নগর ভবন নির্মাণে আবার তোড়জোড়

মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছে ১৫০ কোটি টাকার ডিপিপি টাইগারপাসে অস্থায়ী কার্যালয়ে চলছে সাজসজ্জা

মোরশেদ তালুকদার

রবিবার , ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৮:১০ পূর্বাহ্ণ
448

নগর ভবন নির্মাণে আবারো তোড়জোড় শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এর অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ‘প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনা’ (ডিপিপি) মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে। একইসঙ্গে টাইগারপাসে চসিকের মালিকানাধীন ভবনকে ‘অস্থায়ী কার্যালয়’ হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই আন্দরকিল্লাস্থ বিদ্যমান নগর ভবন থেকে অফিস স্থানান্তরের লক্ষ্যে অস্থায়ী কার্যালয়ে চলছে সাজসজ্জা। সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন বিষয়গুলো দৈনিক আজাদীকে নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে অভিযোগ আছে, টাইগারপাসের বাটালি হিল এলাকায় অস্থায়ী কার্যালয় হতে যাওয়া চসিকের সাততলা বিশিষ্ট ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল বস্তিবাসীদের জন্য। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরুর আগে ওই স্থানে বিদ্যমান বস্তি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল ৩৩ পরিবারকে।

উচ্ছেদকালে প্রতি পরিবার থেকে ১০ হাজার টাকা করেও নিয়েছিল চসিক। পরবর্তীতে নির্মাণ কাজ শেষে তাদেরকে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু ফ্ল্যাট বুঝে না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও অর্থ সংস্থান না হওয়ায় নগর ভবন নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করা যায় নি। ২০১৭ সালে ১২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি’র সভা থেকে বাদ পড়ে, অর্থ সংস্থান জটিলতায়। সর্বশেষ গত বছরের শেষের দিকে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে ‘গ্রীন সিগন্যাল’ পান মেয়র। এরপর পুরোনো প্রকল্পকে আবারো সংশোধন করে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শুরু করে প্রকৌশল বিভাগ। এক্ষেত্রে ২০১৮ সালের ‘রেইট শিডিউল’ অনুযায়ী ডিপিপি করায় প্রকল্প ব্যয় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা হতে পারে। ডিপিপি’টি চূড়ান্ত করে চলতি সপ্তাহেই মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সিটি মেয়র দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘প্রায় ১৫০ কোটি টাকার প্রকল্প চলতি সপ্তাহেই মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। এটা হবে আইকন টাওয়ার। তিনটি বেইজমেন্টে ২৫ তলা হবে নগর ভবন। দীর্ঘ মেয়াদি চিন্তা করেই এই নগর ভবন হবে। যাতে আগামী ৫০/৬০ বছরের পরের চাহিদাও যেন পূরণ হয়, সেটা বিবেচনা করেই নগর ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা আছে।
চসিক প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘নগর ভবনের জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। আশা করছি, এই সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পারবো।
এদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী সবার ওপরে থাকবে সিটি ক্লক। ভবনের তিনপাশে সাজানো বাগান থাকবে। ভবনের কয়েকটি ফ্লোর বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেয়া হবে। ২২ থেকে ২৫ নম্বর ফ্লোরে থাকবে মাল্টিপারপাস হল, ব্যাংকুয়েট ও কনফারেন্স হল।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৪ মে সিজেকেএস কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মেয়র চসিকের প্রকৌশলীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন নগর ভবনের প্রকল্প প্রস্তব তৈরির জন্য। পরবর্তী ৭৪ কোটি টাকায় ২০ তলা বিশিষ্ট নগর ভবনের ডিপিপি প্রণয়ন করে। একই বছরের ২৮ জুলাই মেয়রের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিপিপিটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সেটি সংশোধন করে তিনতলা বেসমেন্টসহ ২৫ তলাবিশিষ্ট নগর ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তখন ভবন নির্মাণে জনতা ব্যাংকের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকা ঋণও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে আপত্তি জানায় অর্থ মন্ত্রণালয়। ফলে সৃষ্টি হয় অর্থ সংকট জটিলতা।
এর আগে ২০১০ সালের ১১ মার্চ নতুন নগর ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন মেয়র আলহাজ্ব এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া শুরু হয়েছিল এ নগর ভবন নির্মাণের কাজ। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ জে কনস্ট্রাকশন নগর ভবনের প্রথম ছয়তলা নির্মাণের কাজ পেয়েছিল ওই সময়। ওই সময় চসিকের নিজস্ব তহবিল থেকে নগর ভবনের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৮ কোটি ৮৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে মেয়র আ.জ.ম নাছির দায়িত্ব গ্রহণের পর এ জে কনস্ট্রাকশনর সাথে চুক্তি বাতিল করে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ১৭ জুন অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরী পরাজিত হলে নগর ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে মেয়র মনজুর আলমের সময়ে আবারো নগর ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নগর ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়। এরপর বিভিন্ন জটিলতায় প্রায় তিন বছর কাজ বন্ধ থাকে। ২০১৪ সালে পুনরায় কাজ শুরু হয়। কিছুদিন যেতেই অর্থাভাবে আবারও কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে নতুন নগর ভবন নির্মাণকে ঘিরে মাস দুয়েকের মধ্যে অফিস স্থানান্তরের লক্ষ্যে টাইগার পাসের ভবনটিতে চলছে সাজসজ্জার কাজ। গত নভেম্বর মাস থেকে এ কাজ শুরু হয়েছে। টাইগারপাসে অস্থায়ীভাবে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রক্রিয়া চলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সিটি মেয়র বলেন, আমাদের টার্গেট, যত দ্রুত পারি চলে যাব। তবে আশা করছি, মাস দুয়েকের মধ্যেই যাব।
অবশ্য টাইগার পাসের ভবনটি নিয়ে আপত্তি আছে বস্তিবাসীদের। তাদের সেখানে পুর্নবাসনের প্রতিশ্রুতি ছিল। ভবনটি’র নির্মাণ কাজ শুরুর সময় প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম ধরা হয়োছল ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। ভবন নির্মাণ কাজ শুরুর সময় সেখানে বস্তি ছিল। তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। ওইসময় সেখানে থাকা ৩৩ পরিবার ‘টোকেন মানি’ হিসেবে ১০ হাজার টাকা করে পরিশোধ করে। পরবর্তীতে ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার পর মাসিক ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা করে বাকি টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল।
এ প্রসঙ্গে ফ্ল্যাট প্রত্যাশী ও টাইগারপাস গৃহহীন মাতৃছায়া কমিটির আহবায়ক রমজান আলী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও আমরা এখনো ফ্ল্যাট বুঝে পাই নি। ফ্ল্র্যাট বুঝিয়ে দিতে মেয়র মহোদয়ের কাছে আমরা আকুল আবেদন জানাচ্ছি।”
এ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, “চট্টগ্রাম শহরে কয়েক লক্ষ বস্তিবাসী আছে। কারো মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করে তো প্রতিষ্ঠানের উপরই চাপ প্রয়োগ করা হবে। বস্তিবাসীদের স্থায়ী পুর্নবাসন সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে অসম্ভব। একটা পরিসংখ্যান আছে নগরে ১০ থেকে ১২ লক্ষ বস্তিবাসী আছে। এত বিশাল সংখ্যককে কিভাবে পুর্নবাসন করবে সিটি কর্পোরেশন। তবু তাদের নিয়ে আমার পরিকল্পনা আছে, যোগাযোগ আছে। সেখানে (টাইগারপাসস্থ চসিকের ভবনে) চার পরিবার ছিল, তাদেরকে অন্যত্র ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’

x