নতুন সরকারের হাতিয়ার হোক সুশাসন

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
15

আমার ড্রয়িং রুমের পর্দা সরালেই দেখি ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়টায় কাশফুল। এখন আর একেবারে ধবধবে সাদা নেই। কেমন মলিন হয়ে এসেছে মনটা খারাপ হয়ে যায়। যখন কিছু করার থাকে না পড়তে কিংবা লিখতে কোনটাতে মন বসে না তখন এই বারান্দা থেকে ঐ বারান্দা অথবা জানালাগুলোই হয় আমার আশ্রয়। আশেপাশের গাছপালা ও পাখিগুলো হয় আমার সঙ্গী। আকাশ চেয়ে নেয় আমার অব্যক্ত ভাবনাগুলোর নির্ভার উড়াউড়ির দায়িত্ব। কত রকম ভাবনা ডানা মেলে। কয়েকদিন থেকে কিছু মৃত্যু সংবাদ মনটাকে ভারি করে রেখেছে। তার ওপর নানা ধরনের দুঃসংবাদ নতুন বছরের শুরুটাতে এক ধরনের কষ্ট লেপে দিয়েছে যেন মনে। সেই সাথে নানা শঙ্কা। দেশটা কেমন আছে কেমন থাকবে! সুবর্ণচরের মেয়েটাকে দেখিনি তবুও তার অসহায় অদেখা চেহারাটা ভেসে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে। প্রতিটি নির্বাচনে হিংসা বিদ্বেষ আর ক্রোধের জ্বালা মেটানোর জন্য প্রতিপক্ষের নারীদের বেছে নেওয়া হয়! প্রতিপক্ষকে ভোট দেওয়ার অপরাধে ১০/১২ জন মিলে মেয়েটিকে গণধর্ষণ করেছে! এটা মোটেও নতুন কোন ঘটনা নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ সবচেয়ে গভীর বেদনাময় এক মায়ের নিষ্ফল প্রার্থনা ধর্ষকদের কাছে, ‘বাবা আমার মেয়েটা ছোট। তোমরা একজন একজন করে আসো’। এটা ও আর এক নির্বাচনী নিষ্ঠুরতা। সম্ভবত ২০০১ সালের! নিষ্ঠুরতার একটা সীমা আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় এই পোড়া দেশে সেই সীমা রেখাটাও আর নেই! রাজনীতি ধর্ষকদের অপরাধের ভিড় কেন বহন করে? অপরাধীদের রাজনীতিতে কেন প্রয়োজন হয়? রাজনীতি কি মানুষের জন্য নাকি শুধুই ক্ষমতার জন্য? মানুষের জন্য যদি হয় তাহলে কেন মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা? কেন এমন মোটরসাইকেলের ধুলো উড়িয়ে বুঝিয়ে দেয় আমরাই সব! বিজয়ীদের দাপট কেউ পছন্দ করে না এটা বুঝা জরুরি! কোন অপরাধীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হলে সে অবশ্যই তার স্বার্থে সরকারের আশ্রয়। দলের প্রশ্রয় চাইবে এবং সেটা তার অধিকার হয়ে যায়! এ ধরনের জঘন্য অপরাধের শাস্তি হবে বলে আশা করছি। ১৯৯১ সাল থেকে যদি ধরি ক্রমশ প্রতিপক্ষের প্রতি সহিংসতা বেড়ে বেড়ে আজকের এই অবস্থা। এই সব সহিংসতার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো নিহত কিংবা নির্যাতিত প্রত্যেক ব্যক্তির স্বজনেরা নির্যাতনকারীদের প্রতি ঘৃণা ও প্রতিহিংসা পোষণ করে। নির্বাচনের পর থেকে যেসব সহিংসতার খবর আসে সেগুলো সামাজিক শান্তি শৃঙ্খলার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রভাবশালী অপরাধীদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে অবহেলার অভিযোগ অনেক। বিশেষ করে ক্ষমতায় থাকা দলের নেতাকর্মীরা ক্ষমতার ছায়ায় পার পেয়ে যায়। এই অবস্থান থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সহিংসতা এড়ানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নারী নির্যাতনের ঘটনায় আমরা অভ্যস্থ। প্রতিদিন মিডিয়াতে আসে অথবা মিডিয়ার অগোচরেও নারী নির্যাতন নিপীড়ন চলছে। সুবর্ণচরের ঘটনাটি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বলেই আমাদের বেশি বিচলিত করেছে। আমরা জানি নারী নির্যাতনের ঘটনা বেশির ভাগই বিচার হয় না। এ বিষয়ে নতুন সরকার দৃষ্টি দেবে আশা করছি। বিশ্বাস করি মানবিক দৃষ্টিসম্পন্ন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এদেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে পারবেন। মানুষ খাওয়া পরার জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী নয়। যে জিনিসটা একান্তই চাওয়া জনগণের সেটা হচ্ছে শান্তিতে, নিরাপদে, নির্ভয়ে যেন বাঁচতে পারে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। আমরা আশা করছি নতুন সরকারের কাছে এদেশে সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। নতুন সরকারের কাছে আরো প্রত্যাশা, রাজনৈতিক সহিংসতার পরিধি ক্রমশ যেন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে আসে। রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের সম্পর্ক যেন বিরাজমান থাকে। মামলার ভয়ে, হামলার ভয়ে যে মানুষগুলো পরিবার ছাড়া তারা যেন ঘরে ফিরতে পারে! তারা যেন অপেক্ষারত আপনজনের সাথে দিন কাটাতে পারে। ভয় আর আতঙ্ক থেকে বের হয়ে আসুক মানুষ। বের হয়ে আসুক আমাদের রাজনীতি, রাজনীতি হোক সুস্থ প্রতিযোগিতার। কোনভাবেই যেন আর প্রতিহিংসা না হয়। শেখ হাসিনা একজন দক্ষ রাজনৈতিক নেতা ও দক্ষ প্রশাসক এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি। দেশ রাজনৈতিক সহিংসতা ছেড়ে ক্রমশ গণতন্ত্র এবং সুশাসনের দিকে যাবে এটাই প্রত্যাশা করছি। বিগত দশ বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে তা স্বীকার করতেই হবে। দেশ এগিয়ে যাবে সেটা আমরা জানি। কিন্তু বাস্তব কিছু সমস্যা গণতান্ত্রিক কাঠামোতেই সমাধান প্রয়োজন। ক্ষমতা কখনোই চিরস্থায়ী নয়। সরকারের অর্জনগুলো যেন ঢেকে না যায় কিছু দুর্বৃত্তের কারণে। সতর্কতার বিকল্প নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হচ্ছে দলের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা অপরাধ প্রবণ নেতাকর্মীগুলো। এরা সুবিধাভোগী। দেশ দল কোন কিছুর প্রতিই এদের আনুগত্য নেই। ওরা নিজের স্বার্থটাই বড় করে দেখে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশ ও দেশের মানুষ আপনাকে উজাড় করে দিয়েছে। আপনার আর চাওয়া পাওয়ার কি আছে। এবার সুশাসন ও সুবিচার হোক আপনার হাতিয়ার।

x