নতুন সরকারি কর্মচারী বিধিমালা প্রয়োগে প্রয়োজন নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি

বৃহস্পতিবার , ২৬ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
139

কথায় বলে ঘরের শত্রু বিভীষণ। ঘরে যার শত্রু থাকে তার সর্বনাশ করার জন্য বাইরের শত্রুর প্রয়োজন হয় না। বরং ঘরের শত্রুর সঙ্গে বাইরের শত্রু জোট বেঁধে পুরো সংসারটাকে ছারখার করে দিতে পারে। তাই শত্রু চিহ্নিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। শত্রুর বিরুদ্ধে অন্যদের সতর্ক করার পাশাপাশি ক্ষতি করার আগেই শত্রুর গতিবিধি লক্ষ রেখে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উত্তম। ওপরের কথাগুলো পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রসহ সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। অবশ্য শত্রু চিহ্নিত করা সহজ নয়। এ জন্য গভীর পর্যবেক্ষণ ও সময়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার।

গণ মাধ্যমের খবরে জানা গেছে, সরকার, ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮’ জারি করেছে। এ বিধিমালার গেজেট জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে নাশকতার সঙ্গে সরাসরি অথবা নাশকতায় যুক্ত কারও সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছুটি দিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করার সুযোগ দেওয়া হবে। অর্থাৎ বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হবে। কারণ তাকে চাকরিতে বহাল রাখা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ ছাড়া, কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে নাশকতায় জড়িত কিংবা নাশকতাকারী কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন সন্দেহের যুক্তিসঙ্গত কারণ পাওয়া গেলে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হবে। খবরটির কয়েক লাইন পড়ে বিধিটির নেতিবাচক দিকটি মনে পড়লেও আশ্বস্ত হওয়ার কথাও আছে বিধিতে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি চাইলে আত্মপ সমর্থন করে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা তদন্তে তিনজন গেজেটেড কর্মকর্তার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হবে। অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে কারণদর্শাও নোটিশ দেওয়া হবে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এ ধরনের সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে রাষ্ট্রপতি মনে করলে, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে সরকার। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য কিছু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিয়োজিত। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ভেতরেও এরা গোপনে সংগঠিত হওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে প্রায় সময় সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। চাকরির আড়ালে কিছু ব্যক্তি ওঁৎ পেতে থেকে বিশৃঙ্খলা তৈরির সুযোগ খুঁজবে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্বসহ খতিয়ে দেখা এবং প্রমাণসহ সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিচার হওয়া জরুরি।

নতুন এ বিধিমালায় আরও কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে যা জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তিযুক্ত বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। অভিযোগ রয়েছে, দেশের সরকারি আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক কর্মকর্তা নানা বাহানায় মাসের পর মাস, এমনকি একাধিক বছর পর্যন্ত চাকরি স্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এসময় তারা দেশে বা বিদেশে অবস্থান করে নিজের বা পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সুনির্দিষ্ট বিধিমালা না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া যায় না। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী বিনা অনুমতিতে কোনো সরকারি কর্মচারী ধারাবাহিকভাবে ৬০ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে, বিনা অনুমতিতে দেশ ত্যাগ করলে বা ৩০ দিনের বেশি বিদেশে অবস্থান করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। কোনো সরকারি কর্মচারী তার প্রকাশ্য আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন জীবনযাপন করলে, তার ওপর নির্ভরশীল অথবা তার মাধ্যমে বা তার পক্ষে কোনো ব্যক্তি জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন আর্থিক সম্পদসম্পত্তির অধিকারী হলে দোষি সাব্যস্ত হবেন। লঘুদণ্ডে তিরস্কার, পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি স্থগিত হতে পারে। গুরুদণ্ডের ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দণ্ড দেওয়া হবে। এসব ক্ষেত্রে ১০ দিন সময় দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে। গুরুদন্ডের ক্ষেত্রে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটির মতামতের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া, কর্মচারীদের শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসঙ্গত আদেশ অমান্য করা কিংবা কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওপরের বিধিমালাগুলো সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল ১৯৮৫’ তে বিভিন্ন অপরাধের ধরনের কথা বলা থাকলেও শাস্তির নির্দিষ্ট বিধি ছিল না। ফলে অপরাধীদের কোনো শাস্তি দেওয়া দুঃসাধ্য ছিল। নতুন ব্যবস্থায় অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হলে জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ও দুর্নীতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। এ ক্ষেত্রে এটাও প্রত্যাশা করি, তদন্ত ও শাস্তির প্রয়োগ যেন দলমতের ঊর্ধ্বে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং কেউ যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন সরকার তা নিশ্চিত করবে।

x