ফিটিংস’র কাজ এখনো শেষ হয়নি। ঠিকাদার এ কাজটি না করায় নতুন টেন্ডার আহবান করা হয়েছে। খুব দ্রুত সময়ে এ কাজটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলী। তবে গত ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের কয়েকটি স্থাপনায় সন্ত্রাসী হামলার রেশ ধরে বন্ধ রয়েছে টেকনাফ-মংডু ট্রানজিট যাতায়াত। ১৯৮১ সালের দিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার এক চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সীমান্ত এলাকার মানুষের যোগাযোগ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ রাখার প্রত্যয়ে ১ দিনের ট্রানজিট যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করে। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে টেকনাফ-মংডু ট্রানজিট যাতায়াত করতো একটি কাঠের জেটির উপর দিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনে জাতিগত বিরোধের জের ধরে দু’দফায় প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে ট্রানজিট যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গত এপ্রিল মাসের শেষদিকে জেটি উদ্বোধন করার কথা থাকলেও অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল এটি উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের আগে থেকেই প্রতিদিন শত শত নারী পুরুষ ও শিশু এই জেটি দেখতে আসেন। অনেকে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার অংশ দেখতে এ জেটিতে যান। আবার কেউ কেউ জেটির বিভিন্ন অংশে বসে বড়শী ফেলছে বা জাল পেতে মাছ ধরছে। সব মিলে এ জেটি এখন টেকনাফের একটি অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জেটি পরিদর্শন করে মুগ্ধ হয়েছেন বিবিসি’র রির্পোটার মিস পপি। তিনি সম্প্রতি টেকনাফের এ জেটি দিয়ে নাফ নদী ভ্রমণ করেছেন। তিনি বলেন, নাফ নদীতে এটি খুবই সুন্দর জেটি, কার্যত পর্যটক আকৃষ্ট করছে এ জেটি। জেটিতে গেলেই একদিকে মিয়ানমার, অন্যদিকে বাংলাদেশের পাহাড় দেখে যে কেউই বিমোহিত না হয়ে পারবেন না। টেকনাফ পৌর সভার মেয়র জানান, সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকদের সুবিধার্থে এবং ট্রানজিট ব্যবহারের লক্ষ্যে জেটিটি করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হওয়ায় পর্যটনের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সাংসদ আব্দুর রহমান বদি বলেন, টেকনাফকে পর্যটন জোনে পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাফ নদীতে দৃষ্টিনন্দন জেটিটি তৈরি করা হয়েছে। এজেটি টেকনাফের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। শুধু মিয়ানমার যাতায়াত করবে তা নয়, এটি ব্যবহার করে অল্প সময়ে সহজে সেন্টমার্টিন যাতায়াত করতে পারবেন পর্যটকরা। নাফ নদী ভ্রমণও করা যাবে সহজে। ফলে পর্যটন খাত আরো প্রসারিত হবে।

x