নানিয়ারচরে পাহাড় ধসে নিহত ১১

রাঙামাটি প্রতিনিধি

বুধবার , ১৩ জুন, ২০১৮ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
226

গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড় ধসে দুই মাসের শিশুসহ ১১জন নিহত হয়েছেন। সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার (১২জুন) সকাল পর্যন্ত নানিয়ারচর উপজেলার পৃথক ৫টি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, গত কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিতে পাহাড় ভেঙে মাটিচাপা পড়ে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নে ছয়জন ও নানিয়ারচর ইউনিয়নে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেনবড়পুল পাড়া এলাকাা একই পরিবারের সুরেন্দ্র লাল চাকমা (৪৮), রাজ্য দেবী চাকমা (৪৫) সোনালী চাকমা (০৯), রুমেল চাকমা (১২), ধর্মচরন কার্বারী পাড়ার ফুল দেবী চাকমা (৫৫) ইতি দেওয়ান (১৯), স্মৃতি চাকমা (২৩) ও আয়ুর দেওয়ান (২ মাস)। বুড়িঘাট ইউপির হাতিমার গ্রামের রিপেল চাকমা (১৪), রিতা চাকমা (), ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের চোধুরীছড়ার বৃষকেতু চাকমা (৬০)

ধর্মচরণ কার্বারী পাড়ার নিহত ফুল দেবী চাকমার দুই ছেলে রিগ্যান দেওয়ান ও ইমান দেওয়ান বলেন, মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে যখন টানা বৃষ্টি হচ্ছিল, আমরা পরিবারের সবাই একসাথে একটি রুমে গিয়ে বসেছিলাম এবং যদি কোনো বিপদ হয় কি করবো সেটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঠিক তখনি বিকট শব্দে পাশের পাহাড় ধসে পড়ে বাড়ির ওপর। এতে দুই মাসের শিশুসহ বাড়ির তিন মহিলা মাটির নীচে চাপা পড়েন এবং ইমান দেওয়ান অর্ধেক চাপা পড়েন। রিগ্যান বলেন, গ্রামবাসীর সহায়তায় ইমানকে রক্ষা করা গেলেও মা, নিজের স্ত্রী, বাচ্চা ও বোনকে রক্ষা করতে পারিনি।

নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আব্দুল্লাহ আলমামুন তালুকদার বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে আর্থিক সহায়তা ও চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। টানা বর্ষণে নানিয়ারচর উপজেলার ইসলামপুরে ৪৫টি, বগাছড়িতে ৪২ ও বুড়িঘাটে একটি স্থানে পাহাড় ধস হয়েছে। এসব এলাকায় মানুষের বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অপরদিকে, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য ত্রিদীব কান্তি দাশ জানিয়েছেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে।

রাঙামাটি সিভিল সার্জেন ড. শহীদ তালুকদার জানান, নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড় ধসের ১১জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। কয়েকজনকে নানিয়ারচর উপজেলা স্থাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রাঙামাটি ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দিদারুল আলম জানান, আমরা ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে লাশ উদ্ধার করেছি। অপরদিকে মঙ্গলবার সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, রাঙামাটিখাগড়াছড়ি সড়কে ভারী বর্ষনে পাহাড় ধসে ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের জুড়াছড়ি এলকায় সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেনাবাহিনী ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় জনগনের সহযোগিতায় হালকা যানবাহন চলাচল শুরু হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে সাধারন মানুষকে অনেক দুর্ভোগে পড়তে হয়।

রাঙামাটি সড়ক জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদ হোসেন জানান, গত চারদিনের টানা বর্ষণে রাঙামাটি জেলায় প্রায় ১২৮টি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাঁচটিরও অধিক স্থানে সড়ক ভেঙ্গে গেছে। সড়কের কংক্রিট উঠে বড় বড় খানাখন্দ আর গর্তে পরিনত হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া শহরের রাঙামাটি চেম্বার অব কর্মাস ভবনের পাশ্ববর্তী সড়ক, সিনিয়র মাদ্রাসার পাশ্ববর্তী দেয়াল ও চম্পকনগর এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা অফিসের দেয়াল, টিটিসি, বিজিবি রোড, ডিয়ার পার্ক, ঘাগড়া, সাপছড়ি, রাঙাপানি, পুলিশ লাইন ধসের ঘটনা ঘটেছে।

উল্লেখ্য, গতবছর ১৩ জুন রাঙামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ১২০ জন মানুষ প্রাণ হারায়। আহত হয় অর্ধশতাধিক। এছাড়া সেসময় ১৪৫টি স্থানে পাহাড় ধস হয়ে সারা দেশের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাঙামাটি।

বরকলে পাহাড়ি ঢলে একজন নিখোঁজ ঃ

সরল মুনি চাকমা (৬৫) নামে এক ব্যক্তি গতকাল (সোমবার) স্রোতের পানিতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে। বরকল উপজেলার সীমান্তবর্তী বড়হরিনা ইউনিয়নের নোয়াদাম গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নোয়াদাম গ্রামের মৃত বাজি গুচ্ছে চাকমার ছেলে সরল মুনি চাকমা তার আত্মীয়ের বাড়িতে সোমবার দুপুরে দাওয়াত খেতে যায়। সেখান থেকে নিজের বাড়িতে ফেরার সময় পাহাড়ি ছড়ার পানির স্রোতে ভেসে যায়। হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে অনেক খোজাঁখুজির পরেও তাকে পাওয়া যায়নি। সরল মুনি চাকমা বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছে।

এ ব্যাপারে বড় হরিণা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নিলাময় চাকমা ঘটনার সত্যটা স্বীকার করে জানান, টানা কয়েক দিন বৃষ্টির কারনে কাপ্তাই হ্রদের পানির পাশাপাশি পাহাড়ি ছড়া ও ঝর্ণার পানি বেড়ে তীব্র স্রোতের সৃষ্টি করেছে। সরল মুনি চাকমা বাড়ির পাশে ছড়া পাড় হওয়ার সময় স্রোতের পানিতে ভেসে যায়। অনেক খোঁজাখুজির পরেও রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাকে পাওয়া যায়নি বলে চেয়ারম্যান জানিয়েছেন।

x