নানা সমস্যায় জর্জরিত সন্দ্বীপ সরকারি এবি কলেজ

নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যাও

অপু ইব্রাহিম, সন্দ্বীপ

সোমবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ
186

নানা সমস্যায় জর্জরিত সন্দ্বীপ সরকারি হাজি আবদুল বাতেন (এবি) কলেজ। নানা জটিলতায় খুঁড়িয়ে খুড়িঁয়ে চলছে কলেজের কর্যক্রম। উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষক স্বল্পতা, অবকাঠামো ও পরিবহন সংকট। বর্তমানে কলেজটিতে বিভিন্ন পদে ৫৪ শিক্ষকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। রয়েছে কর্মচারীরও সংকট। নেই কোন বহুতল বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন। এ যেন এক নেই নেই হাহাকার। এতো সমস্যার ভিড়ে বিগত ৫ বছরে ফল বিপর্যয় ঘটে আসছে। ২০১৮ সালে পাসের হার ৪৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৩৭ দশমিক ১০ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৪৭ দশমিক ০৫ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৪৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৪৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। উত্তর চট্টগ্রামের ১ম সরকারি কলেজ হওয়া সত্ত্বেও বরাবরই ফল খারাপ করে আসছে এবি কলেজ। যেখানে চট্টগ্রামের অন্য সরকারি কলেজগুলোতে ঈর্ষণীয় ফলাফল। সেখানে সন্দ্বীপ সরকারি হাজী এবি কলেজের ফলাফল বরাবরই হতাশ করে আসছে। এর জন্য শিক্ষক সংকটও অনেকাংশে দায়ী।
জানা যায়, সরকারি হাজী এবি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি (পাস), বাংলা বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু আছে। বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। রসায়ন, প্রাণিবিদ্যা, ইসলামের ইতিহাস, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের কোন শিক্ষক নেই। কিন্তু ইংরেজি , গণিত, সমাজ কয়েকটি বিভাগে ৫ জনের জায়গায় বড় জোর ২ জন করে শিক্ষক আছেন। বাংলা অনার্স খোলার পর ৪র্থ বর্ষের ছাত্রছাত্রী রয়েছে। কর্মচারীরও সংকট রয়েছে কলেজটিতে। ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীর ৩৩ টি পদের মধ্যে ৫ জন কর্মরত। মেঘনার রোষানালে সন্দ্বীপ আজ শ্রীহীন বিবর্ণ। সরকারি হাজী এবি কলেজও এই নদীর রোষানল থেকে মুক্তি পায়নি। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে বর্তমানে কলেজটি মূলভূখন্ডের মাঝামাঝি বৃহত্তর মুছাপুর ইউনিয়নে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্থানান্তরের ফলে ৬.২৪ একর জায়গায় বিগত ২০০৭ সালে কলেজটির বেশ কিছু টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক বড় জায়গা নিয়ে ক্যাম্পাস হলেও তা বেশ এলোমেলো। যেখানে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা। এই নতুন ক্যাম্পাসের অবকাঠামো কলেজ পর্যায়ে পাঠদান ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম পরিচালনার অনেকটা অনুপযোগী। গ্রীষ্মে অসহনীয় গরমে ও বর্ষায় বৃষ্টির আওয়াজে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কলেজটির অবস্থান ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এলাকায়। এই অজুহাতে কলেজে গড়ে উঠেনি কোন পরিকল্পিত অবকাঠামো। শুধু তাই নয়! নেই পর্যাপ্ত বসার জন্য বেঞ্চ। পরীক্ষার সময় অন্য বিদ্যালয় থেকে ১০০ জোড়া বেঞ্চ ধার করতে হয়। যা খুবই কষ্টসাধ্য ও ভোগান্তি। সন্দ্বীপের যাতায়াত খরচ খুবই বেশি। দৈনিক ২০০ টাকা যাতায়াত ভাড়া দিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ক্লাস করতে আসে না। কলেজে নেই কোন আবাসিক হোস্টেল। হোস্টেল থাকলে ছাত্রছাত্রীরা হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করতে পারতো। সন্দ্বীপের প্রথম চালু হওয়া একটিমাত্র বিষয় বাংলা অনার্সের অবস্থা আরো শোচনীয়। সন্দ্বীপের ছাত্রছাত্রীদের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে এই কলেজে প্রথম অনার্স চালু হয়েছিলো। প্রথম কয়েক বছর কুমিল্লার একজন শিক্ষক থাকাকালীন ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস করার সুযোগ পেলেও তিনি ২০১৬ সালে বদলি হয়ে যাওয়ার পর ক্লাস হয়না। বাংলা বিভাগের ছাত্রী সারমিন আক্তার মিশু বলেন, তৃতীয় বর্ষে একদিনও ক্লাস না করেই ফাইনাল পরীক্ষা দিতে হচ্ছে চট্টগ্রাম গিয়ে। অনার্সের পরীক্ষার কেন্দ্র চট্টগ্রাম হওয়ায় আমাদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। ক্লাস না হওয়া এবং কেন্দ্র চট্টগ্রামে হওয়া নিয়ে চরম অসন্তোষ অনার্সের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। সন্দ্বীপ এডুকেশন সোসাইটি চট্টগ্রামের সভাপতি রাজিবুল আহসান সুমন বলেন, সন্দ্বীপ কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে দ্বীপের শিক্ষাক্ষেত্রে ভালো অবদান রেখে আসছিলো। বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে লেখাপড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষকদের আবাসন সমস্যার কারণে শিক্ষকরা সন্দ্বীপ থাকতে চায় না। বেশিরভাগ শিক্ষক দেয়া হয় উত্তরবঙ্গ থেকে। তাই শিক্ষকরা আসার আগে যাওয়ার চিন্তা করে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে ক্লাসে উপস্থিতি ধরে না রাখার কারণে ফল বিপর্যয় ঘটছে। আবাসন সমস্যা সমাধান ও শিক্ষক স্বল্পতা দূরীকরণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের জোর দাবি জানাচ্ছি।
কলেজ অধ্যক্ষ ডঃ ফজলুল করিম বলেন, কলেজের পড়ালেখার মান উন্নত করতে হলে আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা জরুরি। বিশেষ করে অবকাঠামোর দিক থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে কলেজটি। অবকাঠামো বাড়াতে হবে। শিক্ষক বাড়াতে হবে। কলেজে ভালো অবকাঠামো, ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের জন্য আবাসন খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। গ্রামের চেয়ে শহরের শিক্ষকরা বেতন ভাতা বেশি পায়। তাই শিক্ষকরা গ্রামে থাকতে চায় না। এ বৈষম্যও দূর করা প্রয়োজন। সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। খুব শ্রীঘ্রই কলেজের সমস্যার সমাধান হবে।
প্রসঙ্গত ১৯৬৯ সালে সন্দ্বীপের বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী হাজী আবদুল বাতেন সওদাগর সন্দ্বীপের পুরাতন টাউন থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৯ সালের ৭ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কলেজটিকে জাতীয়করণ করেন।

x