নববর্ষ ও বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

শনিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ at ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ
167

এটি সর্বজনবিদিত যে, বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সভ্য সমাজের এক নান্দনিক প্রেক্ষাপটে অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার ধারণ ও লালন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। বিশ শতকের প্রারম্ভে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি (১৮৫৯১৯৫৬) ’কালচার’ প্রত্যয়টির জন্য ’কৃষ্টি’ শব্দটি প্রবর্তন করেন। কৃষ্টির মর্মার্থ হচ্ছে সর্বজনীন কোন আচারঅনুষ্ঠানের চর্চা বা অনুশীলন যা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যক্তি, সামাজিক ও জাতীয় জীবনের মানস তৈরী করে। ১৯২০এর দশকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৯০১৯৭৭) সহায়তায়’কৃষ্টির’ বিকল্প হিসেবে ‘কালচার’ প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। কালচারের বাংলা প্রতিশব্দ নিয়ে তর্কবিতর্কের ধারাবাহিকতায় উল্লেখিত শব্দ ছাড়াও ‘কর্ষণ’, ‘চর্চা’, ’শিক্ষা’, ‘বৈদগ্ধ্য’, ‘চিৎপ্রকর্ষ’, ‘চিত্তোৎকর্ষ’, ‘চারিত্র’ প্রভৃতি শব্দ উচ্চারিত ছিল। এই অঞ্চলের লেখকরা সংস্কৃতি শব্দটি গ্রহণ করলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার তমদ্দুন মজলিশ কালচার অর্থে ’তমদ্দুন’ বা কেউ কেউ ‘তাহজিব’ ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন। মূলত: আরবের মদিনা শহরের শিক্ষিত লোকদের উন্নত রীতিনীতি ও আচারআচরণকে তমদ্দুন অর্থে বোঝানো হত।

যুক্তরাজ্যে বেকন (১৫৬১১৬২৬), যুক্তরাষ্ট্রে ইমার্সন (১৮০৩১৮৮৩) এবং ইউরোপের অন্যান্য ভাষায় বেকনের কাছাকাছি সময় থেকে কালচারের ধারণার ব্যাপ্তি ও বিকাশ বিস্তৃত হয়। বিশিষ্ট সমাজ ও নৃবিজ্ঞানীগণ সংস্কৃতিকে ‘মানুষের চিন্তা ও জ্ঞানের সমষ্টি’ (রবার্টী), ‘উপরিকাঠামো’ (মার্কস) ‘মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও পার্থিব উপকরণের সমষ্টিগত রূপ’ (গ্রেহাম ওয়ালাস), ‘মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি, নিয়মপ্রথা এবং সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষের অর্জিত যে কোন অভ্যাস ও শক্তির মিশ্ররূপ’ (টাইলর) ইত্যকার বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে প্রচলিত ধারণা থেকে ভিন্নতর অর্থে সংজ্ঞায়িত করেছেন। বস্তুতপক্ষে মানুষের সকল সৃজনশীলতার ফসলই হল সংস্কৃতি। এটি মানুষের চিন্তা ও কর্মের একটি সার্বিক রূপ। সমাজসভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় প্রত্যেক মানবগোষ্ঠী সাধারণ ও অবশ্য পালনীয় লোকাচার ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে নিজস্ব সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।

বাংলার সমাজ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বর্তমান ভৌগোলিক সীমারেখা নিয়ে বাংলাদেশ নামক এই অঞ্চলের মানবগোষ্ঠীর কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম, চিন্তাচেতনা ইত্যাদি ইতিহাসের বিভিন্ন ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে সংমিশ্রণ, সংযোজন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে আজকের অবস্থানে উপনীত হয়েছে। বস্তুতঃ গাঙ্গীয় এ বদ্বীপ এলাকায় বাঙালিরা বসবাস শুরু করেন এ অঞ্চলে আর্যদের আগমনের প্রায় পনের’শ বছর আগে। দ্রাবিড় সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের উৎসে ছিল কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতি। আর্যদের দখলে আসার পর রাজনীতি, ভাষাসংস্কৃতি ইত্যাদির বিষয়ে আর্য ও অনার্যদের মধ্যে সংঘাত শতাব্দীর পর শতাব্দী অব্যাহত থাকলেও শ্রী দুর্গাচন্দ্র সান্যালের ভাষায় “বৈদিক যুগ থেকে আর্যরা অনার্য সভ্যতা গ্রহণ শুরু করে”।

অধ্যাপক আলী নেওয়াজের মতে “তথাকথিত সভ্য আর্যরা এদেশে এসে অনার্যদের সংস্কৃতির বারো আনাই মেনে নিয়েছিলো, নবান্ন উৎসবটিও তারা বাদ দেয়নি, যার রেওয়াজ আজও বাংলাদেশে চলছে”। স্মরণাতীত কাল থেকে ধনধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসের নবান্ন উৎসবকে উপলক্ষ করে বাঙালির বছর গণনা পরবর্তীতে মুসলিম আমলেও যে প্রচলিত ছিল, বহু সূত্র থেকে তার সত্যতা সমর্থনপুষ্ট। প্রায় পাঁচ’শ বছর পূর্বে কবি মুকুন্দরাম তাঁর চন্ডীমঙ্গল কাব্যে “ধন্য অগ্রহায়ণ মাস ধন্য অগ্রহায়ণ মাস, বিফল জনম তার নাহি যার চাষ” পংক্তির মাধ্যমে সে যুগের কৃষিজীবী বাঙালির সন গণনার যথার্থ বর্ণনা দিয়েছেন। প্রখ্যাত মনীষী আবুল ফজল আইনআকবরীতে উল্লেখ করেন যে, সম্রাট আকবরের আমলে অগ্রহায়ণ মাস থেকে বাংলা বছরের গণনা শুরু এবং এ জন্যই বাংলা সালকে “ফসলী সাল” বলা হতো।

মোহাম্মদ আবদুল হাই সঙ্কলিত ও সম্পাদনায় ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’ গ্রন্থের ভূমিকায় চমৎকারভাবে উল্লেখিত বিষয়ের অবতারনায় উল্লেখ করেছেন যে, মোগল আমলের বাংলা সমাজ প্রধানত হিন্দু, মুসলমানএদুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অবস্থান তখন প্রায় অবলুপ্তির পথে ছিল। বাঙালি সমাজের এদুটি সম্প্রদায়ের

পরস্পর বিরোধী মৌলিক আদর্শগত বিভাজনটি বিকশিত হয়েছিল ধর্ম, দর্শন, আচারআচরণ, নিরাকারআকার, একেশ্বর ও বহুত্তবাদকে কেন্দ্র করে। এই বিভাজনই প্রকৃতপক্ষে বিরোধ, বিদ্বেষ, হিংসা, প্রতিহিংসা ইত্যাদির যাঁতাকলে এদুই সম্প্রদায়কে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। এ উভয় সম্প্রদায়ের সৃজনশীল গোষ্ঠী কেন জানি মননচিন্তনের বেড়াজালে নিজেদের আবদ্ধ করেস্ব স্ব ধর্ম ও সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সচেষ্ট ছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, একদিকে ভীষণ ধরণের ব্যবধান সৃষ্টি হলেও প্রাত্যহিক সমাজ জীবনের সহঅবস্থান, শ্রেণী চরিত্র, পারস্পরিক লেনদেন, আদানপ্রদান, ইত্যাদি এদুই সম্প্রদায়কে আবার প্রেমপ্রীতি, সৌহার্দ্যসম্প্রীতির অপরূপ মেলবন্ধনেওসমৃদ্ধ করেছে। এখানেই এদুই সম্প্রদায়ের এক অভিনব বৈশিষ্ট্য ভিন্নমাত্রায় প্রবাহিত ছিল।

খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর মতে আসমুদ্রহিমাচল আমাদের এই দেশের নাম বঙ্গদেশ বা বাংলা দেশ। আবুল ফজলের ‘আইনআকবরি’ গ্রন্থে তার ব্যাখ্যা আছে। বঙ্গ শব্দের সঙ্গে আল্‌ যুক্ত হয়ে দেশের নাম বাঙাল বা বাঙালা হয়েছে। আল্‌ বলতে শুধু খেতের আল নয়, ছোটোবড়ো বাঁধও বোঝায়। বাংলাদেশ জলবৃষ্টির দেশ; ছোটোবড়ো বাঁধ না দিলে বৃষ্টি, বন্যা আর জোয়ারের হাত থেকে ভিটেমাটিখেতখামার রক্ষা করা যায় না। যে অঞ্চলে জল কম হয় সে অঞ্চলেও বর্ষার জল ধরবার জন্যে বাঁধের দরকার। তাই আল বেশি বলেই এদেশের নাম হয়েছে বাঙালা বা বাংলা দেশ।

বস্তুতপক্ষে১২০৪ সালের আগে, অঞ্চল, ভাষা বা সংস্কৃতির বিচারে, জাতি হিসেবে বাঙালির কোনও আলাদা পরিচয় গড়ে ওঠেনি। সে সময় বেঙ্গল বা বাংলা বলে কোন অঞ্চল ছিল না। পরবর্তীকালেও বাংলা বলতে যে অঞ্চল বোঝাত তা বহু রাজত্বে বিভক্ত ছিল। পাল রাজত্বের দীর্ঘস্থায়িত্বেও তা বজায় ছিল। কিন্তু বাংলা বলতে যে অঞ্চলকে আমরা বুঝি তা রূপ পেয়েছিল ১২০৪ সালের পর। বখতিয়ার খিলজির আক্রমনের কয়েক যুগ পর অঞ্চল হিসেবে বাংলা এক কেন্দ্রীয় শাসনাধীন হয়। যদিও একটা সময় সোনারগাঁও গোটা দেশের থেকে বিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব নিয়েছিল, চট্টগ্রাম বা ত্রিপুরাকে দীর্ঘকাল বাংলার অংশ বলে ধরা হত না, কিন্তু এই ভূভাগের অধিকাংশ অঞ্চল একই রাজ্যেও অন্তর্ভুক্ত ছিল (বিপ্লব দাশগুপ্ত)

ঐতিহাসিক বহু তথ্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে আর্য হিন্দুদের শত বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রচলিত অনার্যদের প্রচীন আমলের কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতি বধূ বরণ, অন্ন প্রাশন, সংক্রান্তি, গৃহ প্রবেশ, জমি কর্ষণ, ফসল তোলা, আচারঅনুষ্ঠান, ব্রত ও প্রথার বিলুপ্তি ঘটেনি বরং বৌদ্ধ, হিন্দু এবং সূফী মনীষীদের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম প্রচারের পরও এ ধরণের কৃষি ও সংস্কৃতির উপাদানগুলো বাঙালির সংস্কৃতির প্রধান আচারঅনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অস্তিত্বকে সূদৃঢ় করে। অতএব এ সব আচারঅনুষ্ঠানকে ‘হিন্দুয়ানী’ বলে আখ্যায়িত করার অব্যাহত প্রচেষ্টা যে এ দেশের কিছু সংখ্যক অশিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ী ও কুশিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

জাপান বা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মত বাংলা নববর্ষের প্রচলন ও উদযাপন মূলত এই ভারতবর্ষের কৃষি কাঠামোর পরিবর্তন বাস্তবতায় উদ্ভাসিত। আরব বিশ্বের বিভিন্ন জাতি সমূহ এবং অন্যান্য জাতি যেমনইংরেজ, তাইওয়ান, স্কটিস এবং ইউরোপীয় অনেক ভাষাভাষি জনগোষ্ঠী বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এবং উৎসবের আমেজে নববর্ষ উদযাপন করে থাকে। প্রায় চার হাজার ছয়শত থেকে চার হাজার সাতশত বছর আগে ব্যাবিলন সভ্যতায়, ইরান, চীন, ভিয়েতনাম, লাওস সহ প্রায় দেশে বহু প্রাচীন কাল থেকে নববর্ষ উদযাপনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অনেকে অবগত আছেন। লাওসের নববর্ষ উৎসব যে দিন থেকে শুরু হয় সেটি ঠিক আমাদের দেশের পহেলা বৈশাখ।

বাংলাদেশে বাঙালি জাতি ছাড়াও বিভিন্ন উপজাতি যেমন চাকমাদের ‘বিঝু’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসুক’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’, তংচঙ্গ্যাদের ‘বিষু’, অহমিয়াদের ‘বিহু’ এবং সর্বোপরি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর বৈসাবি উৎসবের মাধ্যমে বর্ষ বিদায় ও বরণ তাদের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যকে সামাজিক সংহতি ও ঐক্যের বন্ধনকে সুদৃঢ় রাখার বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে এখনও নন্দিত ভূমিকা পালন করছে। নিজস্ব বর্ষ পঞ্জিকার সূত্র ধরে নববর্ষের বিভিন্ন উৎসব উদযাপন এর মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় তারা অত্যধিক সমাদৃত। বাংলাবর্ষ বিদায় ও নববর্ষের অবগাহন আজ শুধু গ্রাম বাংলায় নয় বাংলাদেশের প্রতিটি নগর, শহর সহ যেকোন অঞ্চলে এমনকি বিশ্বের নানা দেশে প্রবাসী বাঙালিদের আনন্দ উদযাপনের বিশেষ দিন হিসেবে বাংলা নববর্ষ তার মহিমায় ভাস্বর।

নববর্ষের বাংলা সনের ‘সন’ শব্দটি আরবী, পহেলা বৈশাখের ‘পহেলা’ শব্দটি ফরাসী এবং বছরের প্রারম্ভে ব্যবসা বাণিজ্যে প্রচলিত ‘হালখাতা’ শব্দটি ইসলামী। মুঘল স্রমাট আকবর ৯৬৩ হিজরী (চান্দ্র বর্ষ) ২ রবিউসসানি, রোজ শুক্রবার, ইংরেজি ১৪ই এপ্রিল ১৫৫৬ সাল থেকে ১লা বৈশাখ পালনের রেওয়াজ শুরু করেন। সৌর বৎসর (বঙ্গাব্দ) ও চান্দ্রবর্ষ (হিজরী) উভয়ের অপূর্ব সন্ধিক্ষণে রাজজ্যোতিষী আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজীর সূক্ষ্ম হিসাবনিকাশের মাধ্যমে শুভক্ষণ গণনার দিন হিসেবে ১লা বৈশাখকে নববর্ষ উদযাপনের দিন হিসেবে ধার্য্য করা হয়।

এই বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়েছিল হিজরী সনকে উপেক্ষা করে নয় বরং হিজরী ৯৬৩ সালকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে শুধুমাত্র ফসল তোলার সময়কে সৌর বর্ষের সাথে সামঞ্জস্য করার লক্ষ্যে সূর্যকে মানদন্ড ধরে সৌরবর্ষ অথবা ফসলি বর্ষ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এই সৌরবর্ষ ও চান্দ্র বৎসরের ব্যবধানকে যথাযথভাবে সংযোজিত করে নতুন বঙ্গাব্দের পরিচয় বহনে এই দিনের প্রারম্ভ। আসলে এটি চান্দ্র ও সৌর বৎসরের নবতর সম্মিলন। নক্ষত্র মন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারাসমূহের অবস্থানের উপর ভিত্তি করেই বঙ্গাব্দের বার মাসের নামকরণ করা হয়েছে। সূর্যসিদ্ধান্ত নামে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ থেকে নেয়া নক্ষত্র তথা বিশাখা, জ্যেষ্ঠা, উত্তরাষাঢ়া, শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদ, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, মৃগশিরা, পুষ্যা, মঘা, উত্তরফাল্গুনী, চিত্রা ইত্যাদির নামানুসারে বাংলা মাসের নাম যথাক্রমে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ন (মাঘশীর্ষ), পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্রের নামকরণ হয়েছে (কালের কণ্ঠ : ১০ এপ্রিল,২০১০)

আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে এই, বর্ষ গণনায় সেসময় প্রতিটি মাসের ৩০ বা ৩১ প্রতিটি দিনের নামও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু সম্রাট আকবরের পৌত্র সম্রাট শাহজাহানই বিভিন্ন গ্রহণ ক্ষেত্রের নামানুসারে পুরো মাসকে সপ্তাহে বিভক্ত করে দিনগুলোর নামকরণ করেছিলেন এবং পাশ্চাত্য ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রবিবারকে সপ্তাহের ১ম দিন হিসেবে ধার্য করেছিলেন। সূর্য দেবতার নামানুসারে রবিবার, শিব দেবতার নামানুসারে সোমবার, মঙ্গল গ্রহের নামানুসারে মঙ্গলবার, বুধ গ্রহের নামানুসারে বুধবার, বৃহস্পতি গ্রহের নামানুসারে বৃহস্পতিবার, শুক্র গ্রহের নামানুসারে শুক্রবার এবং শনি গ্রহের নামানুসারে শনিবার রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

অতএব ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত যে, এই বঙ্গাব্দের প্রচলন এবং এই নববর্ষকে বরণ করার যে প্রক্রিয়া বা অনুষ্ঠান তা সকল কিছুই মুসলমান শাসকদেরই সৃষ্ট এবং চিরায়ত বাংলা সংস্কৃতিরই পরিবর্তিত বাহন। এটি শুধু বাঙালি জাতীয় কৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করে না, বাঙালি সমাজের কৃষি ও অন্যান্য আর্থসামাজিক প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ডে নতুন অলংকারে ভূষিত। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে শাশ্বত ঐতিহ্য ও কৃষ্টি চর্চায় বিকৃত মানসিকতার সন্নিবেশ ঘটানোর লক্ষ্যে এই অপপ্রচারণা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই নববর্ষ প্রচলন ও উদযাপনে হিন্দুয়ানি বা হিন্দু সংস্কৃতির যে লেশমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই, এটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও উজ্জ্বল।

অসাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি বর্তমানে বিপুলভাবে প্রচলিত। বিশেষ করে পাকিস্তান শাসনের নির্যাতননিপিড়নের এবং সাংস্কৃতি আগ্রাসনের যে অপচেষ্টা বিদ্যমান ছিল তা থেকেই উদ্ভুত এই ধরণের চিন্তাচেতনার উত্থান। ১৮০২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নীতির ব্যাখ্যা দিয়ে যে চিঠিটি ডানবুরি ব্যাপ্টিসদের কাছে লিখেছিলেন তারই ভিত্তিতে আমেরিকার সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে প্রথম সংশোধন করা হয়। আমরাজানি, এই ধর্মনিরপেক্ষাতাবাদের সূচনাপাঠ হয়েছিল ১৭৭৯ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসী বিপ্লবের বিজয় গাঁথায়। ১৮৪৬ সালে ভাষা ও সাহিত্যে এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সর্ব প্রথম ব্যবহার করেন ব্রিটিশ লেখক জর্জ জ্যাকব হলিওয়েফ। এর একশত বছর পর ১৯৪৬ সালে এই উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ শব্দটি রাষ্ট্র চিন্তায় প্রথম ব্যবহার করেন জওহরলাল নেহেরু। যদিও ভারত বিভাগের পূর্বে ও পরে মহাত্মা গান্ধী এই প্রত্যয়টির ব্যবহার শুরু করেন।

যে ল্যাটিন শব্দ (ঝবপঁষধৎরংস) থেকে তার মৌলিক অভিধা ছিল প্রজন্ম বা যুগ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু খ্রিষ্টীয় ধর্ম বিষয়ক রচনা যেখানে মূলত: ধর্ম বা ধর্ম প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কহীন ইহজাগতিক কিছু বিষয় যেমনযে বাড়ি ঘর উপসানার জন্য নির্মিত নয়, যে শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার পাঠ দেয়না, যে ভাবধারা পার্থিব বিষয় সীমাবদ্ধ তাকেই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্লেষনে ভৃষিত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে যে বিষয়টি সমধিক বিবেচ্য বা বাঙালির মহান অর্জন যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনাকে ধারণ করা হয়েছে তা কোন ভাবেই ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ব্যক্তির মানসিক ও সামাজিক গঠন তার জন্মগত ধর্মকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। ব্যক্তির স্বাধিনতাই এক্ষেত্রে বড় বিষয় অর্থাৎ সে কিভাবে তার এই বিশ্বাসের ক্ষেত্রটিকে লালন করবে এবং তার যথাযথ অনুশীলনের জন্য অন্যের কাছে অপ্রিয় হবেনা এবং একই ভাবে অন্য ব্যক্তিও তার এই বিশ্বাস অনুশীলনে কোন বাধার কারণ হবেনা।

এজন্যই মহাকালের মহা নায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। সেটি বাঙালির ঐক্যের, সম্প্রীতিসৌহার্দ্যের, জাতিধর্মের, বর্ণের নির্বিশেষে এক অসাধারণ ও সাবলিল প্রজ্ঞার যোগসূত্র। এটিই ধর্মনিরপেক্ষতা এটিই অসাম্প্রদায়িকতা। মোদ্দা কথা একই রক্ত মাংসের মানুষ, একই স্রষ্টার উপাসনারত, একইভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যে লালিত আমাদের জাগ্রত ও শানিত বিবেকবোধ যাকে বলা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত। যেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার ফসল বাংলার নববর্ষকে ঘিরে কোন ধরনের সংঘাত, সংশয় বা কোন সম্প্রদায়ের বিশেষ অনুষ্ঠান হিসেবে না দেখে সর্বজনীন বাঙালির উৎসব হিসেবে মানবতাবোধে দিক্ষিত হওয়ার শিক্ষা গ্রহণই হোক নববর্ষের চেতনা। অধিকতর সমৃদ্ধ হোক এর বিকাশ ও বিস্তার। এটিই আজকের দিনের মাঙ্গলিক প্রত্যাশা।

লেখক: শিক্ষাবিদ, উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x