নাইতে-খাইতে বেলা যায়

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৩১ জুলাই, ২০১৮ at ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
24

কথা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ তাঁর ডায়েরি ও শেখ হাসিনার লেখা বই যাঁরা আত্মস্থ করেছেন, তাদের মাঝে এই বিপরীত আচরণ কেন! তাঁদের কথা ও কাজে এত বৈপরীত্যইবা কেন? শোকের মাস আগস্টে এনিয়ে আত্ম সমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সময় এসেছে। নাইতে খাইতে বেলাগেলে কিন্তু আত্মশুদ্ধি বা সমালোচনা কোনো কাজে আসবে না। কারণ, ক্ষমতা ও অবৈধ সম্পদ কখনো কারো চিরস্থায়ী হয় না। সাক্ষী ইতিহাস।

জাতীয় শোকের মাস দরজায়। পিছু ফিরলেই মাত্র কয়েক দশক সময়। এর মধ্যে আমাদের দেশে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক দানব হটাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজের জীবনকর্ম সবকিছু বাজি রাখলেন। পাকিস্তান নামের বিকলাঙ্গ রাষ্ট্রটির জন্মের পরপরই পশ্চিমা পাকিদের নব্য অভিজাত চক্র বাঙালিকে তাদের পোষা গোলাম বানানোর নোংরা খেলায় মেতে ওঠে। এরা বাঙালিকে মানুষ নয়, ভেড়ার পালের বেশি মর্যাদা দিতে রাজি ছিল না। বাঙালি ভেড়ার পাল দুধ দেবে, পশম দেবে, মাংসের যোগান দেবে! বৃটিশ কেতা এবং ফরাসি পারফিউম, মদ, প্যারিসের লন্ড্রিতে কাঁচা নিভাঁজ দামি পোশাক পরে জিন্নাহ ব্রান্ড ইসলামের খাদেম পাকি অভিজাত চক্র তা পরম আয়েশে ভোগ করবে। এটাই ছিল তাদের উর্বর মস্তিষ্কের নিখুঁত পরিকল্পনা প্রমাণ খুঁজতে উইকিপিডিয়া সার্চ দেয়ার দরকার নেই। বৃটিশ শাসন মুক্তির বছরের মাথায় ঢাকায় এসে ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্ধত ঘোষণাতেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

পরের ইতিহাস সবার জানা। ৪৮ সালেই মুসলিম লীগের পেট ছিড়ে জন্ম নেয় আওয়ামী লীগ। শুরুতে মাঝখানে মুসলিম নাম রাখা হলেও পরে তা ছেটে ফেলা হয়। সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙলা ভাষা আন্দোলনের রক্তভেজা পথ পাড়ি দিয়ে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার মহাসড়কে উঠে আসে আন্দোলনের গাড়ি। সময়ের দাবি মেটাতে দক্ষ ও চৌকষ একক নেতা হিসাবে অন্যদের টপকে মহা সংগ্রামের স্টিয়ারিং হুইল ধরেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর নেতৃত্বে জাতি রক্ত সাগর সাঁতরে স্বাধীনতার সুবর্ণ বন্দরে পৌঁছে যায় ৭১এর ১৬ ডিসেম্বরে। মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে বঙ্গবন্ধু জেলে কাটিয়েছেন প্রায় ৩০ বছর। পঞ্চাশষাটের দুদশক একদিনের জন্যও তিনি বিশ্রাম পাননি। এক জেল থেকে আরেক জেল ছিল তাঁর বাড়ি, ঘরবসতি! কোথায় সংসার, পরিবার এসব হিসাব রাখার সুযোগ জীবনে তিনি পাননি। অর্থবিত্ত, বাড়ি, গাড়ি কিছুই তাঁর ছিল না। ধানমন্ডির প্লট হয়েছে তাঁর আগোচরে, সহকর্মীর চেষ্টায়। প্লটের কিস্তির টাকা গয়না বিক্রি করে অনেক কষ্টে শোধ করেছেন বেগম মুজিব। বাড়িও হয়েছে বেগম মুজিবকে বাবার দেয়া টুঙ্গিপাড়ার জমি বিক্রি ও ব্যাঙ্কঋণের টাকায়। তাও টানা এক দশকে দ্বিতল ছোট বাড়ি। এইতো জাতির জনক নিপীড়িত বাঙালির আশ্রয়ের ঠিকানা বঙ্গবন্ধুুর জীবন, সংসার ও সম্পদের বিজ্ঞাপন! ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে কটা রাত কাটিয়েছেন তিনি? আঙুলের কড়ায় গুণে তা হিসাব করা অসম্ভব নয়!

সময়ে বঙ্গবন্ধুর কাছের সব কজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীও ছিলেন নীতিআদর্শের প্রতি নিবেদিত একেকজন কিংবদন্তি। তারা নিজের ঘর সংসারকে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংসারের সাথে এক সমান্তরালে নিয়ে আসেন। নিপীড়িত বাঙালি জনগোষ্ঠীর মুক্তি ও উন্নয়ন ছাড়া আত্ম বা বৈষয়িক উন্নয়নের কোন চিন্তা তাদের মগজমননে ঘাঁটি গাড়ার ন্যূনতম স্পেস পায়নি। বঙ্গবন্ধু পাকি ঘাতকদের হাতে ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে গ্রেফতারের পর তাঁর অবর্তমানে তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে যারা মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার পরিচালনা করেছেন, ব্যাতিক্রম ছাড়া সবাই ছিলেন দেশ ও মানুষের প্রতি নিবেদিত অসম সাহসী বীরযোদ্ধা। খোন্দকার মোশতাক চক্র তখন থেকে মার্কিন ও আইএস আইর সাথে মিলে ষড়যন্ত্রের জাল পাতলেও তাজউদ্দিনের দূরদর্শী নেতৃত্ব তা নিষ্ক্রিয় করে দেয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর উচ্চাভিলাষী কিছু অপশক্তি রাতারাতি ধনী ও সম্পদশালী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পরিত্যক্ত সম্পত্তি ও কল কারখানা লুটপাট হয়। বঙ্গবন্ধু কঠোরভাবে এদের দমন করেন, এমনকী অনেক প্রভাবশালী নেতা ও এম পিকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। তবুও যুদ্ধবিধ্বস্ত, ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশটি থেকে রাক্ষস খোক্কস পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব হয়নি। কারণ, একদিকে চীনপন্থী কট্টর বামধারার স্বাধীনতাবিরোধী সশস্ত্র সর্বহারা গোষ্ঠী এবং রাতারাতি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিবাস্বপ্নে বিভোর সদ্য গজিয়ে ওঠা জাসদ দেশব্যাপী নাশকতা ও সহিংসতার বারুদে আগুন দেয়। সুযোগ বুঝে তাদের সাথে ভিড়ে যায় রাজাকার আলবদরসহ স্বাধীনতাবিরোধী সামপ্রদায়িক উগ্রগোষ্ঠী। খুন, গুম, পাটের গুদাম, কারখানায় আগুন, আওয়ামী লীগ নেতা হত্যাসহ ভয়াবহ এক অরাজকতা তৈরি করে এই অপশক্তি। বঙ্গবন্ধু দেশ পুনঃগঠনের পাশাপাশি ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দেন। কিন্তু বিষধর সর্বকালের কুখ্যাত কুলাঙ্গার খোন্দকার মোশতাক চক্র তলে তলে ষড়যন্ত্রের জাল পেতে রাখে। কিসিন্‌জারের প্ররোচনায় ৭৪এর দুর্ভিক্ষের সময় বাংলাদেশের জন্য আসা খাদ্যবাহী তিন জাহাজ অন্য গন্তব্যে পাঠিয়ে দিয়ে পুরো দেশকে বৈরি পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু প্রচন্ড প্রতিকুলতা সামাল দেন রা্‌ষ্ট্রনায়কোচিত অসাধারণ দূরদর্শিতার মাধ্যমে। বৈষম্যমুক্ত শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাকশালনামে অপূর্ব এক আর্থসামাজিকরাজনৈতিক দর্শন উপহার দেন। দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির! বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের দর্শন বাকশাল বাস্তবায়নের সূচনা পর্বেই তাঁকে সপরিবারে সর্বকালের বর্বর হত্যাকান্ডের মাধ্যমে শেষ করে দেয় ঘাপটি মেরে থাকা মোশতাকফারুকরশিদচক্র।

এরপর জাতিকে ঠেলে দেয়া হয় ভয়াল অন্ধকারের আবর্তে। শুরু হয় দুর্বৃত্তায়নের অপরাজনীতি। মোশতাক, জিয়া, এরশাদের হাত ধরে রাজনীতিতে সামপ্রদায়িক শক্তিরও প্রবল উত্থান ঘটে। দুর্বৃত্তায়ন ও উগ্র সামপ্রদায়িকতা হাত ধরাধরি করে এগুতে থাকে রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে! বাঙালি ও বাংলাদেশী দুটি বহমান ধারা তৈরি হয় রাজনীতিতে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারিরা বাঙালি ধারার রাজনীতি চর্চা করলেও ধীরে ধীরে ক্ষমতা ও সম্পদ আসক্তির দীর্ঘ কালো ছায়া তাদের উপরও ভর করে। যা বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনৈতিক দর্শনে কখনো ছিল না। ভাগ্যক্রমে বিদেশে থাকায়, ১৫ আগস্ট ভোররাতের বর্বরতম হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে যান ট্রাজেডির দুনায়িকা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। জননেত্রী শেখ হাসিনা টানা দুমেয়াদে এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। যতটুকু জানা যায়, তাঁর পরিবারে এখনো সম্পদ আসক্তি ও দুর্বৃত্তায়ন শিকড় গাঁড়তে পারেনি। কিন্তু সরকার ও দলের অনেকেই এই অসুখে আক্রান্ত! ফলে একদিকে সরকার ও দলে অস্থিরতা যেমন বাড়ছে। অন্যদিকে ভাগ্য শিকারী নব্য লুম্পেনেরা স্রোতের তোড়ে ঢুকে পড়ছে দল ও সহযোগী সংগঠনে। অথবা স্থান সঙ্কুলান না হলে দলের কোনো কোনো প্রভাবশালীর ছায়ায় গড়ে তুলছে অসংখ্য ভুঁইফোড় সংগঠন। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় ঘটছে আর্থিকসহ নানাখাতে বহু কেলেঙ্কারির ঘটনা। প্রচুর উদাহরণ টানা যায়। কিন্তু নিরর্থক! কারণ, দলীয় নীতি নির্ধারকের তা অজানা থাকার কথা না। কথা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ তাঁর ডায়েরি ও শেখ হাসিনার লেখা বই যাঁরা আত্মস্থ করেছেন, তাদের মাঝে এই বিপরীত আচরণ কেন! তাঁদের কথা ও কাজে এত বৈপরীত্যইবা বা কেন? শোকের মাস আগস্টে এনিয়ে আত্ম সমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সময় এসেছে। নাইতে খাইতে বেলাগেলে কিন্তু আত্মশুদ্ধি বা সমালোচনা কোনো কাজে আসবে না। কারণ, ক্ষমতা ও অবৈধ সম্পদ কখনো কারো চিরস্থায়ী হয় না। সাক্ষী ইতিহাস।

x