নাজিয়ার গল্প

আনন্দময়ী মজুমদার

শনিবার , ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ
64

নাজিয়া যেভাবে শিরদাঁড়া শামুকের খোলের মত বেঁকিয়ে গোল হয়ে উবু বসে তরকারি কাটছে তাতে মনে হচ্ছে সে আজকে আরো একটু ছোটো হয়ে গেছে, অদৃশ্য হয়েই যেতে পারে। হাতের জোর ক্ষিপ্রতা, শরীরের তৎপরতা নেই। গত রাতে দেলোয়ার তাকে বটি নিয়ে মারতে এসেছিল। বিয়ের পর থেকে আজ পাঁচ বছর হল এই কাহিনী চলছে। নাজিয়া খাটিয়ে কাজ করে। শ্বশুর শাশুড়ি স্বামী আর কন্যাকে খাওয়ায়, তার সঙ্গে নেশাড়ে স্বামীর মারে চৌপাট হয়ে যায়। আবার উঠে দাঁড়ায়। এই চক্করের মধ্যে কুলসুম জন্ম নেয়। সাহসী কুলসুম। মা ছাড়া দুনিয়ায় আর কারো পরোয়া করে না। মাকে পেলে এই চার বছর বয়েসেও বুকের বোঁটা কামড়ে এমনভাবে ঝুলে থাকে, মনে হয় নাজিয়ার দেহ বোধহয় খড়ের মতো খুলে পড়বে। গতকাল বাসে চড়চাপড় বসিয়েছিল লোকটা। এতোগুলো লোকের সামনে হেনস্থা হওয়া এই প্রথম। নাজিয়া জ্বরের ঘোরে কুলসুমের মুখ দেখছিল। বাসের যাত্রীরা ওদের আলাদা করে দেয়। দেলোয়ার গোঁ গেঁাঁ করতে করতে তাঁর নেশাড়ে উন্মাদ চোখ দুটো ঘুরিয়ে নিয়ে সামনের আসনে বসতে বাধ্য হয়। নাজিয়া মাটির মত অদৃশ্য আর শিথিল আর বাকহীন হয়ে মিশে যায় পেছনের ঠেলাঠেলির ভিড়ে। ওই বাসেরই শেষ আসনে। আরো মহিলা বাচ্চার গাদাগাদির মধ্যে। চোখের কোন দিয়ে জল পড়ে না। রাত এগারোটায় ঢাকায় পৌঁছেছিল বাস। নামার সময় দেলোয়ার তাঁর পুরুষামি জাহির করতে শুরু করেছিল নাজিয়ার ছোটখাটো শরীরের ওপর। চাঁদের কলঙ্কের মত কালি পড়া নাজিয়ার চোখ। রাস্তার মধ্যে। কেউ ছিল না তাকে থামায়। মানুষের আত্মা কোথায় থাকে? একটা টিপ সই দিতে গিয়েছিল নাজিয়া এক দিনের ছুটি নিয়ে। তিন মাসে পাঁচ হাজার টাকা সরকারী অনুদান, কুলসুমের জন্য, নাজিয়া সে টাকা মরে গেলে দেলোয়ারকে দেবে না। নাজিয়ার আত্মাটুকু কুলসুমের মুখে আয়নার মতো দেখা যায়। নেশাড়ে স্বামীর বটি নিয়ে তাড়া করা রাতের পরও নাজিয়া টাকা দিতে পারেনি। তিন বছর ধরে যে তিন লাখ টাকা সে জমিয়েছে সে সব দশ দিন পর পর হেনস্থা করে বাগানো হয়েছে। কুলসুমের পড়াশুনোর জন্য জমানো, নাজিয়ার একখণ্ড জমি কেনা, এই সব আর হয়নি। আর কিছু বাগিয়ে নিয়েছে শ্বশুর কবেকার কোন ঋণশোধ করার উদ্দেশে। শ্বশুর বুঝে নিয়েছে, টাকার কল ঘরের বউ। ছেলে মারলে কিছু না কিছু টাকা তো বেরোবে, যতই হিক্কা উঠুক। পালাবে কোথায়। কুলসুমকে জিম্মি রেখে শাশুড়ি নাকি-কান্না গায়, হায় আল্লাহ, কী হইল রে! মেয়েডারে জানে মারল রে। কুলসুম এক বনের মেয়ে। মোগলির মত স্বাধীন, সপ্রতিভ, নির্ভীক, বেপরোয়া, বুদ্ধিমান। নাজিয়ার ধারণা একটা একটা পয়সা জমিয়ে সে তাকে প্রাইভেটে পড়াতে পারবে। তার জন্মদিনে সে কেক কেনে, বিরিয়ানি আনে, ত্রিশজন ভাড়াটেকে খাওয়ায়, ছোট মুখ চাঁদপনা হয়ে আরো চকচক করতে থাকে। চাচা শ্বশুরের জন্য পঙ্গু হাসপাতালে পাঁচ শ টাকার ফল নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ায়। যার যেখানে ফ্যাসাদ তাকে মুশকিল আসান হতে হয়। দেলোয়ার তার মোবাইল ফোনটা জিম্মি রেখেছে। টাকা না দিলে ফেরত দেবে না। নাজিয়া তরকারি কোটে।
চোখের তলায় যে দাগ তা নীল না, সবুজ না, লাল না, কোনও রঙ নেই সেই দাগের। সে দাগ ছোঁয়া যায় না। আত্মার মত রঙহীন। যে আত্মা মাঝেমাঝে লকলকে লাউয়ের ডগার মতো বাড়ে, তখন সেই দাগ দেখা যায় না। তখন নাজিয়ার মেরুদন্ড সোজা সরল আগুনের মতো ওপর দিকেই উঠে থাকে। তখন নড়লে-চড়লে মনে হয় একটা পাতলা ফিনফিনে কাঠামোর মধ্যে কাঠবেড়ালির শক্তি ক্ষিপ্রতা আর বুদ্ধি পোরা আছে। আর মাঝেমাঝে সেই আত্মার গোড়ায় ঘোল ঢেলে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। আজ সেরকম একটা দিন। নাজিয়া বেঁকে আসছে, ছোট হয়ে আসছে, যেন দেখতে দেখতে মিলিয়ে যাবে চেশায়ার বেড়ালের মত। দুনিয়ার কোনো অরণ্য নেই ওর আত্মাকে বলে, এসো, ঘরে এসো।

x