নষ্ট হচ্ছে ১শ প্রজাতির পোনা

সীতাকুন্ডে সমুদ্র উপকূলে চিংড়ি আহরণ, নজরদারি কম

লিটন কুমার চৌধুরী, সীতাকুন্ড

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
17

বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায় সীতাকুন্ডের সলিমপুর থেকে মীরসরাইয়ের মুহুরী প্রজেক্ট পর্যনত্ম অবাধে চিংড়ি পোনা আহরণ করা হচ্ছে। বছরের পর বছর এখানকার সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় বাগদা ও গলদা পোনা আহরণের নামে মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করা হলেও প্রশাসন কোনো নজর দিচ্ছে না। ফলে সাগর ও নদ-নদী মাছশূন্য হয়ে পড়ছে।
সীতাকু- উপজেলার সৈয়দপুর, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, মুরাদপুর, সোনাইছড়িসহ উপকূলীয় এলাকায় প্রতিদিনই নেট জাল, কারেন্ট জাল, বিহিঙ্গি জাল, বাক্স জাল ও টাঙ্গা জাল বসিয়ে পোনা আহরণকারীরা চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্যান্য প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী সংগ্রহ করা হচ্ছে। চিংড়ি পোনাগুলো সংগ্রহ করে অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ও মাছগুলো মাটিতে ফেলে দেয়। এসব পোনা পাঠানো হয় খুলনায়।
স্থানীয় জেলেরা জানান, স্থানীয় ভাবে পরিচিত লাল চিংড়ি, ট্যাংরা (গুইলস্না মাছ), লইট্যা মাছ, রিটা মাছ, পোপা মাছ, চিরিং মাছ, রিসশা মাছ, হোন্দরা মাছ, বাইলা মাছ, ইছা মাছ এখন আর তেমন পাওয়া যায় না।
মৎস্য আইন অনুযায়ী জাল ও নেট দিয়ে পোনা আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও তা কেউ মানছে না। এমনকি আইন অমান্যকারীদের জেল জরিমানার ব্যবস্থা থাকলেও এখানে তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
বাঁশবাড়িয়া উপকূলীয় এলাকায় হীরালাল জলদাশ নামে এক পোনা সংগ্রহকারী জানান, ১০০ চিংড়ি পোনার দাম ৭০-৮০ টাকা। একেকজন আহরণকারী প্রতিদিন ২০০ চিংড়ি পোনা আহরণ করে থাকেন।
সীতাকু–মীরসরাই চিংড়ি পোনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিক আহমেদ জানান, পোনা সংগ্রহকারীরা বাগদা চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়ে অন্য পোনা নষ্ট করে না। তারা বাগদা পোনা রেখে দিয়ে অন্য পোনাগুলো সাগরে ছেড়ে দেয়। সমিতির সিদ্ধানত্ম মোতাবেক তাদের ওপর এই ধরনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, এখানকার উপকূলীয় এলাকায় অনত্মত পাঁচ হাজার নারী-পুরুষ পোনা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। বছরের এ সময়টিতে সাগরে প্রচুর পরিমাণে গলদা ও বাগদা চিংড়ির পোনা পাওয়া যায়। এসকল পোনার বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় সকলের আগ্রহও বেশি থাকে।
পোনা সংগ্রহকারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাবারের টিউবের বয়া, ডেকচি, সাদা থালা, পস্নাস্টিকের সাদা চামচ নিয়ে শত শত লোক চিংড়ি পোনা আহরণ করে চলেছে প্রতিদিন। ভাটার সময় চিংড়ি পোনা আহরণের উপযুক্ত ক্ষণ বলে জানান আহরণকারীরা। তারা জানান, প্রতিদিন দু-তিনশ পোনা ধরে প্রতিজন। এসব পোনা আহরণ করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতি চিংড়ি দুই টাকা দামে বিক্রি করেন।
উপজেলা মৎস্য অফিসের সংশিস্নষ্টরা জানান, সীতাকুন্ডের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার একর জমিতে বাগদা চিংড়ির চাষ হয়ে থাকে। আর এসব ঘের এলাকায় অধিকাংশ পোনা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। ফলে পোনা আহরণ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি চিংড়ির পোনা ধরতে গিয়ে অন্য প্রজাতির মাছের ৩০ থেকে ১০০ পোনা (ক্ষেত্র ভেদে) ধ্বংস করে ফেলা হয়। সেই হিসেবে প্রতিদিন ধরা হচ্ছে লাখ লাখ পোনা। আর এ কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি অন্য মাছের প্রজনন নষ্ট হচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি ছাড়াও সাগরে মৎস্য ভান্ডার শূন্য হওয়ার পথে।
এসব গলদা জাতের চিংড়ি পোনা খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকার চিংড়ি ঘেরে চাষ করা হয়। প্রকৃতিগতভাবে এ পোনা দ্রুত বর্ধনশীল ও টিকে থাকার কারণে খুলনায় ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক পোনা ব্যবসায়ী। তিনি জানান, একেকজন খুচরা ব্যবসায়ী প্রায় ২৪-৩০ হাজার পোনার চালান দিতে পারে দুই-তিনদিন অনত্মর অনত্মর। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নগদে কেনা পোনা বিক্রি করে তেমন একটা পোষায় না বলে জানান তিনি। এছাড়া সমপ্রতি সীতাকুন্ডে যে চিংড়ি পোনা ধরা হয় তাতেও তার প্রায় ২৪ হাজার চিংড়ি পোনা ছিল। এতে অনেক টাকার লোকসান হয়ে গেছে।
উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা দৈনিক আজাদীকে জানান, এভাবে চিংড়ি পোনা আহরণ করতে গিয়ে অন্যান্য প্রজাতির পোনা নিধন হচ্ছে। যার ফলে সাগরের মাছ প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে।
তিনি জানান, একটি চিংড়ি পোনার পেছনে প্রায় ১০০ প্রজাতির মাছের পোনা নষ্ট হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মশারীর নেট দিয়ে নদী ও সমুদ্র থেকে চিংড়ি পোনা ধরে অসাধু উপায়ে বিক্রি করে আসছিল।
এ চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নদী ও সমুদ্রের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নষ্ট করছিল। যে মাছগুলো বড় হলে সাগরে মাছের আহরণ বেড়ে যায়।
তবে তিনি ইতিমধ্যে কয়েকটি অভিযান চালিয়েছেন। তা অব্যাহত থাকবে বলে জানান।

x