নজর দিতে হবে এসব ‘পাড়ায়’

হাম ট্রাজেডি : সীতাকুণ্ড থেকে হাটহাজারী

ফজলুর রহমান

শনিবার , ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ
39

গত ২১ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ত্রিপুরা পাড়ার একই পরিবারের অন্ন রায় (০৫), সুমা রায় (০৩) অন্ন বালা (০৭) এবং আরেকজন শিমুনী ত্রিপুরা (০৩) হাম রোগে মারা যায়। আক্রান্ত ছয় শিশু থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করে চারজনের দেহে হাম ভাইরাসের প্রমাণ মেলে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ত্রিপুরার পল্লীর বাসিন্দারা সমাজের মূল অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা একটি সমাজ প্রথা গড়ে তুলেছেন। অধিকাংশ ত্রিপুরারা বন জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ ও অন্যের জমিতে সবজির আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে। শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ব্যবস্থার দিক থেকে পার্শ্ববর্তী বাঙালি পড়ার চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে আছে তারা। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে কারো কুনজরের যোগসাজোশ খোঁজেন। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ছুটে যান বৈদ্য ও কবিরাজের কাছে। ত্রিপুরা পল্লীতে ৫২টি পরিবারে ৩৭০ জন লোক বাস করে। এই জনসংখ্যার জন্য একটি নলকূপ কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। বাধ্য হয়ে তারা খাল ও ছড়ার পানির পান করেন। এছাড়া হারাধন ত্রিপুরা নামের একজন আদিবাসী সংবাদ কর্মীর নিকট অভিযোগ করেন, ‘আমাদের এখানে কোনো স্বাস্থ্য কর্মী আসেন না। টিকা দেয়ার সময় এলে পার্শ্ববর্তী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মাঝে মাঝে মাইকিং করা হয়। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের এখানে নারী পুরুষ সবাই কৃষি ও জুম চাষে ব্যস্ত থাকে। তাই অধিকাংশ শিশু টিকা পায় না। আমরা অশিক্ষিত মানুষ, আমাদের এখানে যদি তারা (স্বাস্থ্য কর্মীরা) না আসে তাহলে ত্রিপুরা পল্লীর লোকজন কিভাবে সচেতন হবে?’ এই অভিযোগ যাচাই করা প্রয়োজন। যদি সত্য হয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন জলদি।

শিক্ষা নেয়া যেত সীতাকুণ্ড ত্রিপুরা পল্লী থেকে

গত বছরের ১২ জুলাই সীতাকুণ্ডের বারো আউলিয়াস্থ ত্রিপুরা পল্লীতে ‘হাম’ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন শিশু মারা যায়। জানা গেছে, জন্মের পর শিশুদের টিকা না নেয়ার কারণে এ রোগ ছড়িয়েছে। টিকা না দেয়ায় বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের ডাক্তারকে না জানানোর পেছনে ছয় স্বাস্থ্যকর্মীর গাফিলতি ছিল বলেও ধারণা করা হয়। ওখান থেকে শিক্ষা নিলে এড়ানো যেত হাটহাজারী ত্রিপুরা পাড়ার ট্রাজেডি। টিকা দেয়া এবং খোঁজখবর রাখার মাধ্যমে রুখে দেয়া যেত এই কোমল প্রাণের অপচয়।

হাম রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে, হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ। পৃথিবীজুড়ে এর প্রকোপ দেখা যায়। সাধারণত আক্রান্ত রোগীর হাঁচিকাশির মাধ্যমে এর ভাইরাস আশপাশের সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির ঘরে ঢুকলেও সুস্থ যে কেউ হামের জীবাণুতে আক্রান্ত হতে পারে। হামের ভাইরাস মানব দেহে ১০ থেকে ১৪ দিন পযর্ন্ত জীবিত থাকে। অর্থাৎ সুস্থ কারও শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করার পর ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ প্রকাশ পায়। পরিসংখ্যান মতে, সারাবছর পৃথিবীতে প্রায় ১ কোটি মানুষ হামে আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে নানা রকম জটিলতার কারণে ২ লাখের মৃত্যু ঘটে থাকে। সবচেয়ে আতঙ্কেও বিষয় এই যে, হামের কারণে ৫ বছর কম বয়সী শিশুরাই বেশি মৃত্যুবরণ করে। যে শিশুরা ঠিকভাবে বলতে পারেনা, বুঝাতে পারেনা নিজেদের রোগশোকের কথা।

হামের লক্ষণ

হাম হলে প্রচণ্ড জ্বর হয়। জ্বরের সঙ্গে সারা শরীরে ব্যথা, চোখনাক দিয়ে পানি ঝরা, কাশি, মাথাব্যথা, কানে ব্যথা ইত্যাদি নানারকম উপসর্গ দেখা দেয়। জ্বর শুরু হওয়ার ৩ থেকে ৫ দিনের মাথায় শরীরে গুঁড়ি গুঁড়ি দানা ওঠে। দেখতে অনেকটা ঘামাচির মত। প্রথমদিকে, চুলের রেখা বরাবর ও কানের পেছনে আর ঘাড়ে, তারপর মুখে ও গলায় এবং সেখান থেকে নীচে নামতে নামতে শেষে হাতে পায়ে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরে তখন প্রচুর চুলকায়। হামের লাল দানা ওঠার ৪ দিন আগ থেকে শুরু করে পরবর্তী ৪ দিন পর্যন্ত রোগীর শরীর থেকে হামের জীবাণু অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে। এসময়ে আলতোভাবে শরীরের কোথাও চামড়া পেঁয়াজের ছিলকার মত খসে যায়।

হামের চিকিৎসা

হামের দ্রুত কোনো চিকিৎসা নেই। রোগীকে বিশ্রাম নিতে দিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার যেমনমাছ, মাংস, দুধ, ডিম এবং সকল প্রকার শাকসবজি খেতে দিতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল এবং গায়ে চুলকানির জন্য এন্টিহিস্টামিন দেয়া যেতে পারে।

হামের প্রতিরোধ

প্রথম প্রতিরোধপ্রত্যেক শিশুকে হামের টিকা দিতে হবে। ঘরের কোন শিশুর যদি হাম হয়ে থাকে এবং অন্যান্য শিশুদের হামের টিকা দেয়া না থাকে তবে তাদেরকে হামের টিকা দিতে হবে। শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হয়ে ১০ মাসে পড়লেই হামের টিকা দিয়ে দিতে হয়।

বছরখানেক আগে গিয়েছিলাম রাঙ্গুনিয়ার কোদালা চা বাগানে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ চা বাগান এটি। যশখ্যাতি আছে খুব। সেই চা বাগানের দুপাশে দু’রকম দৃশ্য। এক পাশে আবহমান বাংলা। ঐশ্বর্য আর বলশালী মানুষে ভরা। এটি চা বাগানের আগের ভাগ। আর চা বাগানের পরের ভাগের দৃশ্য খুব করুণ।

রোগশোকে ভুগতে থাকা মানুষের ছড়াছড়ি। নাগরিক সুবিধা তেমন নেই বললেই চলে। অবস্থা এমন যে, এলাকার গরুবাছুরগুলোও ছিল ছোটখাটো গড়নের, পুষ্টিহীন চেহারায়। সেখানে গিয়ে মনে পড়লো প্রয়াত বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জামাল নজরুল ইসলামের কথা। চুয়েটের একজন সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তাঁকে পেয়ে বিভিন্ন সময় স্যারের সান্নিধ্যে ছিলাম বেশ। তিনি একান্ত আলাপে কিংবা সভাসেমিনারে কিছু কমন কথা বলতেন। কমন কথার কারণে মনেও থাকতো বেশ। সে কথাগুলোর একটি হলো, ‘সুযোগ থাকলে গ্রামের মানুষদের জন্য কিছু করুন, শহরের মানুষের জন্য অনেক কিছু করা হয়ে গেছে, শহরবাসী অনেক বেশি পেয়ে গেছে, এখন গ্রামের মানুষকে দেয়ার পালা, গ্রামের মানুষ বিশেষ করে, প্রান্তিক এলাকার মানুষগুলো এখনো খুব দুঃখীঅসহায়।’ ‘হাম ট্রাজেডি’ স্যারের উচ্চারিত কথাগুলোই যেন প্রতিবিম্বত করছে।

আমরা সকলে জানি, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অনেক উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে, শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্যসেবায়। বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি জাতিসংঘ কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় এখনো অনেক দেশ টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের মতো সফলতা পায়নি। বাংলাদেশ এখন পোলিওমুক্ত দেশ। বাংলাদেশ কোনো স্বল্পসংখ্যক জনসংখ্যার ধনী দেশ নয়। সম্পদের সীমাবদ্ধতাসহ ঘন বসতিপূর্ণ বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশ।

সুতরাং এমন একটি দেশে এত বড় বড় সাফল্য অর্জন কোনো বিচারেই সহজসাধ্য ছিল না। অথচ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকগুলো সূচকে তার প্রতিবেশীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশের সমান কিংবা কাছাকাছি পরিমাণ মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। এখন বড় বড় জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী, একাডেমিক, অর্থনীতিবিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের কাছে স্বাস্থ্যখাতের সাফল্যে বাংলাদেশ একটি সফলতম উদাহরণ।

এসব সাফল্যকে মজবুত করতে এখন আমাদের নজর দিতে হবে বিভিন্ন প্রান্তিক পাড়ায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে এসব ট্রাজেডি। বাড়াতে পারে নেতিবাচক ইমেজও। এতসব অর্জনে এমন কয়েকটি ঘটনার কালিমা যুক্ত এটি আমাদের কাম্য নয়।

লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

x