নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে কমে যাচ্ছে আবাদি কৃষি জমি

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ
48

সীতাকুণ্ডে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে আবাদি কৃষি জমির পরিমাণ। দুই ও তিন ফসলি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ফসলের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। আবাদি জমির ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে আগামী এক দশক পরে সীতাকুণ্ডে চরম খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। অপরিকল্পিত বাড়ি ঘর, নতুন নতুন শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত, হাট-বাজার নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে সীতাকুণ্ডে কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
গত কয়েক দশকে ২০/২৫ হাজার একর আবাদী জমি নষ্ট হয়েছে বিভিন্নভাবে। কৃষি জমি বিনষ্টের এ প্রক্রিয়া যুগ যুগ ধরে চলতে থাকলেও তা প্রতিরোধের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না সরকারি মহল থেকে। দক্ষিণ সীতাকুণ্ডের ১২ মাইল উপকূলীয় জনপদ সমুদ্রের ভাঙনে তছনছ হয়েছে। বাস্তুহারা হয়েছে অসংখ্য পরিবার। আবাদী জমি বিলীন হয়েছে কয়েক হাজার একর। এদিকে সন্দ্বীপের অব্যাহত ভাঙনের বিরূপ প্রক্রিয়ায় পড়েছে সীতাকুণ্ডের ওপর। ভাঙনের তাড়া খেয়ে সন্দ্বীপের লোকজন সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় নতুন বাড়ি ঘর নির্মাণ করছে প্রতিবছর।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় দশ সহস্রাধিক পরিবার বিভিন্ন সময়ে সন্দ্বীপ থেকে এসে সীতাকুণ্ডে বসতি গড়েছে। যার চাপ পড়েছে এখানকার কৃষি জমির ওপর।
সীতাকুণ্ডের আয়তন ১৪৮ বর্গমাইল। এই উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে দেশের প্রধান চার লেইনের মহাসড়ক ও রেললাইন। মহাসড়ক ও রেললাইন দু’টির গা ঘেঁষে গড়ে ওঠেছে বহু ছোট-বড়,মাঝারী ও ক্ষুদ্র শিল্প কল-কারখানা। এছাড়াও ১৫০টির বেশি রয়েছে শিপব্রেকিং ইয়ার্ড। গত কয়েক বছরে উপজেলার বাড়বকুণ্ড এলাকায় কৃষি জমির উপর গড়ে উঠেছে বেশ কিছু এলপি গ্যাস ফ্যাক্টরি। যার ফলে শ’ শ’ হেক্টর জমি হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ সড়ক ও হাট-বাজার নির্মাণ, সরকারি অফিস-আদালত স্থাপন,স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মক্তবসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গোড়াপত্তনের ফলে আবাদী জমি নষ্ট হচ্ছে প্রতি বছর।
সরকারি হিসাব মতে, সীতাকুণ্ড উপজেলায় মোট কৃষি জমির পরিমাণ ১০ হাজার হেক্টর। সীতাকুণ্ডে জনসংখ্যা হু হু করে বাড়লেও কৃষি জমির পরিমাণ কমছে। উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়নে লোকসংখ্যা প্রায় ৪লাখ। সীমানা ও আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত বাইরের লোকজনের বাসস্থানের সুবিধার্থে মিল এলাকার কাছাকাছি কৃষি জমির ওপর তৈরি করা হয়েছে ভাড়াটে ঘর। সীতাকুণ্ডের প্রকৃতি কোথাও নিস্ফলা নয়। পাহাড়, সমুদ্র, সমতলভূমি সকল প্রান্তেই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় ন্যূনতম উপাদান আছে, পাহাড়ে রয়েছে কোটি কোটি টাকার বনজ সম্পদ। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন সম্পদ, যেমন পেয়ারা, কাঁঠাল, পেঁপে,আম,কলা, লিচু, আনারস, বাতাবি লেবু, তরমুজ, বাঈগী, আঁখ ইত্যাদি। কাঁচা শাকসবজীর চাষও বেশ হয়ে থাকে। সমুদ্রে রয়েছে মৎস্য সম্পদ। সমুদ্রের উপকুলীয় এলাকায় রয়েছে বনজ সম্পদ ও শীপ ইয়ার্ড শিল্প। সমতল ভূমিতে রয়েছে শতাধিকেরও বেশি বৃহৎ শিল্প-কারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান এবং কোটি কোটি টাকার অর্থকরী ফসল বা কৃষিজাত দ্রব্যাদি। শীতকালে যেমন সবধরণের শাক-সবজি তেমনি গ্রীষ্মকালেও সবধরণের গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজি প্রচুর উৎপাদন হয়। বলাবাহুল্য শীতকালীন শিম উৎপাদনে সীতাকুণ্ডের সুনাম দেশ ছেড়ে বিদেশেও। মোটকথা অর্থনৈতিক দিক থেকে সীতাকুণ্ড বেশ সমৃদ্ধ এলাকা। সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতেও সীতাকুণ্ড উপজেলা বাংলাদেশের অন্যান্য উপজেলা থেকে অধিকতর এগিয়ে।
জানা যায়, আইন অনুসারে কৃষি জমি কৃষিকাজ ব্যতিত অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোন কৃষি জমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোন অকৃষি স্থাপনা কোনভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উল্লেখ্য থাকলেও প্রতিনিয়তই কৃষি জমি ব্যবহৃত হচ্ছে অকৃষি কাজে।
বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদের ফলে কৃষিখাতে ফসলাধীন জমির হারে গড় উৎপাদন বাড়লেও সামগ্রীকভাবে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। তার প্রধান কারণ জনসংখ্যা বিস্ফোরণের ফলে এবং নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার কারণে প্রতিবছর কৃষি জমি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাফকাত রিয়াদ বলেন, কৃষি জমিতে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে ফসলি জমি কমছে। কমে যাচ্ছে আবাদি জমির পরিমাণ। তাঁর মতে, কৃষি জমি ভরাট আইনের প্রয়োগ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে কিছুটা হলেও এ অবস্থার উন্নতি হবে।
সীতাকুণ্ড পৌর মেয়র বদিউল আলম জানান, একদিকে জমির মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে অন্য এলাকার লোক এসে বসতি গড়ার কারণেই কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। কৃষকরা চাষ করে লোকসানে পড়ছে। যার কারণে কৃষকরা কৃষি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে। তাই এলাকার বেশির ভাগ জমি কৃষিচাষ না করে খালি পড়ে থাকে। এক সময় জমি বিক্রিতে ভালো মূল্য পাওয়ার লোভে বিক্রি করে দেয়।

Advertisement