নন্দিত স্বদেশ – নন্দিত বৈশাখ

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ
51

আবহমান বাংলার চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনা-চর্যার মূলে রয়েছে এক অসাধারণ অনুষঙ্গ। সেটি হল বাংলা নববর্ষ। বহুকাল ধরে ধর্মান্ধ বক্তব্য দিয়ে এই বাংলা নববর্ষকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বলে বিভ্রান্তির অপচেষ্টা অব্যাহত ছিল। কিন্তু ধার্মিক ও জ্ঞান নির্ভর বাংলা প্রতিষ্ঠায় যারা আলো ছড়িয়েছেন, তাঁদের রচনায় সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয়েছে এটি প্রকৃত অর্থেই ইসলামী চিন্তা-চেতনার ফসল। সাধারণত ধর্মকে অনেক পন্ডিত জনগণের জনপ্রিয় সংস্কৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে সত্য-সুন্দর-মঙ্গল ও আনন্দবোধের উন্নত জীবন প্রবাহকে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের সাংস্কৃতির রূপান্তর হিসেবে ধরা হয়।
উল্লেখ্য যে, হিজরী সনকে উপেক্ষা নয় বরং হিজরী ৯৬৩ সালকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে শুধুমাত্র ফসল তোলার সময়কে সৌর বর্ষের সাথে সামঞ্জস্য করার লক্ষ্যে সূর্যকে মানদন্ড ধরে সৌরবর্ষ অথবা ফসলি বর্ষ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্রাট আকবরের শাসনকালে সৌর বৎসর (বঙ্গাব্দ) ও চান্দ্রবর্ষকে (হিজরী) এককমাত্রায় নির্ধারনে রাজজ্যোতিষী আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজীর সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় শুভক্ষণ গণনার দিন হিসেবে ১লা বৈশাখকে নববর্ষ উদযাপনের দিন ধার্য্য করা হয়। গণমানুষের বিশেষকরে কৃষিভিত্তিক সমাজে গ্রহণযোগ্য মানসিকতা সমুন্নত রাখার উদ্যোগ থেকেই নববর্ষ ঘিরে আনন্দ-উৎসবের সমারোহ।
ধর্মের নামে নানাবিধ অপপ্রচারনায় ক্ষুব্ধ রবীঠাকুর তাঁর দীর্ঘ ‘শিশুতীর্থ’ কবিতায় বলেছেন, ‘চলেছে পঙ্গু, খঞ্জ, অন্ধ আতুর,/ আর সাধুবেশী ধর্মব্যবসায়ী,/ দেবতাকে হাটে-হাটে বিক্রয় করা যাদের জীবিকা।’ এই প্রসঙ্গে জাতীয় কবি নজরুল তাঁর ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় বলেছেন, ‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,/ কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ।/ “হিন্দু না ওরা মুসলিম ?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্‌ জন ?/ কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!’
একদিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ক্ষুদ্র সংকীর্ণকতা, অন্যদিকে ব্রিটিশ বেনিয়াদের নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কবি সোচ্চার কন্ঠে উচ্চারণ করেছেন, ‘আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল ?/ স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাড়াল।/দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি/ভূ-ভারত আজ কসাইখানা,-আসবি কখন সর্বনাশী ?’ এভাবেই ক্ষোভ-অভিমানে জর্জরিত কবি সাহিত্যিকদের রচনায় মানুষকে জাগরণের ডাক এখনো যেন প্রযোজ্য।
নববর্ষের অবগাহনে বৈশাখ বরণে ভিন্ন ভিন্ন কাব্যগাঁথা ও রচনায় জীর্ণতা, কুপমন্ডুকতা, পুরাতন গ্লানি বা কালিমা ইত্যাদিকে মুছে নতুন করে জীবনকে উপলব্ধি এবং অনাগত আগামীর আহবানকে পূর্ণতাদানের জন্য ক্ষেত্রপ্রস্তুত বাংলা নববর্ষের মাহাত্মকে অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। স্বদেশ মানস রচনায় বাঙালি সংস্কৃতি, কৃষ্টি-ঐতিহ্য সর্বোপরি ইতিহাসের আলোকে রক্ষণশীল ও পশ্চাৎপদ চিন্তা-চেতনাকে পরিহার করে আধুনিক ও প্রাগ্রসর অভিধায় জাতিসত্তাকে যথাযথ প্রতিভাত করার সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি বাংলা নববর্ষকে দান করেছে অনবদ্য মাঙ্গলিক যাত্রাপথ । বিশেষ করে দেশের প্রায় বত্রিশ শতাংশ জনগোষ্ঠী বা পাঁচ কোটি ছিয়াত্তর লক্ষ তরুণদের জাগরুক এবং তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকে যথার্থ অর্থে ইতিবাচক প্রবাহমানতায় যুক্ত করার মানসে বাংলা নববর্ষকে অধিকতর সাবলীল ও নান্দনিক অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক মুক্তির পন্থা হিসেবে গ্রহণ করা অপরিহার্য।
আমাদের সকলের জানা যে, বাংলা নামক এই জনপদের সমাজ ইতিহাস অনেক প্রাচীন। অনার্য যুগ থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ তাদের আবাসন, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য উৎপাদন ও গ্রহণের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত। ইংরেজ আমলেই যন্ত্র কৌশলের আবির্ভাব এই অঞ্চলের মানুষকে সেলাইবিহীন থেকে সেলাইকরা পোশাক পরিধানের দীক্ষা দেয়। কৃষি নির্ভর জীবিকা বা ভেতো বাঙালি নামে খ্যাত এই জনপদের জীবনধারা ছিল কৃষি ও নদী নির্ভর। নদী তীরবর্তী জনবসতি এবং তাদের ব্যবহারযোগ্য ভেলা, ডিঙ্গী ইত্যাদি, মাটির তৈরি তৈজসপত্র, ভোজন ও পানপাত্র, কাঠের আসবাবপত্র, মাটি বা বাঁশের দেওয়াল ঘেরা কুঁড়ে ঘর ইত্যাদি এক ব্যতিক্রম ঐতিহ্যিক ধারা বাঙালি সংস্কৃতিকে করেছে সর্বজনীন। ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী হলেও সংস্কৃতির বন্ধনে বাঙালি এক ও অভিন্ন কৃষ্টির অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপনেই এই জনপদের সার্থকতা।
ঐতিহাসিক ধারবাহিকতায় বাংলা বর্ষ বিদায় ও বরণের অনুষ্ঠানমালা এজন্য বারবার আমাদের সেই ঐতিহ্যিক চেতনাকে প্রোজ্জ্বল করে। একদিকে যেমন রয়েছে বিদায়ের করুণ বেহালার সুর অন্যদিকে বরণের এবং সম্মুখে এগুনোর তীর্যক অঙ্গীকার। রবীঠাকুর যেমন তাঁর কবিতায় বলেছেন, ‘রৌদ্রদগ্ধ বৈশাখের দীর্ঘ প্রহর কাটল পথে-পথে।/সন্ধ্যাবেলায় আলোক যখন ম্লান তখন তারা কালজ্ঞকে শুধায়,/“ঐ কি দেখা যায় আমাদের চরম আশার তোরণ-চূড়া?”/ সে বলে, “না, ও যে সন্ধ্যাভ্রশিখরে অস্তগামী সূর্যের বিলীয়মান আভা।”/ তরুণ বলে, থেমো না বন্ধু, অন্ধ তমিস্র রাত্রির মধ্য দিয়ে/ আমাদের পৌঁছতে হবে মৃত্যুহীন জ্যোতির্লোকে।/ অন্ধকারে তারা চলে।/ পথ যেন নিজের অর্থ নিজে জানে,/ পায়ের তলায় ধুলিও যেন নীরব স্পর্শে দিক চিনিয়ে দেয়।/ স্বর্গপথযাত্রী নক্ষত্রের দল মূক সংগীতে বলে, “সাথী, অগ্রসর হও।”/ অধিনেতার আকাশবাণী কানে আসে, “আর বিলম্ব নেই।”
এই বর্ষবরণ ২০১৯ এর প্রাক্কালে বাংলাদেশ বিশ্বপরিমন্ডলে নন্দিত হওয়ার কিছু তথ্য-উপাত্ত আমাদের আরো অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও উল্লসিত করে। অতিসম্প্রতি বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার সরকার দেশকে যেভাবে অদম্য অগ্রগতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তারই আলোকে দেশ প্রথম বারের মত আট শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে। সুখের খবর হচ্ছে এই, ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে ৭.৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুস্পষ্ট করেছে। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৭.৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন ও ২০১৭-১৮ সালের ৭.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে ভিত্তি ধরে বর্তমান আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের উল্লেখ্য প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও ভূটানের প্রবৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৭.৫% ও ৭.৬% যা বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা বেশি পরিলক্ষিত। ১৯৭২ সালে আট বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির আকার বর্তমান সময়ে প্রায় তিনশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৮-০৯ সালের ৫.০৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৭.৮৬ শতাংশ। অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে। সরকারের রূপকল্প ২০২১ বা মধ্যম আয়ের দেশ অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। মাথাপিছু আয় এখন প্রায় দুই হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি যা ছিল ২০০৭-০৮ অর্থসালে মাত্র ৬৮৬ মার্কিন ডলার। পদ্মা সেতু, পায়রা বন্দর, মহেশখালি মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ, এলএনজি টার্মিনাল, মেট্রোরেল ইত্যাদির সঠিক বাস্তবায়ন দেশের প্রবৃদ্ধিকে ‘ডাবল ডিজিটে’ নিয়ে যাবে – নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।
রপ্তানি ও প্রবাসী আয় এমন এক সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে যার ফলে ২০০৮-০৯ সালে ৭.৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০১৭-১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণ এখন আর কোন স্বপ্ন নয়, বাস্তবভিত্তিক প্রযুক্তির প্রয়োগ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এনেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। দশ বছর আগে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে দশ লক্ষ ডলার আয় বর্তমানে প্রায় ত্রিশ কোটি ডলারের অধিক মাত্রা অতিক্রম করছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন তথা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের মনোনিবেশ বাংলাদেশকে মানব উন্নয়ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। ১৯৭২ সালে গড়আয়ু ছিল ৪৭ বছর যা বর্তমানে ৭৩ বছরে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ করার বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রাতহবিলের উন্নয়নসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০তম। মোদ্দাকথায় আর্থ-সামাজিক গতিময়তা নিরীক্ষায় ‘এইচএসবিসি গ্লোবাল রিপোর্ট ২০১৮’ অনুসারে বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির অবস্থান নিশ্চিত করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বস্বীকৃত সততা, সুদক্ষ নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রপ্রশাসনে দৃশ্যমান সাফল্য বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিশাল প্রণোদনার প্রতিক হয়েছে। জাতির জনকের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সামগ্রিক উন্নয়নে দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং এক্ষেত্রে দেশের প্রত্যেক নাগরিক স্ব স্ব অবস্থান থেকে জোরালো ভূমিকা পালনের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা বাংলা নববর্ষ ২০১৯ বরণকে যথার্থ অর্থেই অধিকতর নন্দিত করবে, এটিই স্বাভাবিক ও চিরভাস্বর।
লেখক: শিক্ষাবিদ, উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x