নদীসম্পদকে রক্ষার জন্য চাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

পুলক কান্তি বড়ুয়া

রবিবার , ২৫ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ
34

‘বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ।’ এই বাক্যটি একটি বহুলপঠিত, বহুশ্রুত ও বহুব্যবহৃত বাক্য। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছে অজস্র নদ-নদী। হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে নদীজলের বহমানতা। বাঙালির সমৃদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতির বিশাল অংশজুড়েই রয়েছে নদীর সম্পৃক্ততা। শুধু সাহিত্য-সংস্কৃতি নয় তা কিন্তু কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রাণস্বরূপ বাঙালির স্বচ্ছলতার শক্তিও বটে।বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকাই শত শত নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা পলি মাটি জমে তৈরি হয়েছে। আমদের দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদী, পদ্মা , মেঘনা, যমুনা, সুরমা, আত্রাই, আড়িয়াল খাঁ, কপোতাক্ষ, করতোয়া, কর্ণফুলী , কাঁকন, কীর্তনখোলা, কুশিয়ারা, খোয়াই, গড়াই , চিত্রা, জলঢাকা , ডাকাতিয়া, তিতাস, তিস্তা, তুরাগ, ধলেশ্বরী ,ধানসিঁড়ি, নাফ,পশুর, পাহাড়িয়া, ফেনী নদী, বড়াল, ব্রহ্মপুত্র, বাঙালি, বালু , বিরিশিরি,বুড়িগঙ্গা, ভৈরব নদী, মধুমতী, মনু, মহানন্দা, ময়ূর, মাতামুহুরী, মুহুরী, রূপসা, শঙ্খ নদী, শিবসা নদী, শীতলক্ষা, সাঙ্গু, হালদা প্রভৃতি। নদীগুলোর নাম ভারি সুন্দর। ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে ছোট নদীকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়।
পৃথিবীর আদি সভ্যতা ও মনুষ্য বসতি নদীকেন্দ্রিক। নদীতীরেই প্রাচীন সভ্যতাগুলো গড়ে ওঠেছিল। যেমন ইরাকের ইউফ্রেতিস-তাইগ্রিস নদের সুমেরীয় সভ্যতা, সিন্ধুনদের মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতা, চীনের হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদী সভ্যতা এবং মিশরীয়দের নীলনদের সভ্যতা। এর কারণ মূলত, প্রাচীন মানুষ প্রধানত যাতায়াতের সুবিধার্থেই নদীর তীরে বসতি গড়ে তুলেছিল। খাওয়ার পানি এবং চাষাবাদে সেচের জন্য – এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এছাড়াও নদীর মাছ, পরিবহণ সুবিধা, আমদানি-রফতানি সুবিধা ইত্যাদি বিষয়গুলো মানুষকে নদীকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলেছিল।
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে নদীকে কেন্দ্রকরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার। অধিকাংশ শহর, হাট-বাজার নদীঘেঁষা। কিন্তু আজকের দিনে এসে আধুনিকতার নাম করে সমাজ-রাষ্ট্র যথেষ্ট নদীবিমুখ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণে নদীমাতৃক দেশের নদীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। হারিয়ে গেছে অজস্র নদী। অজস্র নদীতে এখন বর্ষা ছাড়া জলের দেখা পাওয়া যায় না। তা নাহলে খোদ রাজধানী ঢাকার বুড়িগঙ্গা কী করে শিল্পবর্জ্য দ্বারা দূষিত হয়? একই অবস্থা শীতলক্ষ্যা নদীরও। তিস্তা ব্যারাজ থেকে দেড়শ’ কিলোমিটার পর্যন্ত নদী এখন মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। স্রোত না থাকায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। ১৯৭৭ সালে তিস্তার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে ভারত একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তার দুর্বার গতিকে থামিয়ে দেয়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল। সেই নৌপথ কমতে কমতে এখন প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারে নেমেছে। শুষ্ক মৌসুমে আরও কমে হয় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার।
ভারতের সাথে আমাদের যে অভিন্ন ৫৪ টি নদী রয়েছে সেগুলোরও অচিরেই মৃত্যু ঘটবে। তাছাড়া পাহাড় কেটে মানুষ নদীর বুকে মাটি ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এমন একদিন আসবে গল্প-কবিতায় নদীগুলোর নাম পড়ে আগামী প্রজন্ম আমাদের ধিক্কার জানাবে, আর কেউ কেউ ভাববে এমন নদী কি কখনও ছিল!
বাংলাদেশের সকল নদী যদি গতিশীল ও কার্যকরী থাকত নিঃসন্দেহে এদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার শ্রীবৃদ্ধি আরও ব্যাপক হতো। জলজ সম্পদ, পলি, যোগাযোগ, সুলভ পণ্য-পরিবহন সর্বোপরি প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকত। নদীর সাথে এ গভীর মিতালি অস্বীকার করা বাঙালির ঘরের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলার মতো। রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকরী উদ্যোগ গৃহীত না হলে ভাবী প্রজন্ম এই অদূরদর্শিতার কুফল ভোগ করবে। অভিন্ন নদীসমস্যা নিরসনে কার্যকরী কূটনৈতিক পদক্ষেপ, পরিবেশবান্ধব শিল্পব্যবস্থা ও নিয়মিত নদীখননই হতে পারে আমাদের নদীসম্পদকে রক্ষা করার উপায়। জাতীয় শক্তিকে সুদৃঢ় করতে নদীসম্পদকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকৌশলী; আহবায়ক, বাংলাদেশ বাঙালি মূলনিবাসী ইউনিয়ন

x