নতুন করে চাঙ্গা হোক খাতুনগঞ্জ

শনিবার , ৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৩:৪৬ পূর্বাহ্ণ
106

চট্টগ্রামকে বলা হয়ে থাকে বাণিজ্যিক রাজধানী। অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই নগরীর অবদান অনস্বীকার্য। কথিত আছে, আদিকাল থেকে বিশ্বের হরেক ব্যবসায়ী, জলদস্যু কিংবা বাণিজ্যতরীবাহী নাবিকের দল চট্টগ্রামের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের স্বাদ আস্বাদন করে এসেছে। গবেষকদের মতে, ভিনদেশী বণিক কিংবা নানা ভাষাভাষী মানুষ, আদিবাসী ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ছাড়াও নানা বর্ণের মানুষের মিলনমেলা ও বাণিজ্য সম্পর্কের ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গড়ে উঠেছে একটি মাল্টিলিঙ্গুয়াল সোসাইটি। ভিনদেশী বাণিজ্যগোষ্ঠী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের পদচারণায় একসময় খাতুনগঞ্জ একটি বাণিজ্য তীর্থে পরিণত হয়েছিল। আছদগঞ্জ, রামজয় মহাজন লেন, চাক্তাইসহ একাধিক প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের হরেক রকমের বাণিজ্য বৈচিত্র্য খাতুনগঞ্জকে রূপ দিয়েছে অনন্যতায়। ্লসেই খাতুনগঞ্জ এখন তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। গত ২ জানুয়ারি দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয় ‘খাতুনগঞ্জে ব্যবসায় ছন্দপতন’ শীর্ষক প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, একাদশ সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। তবে, নির্বাচন কেন্দ্রিক ব্যস্ততায় ছন্দপতন ঘটেছে ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের বিকিকিনিতে। গত দুই সপ্তাহ ধরে এ ধরনের ছন্দপতন চলছে। বেচাকেনা নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। নির্বাচনকে ঘিরে মোকাম থেকে পাইকারি ক্রেতারা বাজারে আসেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবে কমেছে বেচাকেনা। শুধু ভোগ্যপণ্যই নয়, অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হয়েছে খাতুনগঞ্জে। এখানকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানালেন এসব তথ্য। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য মতে, নির্বাচনের ব্যস্ততায় মূলত লেনদেন কমে যায় এখানে। গত দুই সপ্তাহ থেকে ধাপে ধাপে পণ্য বিক্রির প্রবণতা কমে। নির্বাচনের আগের এক সপ্তাহে এ প্রবণতা দেখা যায় অস্বাভাবিকভাবে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে। খাতুনগঞ্জে লেনদেনের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকগুলোর লেনদেনের তারতম্য।
আসলে ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা পরিক্রমায় বাংলাদেশের যে অবস্থান, সেই জায়গায় খাতুনগঞ্জের অবদান অতুলনীয়। দেশের নানা ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভ্রূণ তৈরির পেছনে একটি মাত্র বাজার বড় অবদান রেখেছে সেই নিকট অতীত থেকে। একসময় খাতুনগঞ্জই বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্য বাণিজ্যের প্রায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করত। খাতুনগঞ্জই চট্টগ্রামকে একটি বড় প্লাটফরম তৈরি করে দিয়েছে সম্ভাবনা আর বাণিজ্য জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে। বর্তমানে তার সমৃদ্ধ অতীত যেন ম্লান হতে বসেছে। আধুনিক অবকাঠামোর পরিধি ও ডিজিটাল ইন্টারনেটের যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যও চলছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে। এ কেন্দ্রটিও বিভিন্ন এলাকায় যদিও ডিজিটালাইজড হয়েছে, তবু পূর্ণ উদ্যোমে কাজ এগিয়ে নেওয়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আমরা জানি, খাতুনগঞ্জকে কেন্দ্র করে আগ্রাবাদ, মাঝিরঘাট, সদরঘাট, ফিরিঙ্গিবাজারসহ চট্টগ্রামের একাধিক এলাকার বাণিজ্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে। এক সময় শুধু খাতুনগঞ্জকেন্দ্রিক বাণিজ্যের পরিধি ছড়িয়ে চট্টগ্রামের একাধিক প্রবেশমুখ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ বাণিজ্যে রূপান্তরিত হয়। আন্দরকিল্লা, টেরিবাজার, লালদীঘিরপাড়, ফিশারিঘাট ইত্যাদিও ক্রমেই খাতুনগঞ্জের বাণিজ্য ভাবধারায় বিশেষায়িত পণ্য বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অসংখ্য পণ্য ও জিনিসপত্রের ব্যবসার মধ্যে চাল ও মসলা হলো চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের প্রধান দুই ব্যবসা। বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগের সমস্ত জেলায় চাল ও মসলা চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকে সরবরাহ করা হতো। একসময় সড়কপথের পাশাপাশি জলপথেও পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। ফলে শত শত বছর ধরে এখানে গড়ে উঠেছিল জমজমাট ব্যবসা। চট্টগ্রামে সমুদ্র বন্দর থাকায় চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী চাল ও মসলা আমদানী করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করত। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আমদানিকারক প্রয়োজনে ভারত, পাকিস্তান, বার্মা থেকে চাল আমদানি করতো। আর মসলা আমদানি করতো ইরান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, পাকিস্তান, ভারত, বার্মা ও চীন থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় চাল-মসলা আমদানি হলেও একসময় দেশের সমস্ত আমদানি হতো চাক্তাই-খাতুনগঞ্জকে ঘিরে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন জায়গায় আমদানি শুরু হলেও বৃহত্তর চট্টগ্রাম আর চট্টগ্রাম বিভাগের সম্পূর্ণ চাহিদা একমাত্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকেই পূরণ হতো। কিন্তু বর্তমানে চাল ও মসলার ব্যবসা এখন আর চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে সীমাবদ্ধ নেই। নিত্য যানজট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পুলিশের টোকেন বাণিজ্য, ট্রাক মালিক সমিতি ও চাঁদাবাজির কারণে চাল ও মসলার ব্যবসা বর্তমানে নগরীর পাহাড়তলী কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পাহাড়তলী এখন চালের প্রধান বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। তার পাশাপাশি মসলার বাজারও এখন সেখানে দিন দিন জমে উঠছে। সংকট নিরসন ও পরিকল্পনার অভাবে শত শত বছরের ঐতিহ্যে ধারক খাতুনগঞ্জের সেই সোনালী অতীত বিলুপ্তির পথে। এ বিষয়ে বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট লোকজনকে ভাবতে হবে। আমরা চাই, খাতুনগঞ্জ আবার চাঙ্গা হয়ে উঠুক। আবার হয়ে উঠুক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র।

x