নগর পরিবহনে অরাজকতা

নির্ধারিত স্থানে গাড়ি থামে না, মোড়ে মোড়ে জটলা মানে না রুট পারমিট, পারমিটবিহীন সহস্রাধিক গাড়ি

ইকবাল হোসেন

বৃহস্পতিবার , ১৩ জুন, ২০১৯ at ৪:৩৪ পূর্বাহ্ণ
128

নগর পরিবহনে অরাজকতা থামছে না। নগরীতে চলাচলকারী গণপরিবহনের বেশিরভাগই মানছে না নির্ধারিত রুট। রুট না মানার ক্ষেত্রে আছে টেম্পো থেকে শুরু করে বাস-মিনিবাস ও হিউম্যান হলার। নির্ধারিত স্থানে গাড়ি থামে না, তাই মোড়গুলোতে সবসময় জটলা হয়। ফলে যানজটে নিত্য দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন নগরবাসী।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রুট পারমিটবিহীন কিংবা রুট না মেনে গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দেন ট্রাফিক বিভাগের কতিপয় সদস্য। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ট্রাফিক বিভাগ বলছে, মানুষের আইন না মানার সংস্কৃৃতির কারণে এ সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৬ রুটে তিন হাজার অটোটেম্পো, ১৭টি রুটে দেড় হাজার হিউম্যান হলার ও ১৪টি রুটে এক হাজারের অধিক বাস-মিনিবাস অনুমোদন দেয় রিজিউনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি (আরটিসি)। তাছাড়া নগরীতে অনুমোদিত টেক্সি রয়েছে ১৩ হাজার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব যানবাহনের মধ্যে অনেকগুলো নির্ধারিত রুট মেনে চলে না। অনুমোদনের অতিরিক্ত আরো প্রায় সহস্রাধিক গাড়ি রুট পারমিট না নিয়ে চলে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশকে নির্ধারিত মাসোহারার মাধ্যমে রুট পারমিট না মেনে ও অননুমোদিত রুটে গাড়ি চালাচ্ছেন অনেকে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য গাড়ি থামানোর জন্য স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে গাড়ি না থামিয়ে মোড়গুলোতেই জটলা তৈরি করেন চালকেরা।
বাস-মিনিবাসের ক্ষেত্রে কর্ণফুলী ব্রিজ হতে বহদ্দারহাট-কাপাসগোলা- চকবাজার-সিরাজউদ্দৌলা রোড-আন্দরকিল্লা হয়ে কোতোয়ালী মোড় পর্যন্ত ১ নং রুট। কিন্তু গাড়ি চলে বহদ্দারহাট থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত। এ রুটে ৪৩টি বাস-মিনিবাসের অনুমোদিত রুট পারমিট রয়েছে। একইভাবে ২ নং, ৮ নং ও ১০ নং রুটের বাস-মিনিবাসগুলো নিয়ম মেনে চলে না। আবার হিউম্যান হলারের ক্ষেত্রে ১৭টি নির্ধারিত রোড থাকলেও বেশ কয়েকটি রুটে অনেকে তা মেনে চলে না। হাটহাজারী থেকে ছেড়ে আসা দ্রুতযান পরিবহনের বাস অক্সিজেন-বায়েজিদ-নাসিরাবাদ হয়ে নিউ মার্কেট রুটে চলাচল করার কথা থাকলেও মালিক ও শ্রমিকরা ট্রাফিক পুলিশের সাথে যোগসাজশ করে বেশিরভাগ গাড়ি অক্সিজেন-মুরাদপুর হয়ে চালানো হয়। দ্রুতযান সার্ভিসের এসব বাসের সাথে ৩ নং রুটের বাস-মিনিবাসগুলোর একটি অংশ মুরাদপুরে জটলা তৈরি করে। সাথে যুক্ত হয় মুরাদপুর-অক্সিজেন রুটে চলাচলকারী পারমিটবিহীন কয়েকশ টেম্পো। কম-বেশি একই চিত্র বহদ্দারহাট, নাসিরাবাদ ২ নং গেট, নিউ মার্কেট, কোতোয়ালী মোড়, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট ও বড়পুলে।
১০ নং রুটের অনেক বাস নির্ধারিত রুটে সি-বিচ না গিয়ে ইপিজেড মোড়ে ঘুরিয়ে দেয়। একইভাবে কালুরঘাট ও কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত যাওয়ার কথা থাকলেও বহদ্দারহাট মোড়ে ঘুরিয়ে দেয় এসব রুটের বাস-মিনিবাস ও হিউম্যান হলার। অন্যদিকে টেম্পোর জন্য নির্ধারিত ১৬টি রুট রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানা হয় না। অঙিজেন-মুরাদপুর-গণিবেকারি-লালখান বাজার হয়ে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত অটোটেম্পোর নির্ধারিত ১ নং রুট। কিন্তু এই রুটটি দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে অনেক আগে। এ রুটে অঙিজেন থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত এবং চকবাজার থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত আলাদা রুট করে টেম্পো ও ম্যাঙ্মিা চলাচল করে।
লালদীঘি হতে কদমতলী-দেওয়ানহাট-ঈদগাঁ কাঁচারাস্তা-নয়াবাজার- ফইল্যাতলী বাজার-সাগরপাড় বাইপাস পর্যন্ত ৩ নং রুট হলেও এটিকে তিন অংশে ভেঙে চলাচল করে টেম্পোগুলো। এ রুটের কোনো গাড়ি লালদীঘি থেকে ছাড়া হয় না। স্টেশন রোড (নিউ মার্কেট মোড়)- ফইল্যাতলী রুটে চলে বড়তাকিয়া ডাইহাটসু মডেলের পুরনো টেম্পোগুলো। এ রুটের দেওয়ানহাট থেকে ফইল্যাতলী পর্যন্ত চলে নতুন ম্যাঙ্মিা এবং ফইল্যাতলী থেকে সাগরপাড় পর্যন্ত চলে টমটম কিংবা রেজিস্ট্রেশন ও পারমিটবিহীন গাড়িগুলো।
আলমাস সিনেমা-গরিবুল্লাহ শাহ মাজার-ফয়’স লেক-কর্নেল হাট সিডিএ পর্যন্ত ১১ নং রুট হলেও বস্তুত জিইসি থেকে এ কে খান মোড় পর্যন্ত চলে এ রুটের গাড়িগুলো। ফতেয়াবাদ হতে অঙিজেন মোড়- বায়েজিদ-২ নং গেট-প্রবর্তক মোড়-চট্টগ্রাম মেডিকেল গেট পর্যন্ত ১৫ নং রুট হলেও এটি মানা হয় না। এখানে অঙিজেন মোড় থেকে ফতেয়াবাদ এবং ২ নং গেট থেকে চকবাজার পর্যন্ত ভাগ হয়ে কিছু টেম্পো ও ম্যাঙ্মিা চলে। অন্যদিকে টাইগারপাস থেকে নিউ মার্কেট- ফিরিঙ্গিবাজার মেরিনার সড়ক হয়ে নতুন ব্রিজ পর্যন্ত ১৭ রুট হলেও এখানে নিউ মার্কেট থেকে নতুন ব্রিজ পর্যন্ত চলে এ রুটের ম্যাঙ্মিাগুলো।
চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের অতিরিক্ত মহাসচিব গোলাম রসুল বাবুল দৈনিক আজাদীকে বলেন, নগরীতে পারমিটবিহীন অনেক বাস-মিনিবাস রয়েছে। তারা কেউ রুট মানে না। আবার পারমিট নেওয়া অনেক গাড়িও রুট মানে না। নগরীতে ডকুমেন্টবিহীন অসংখ্য ম্যাঙ্মিা, পুরনো টেম্পো, টুকটুকি ও ভটভটি রয়েছে। এসব গাড়ি জনবহুল স্টপেজগুলোতে জট তৈরি করে। দ্রুতযান সার্ভিসের বাসগুলো বায়েজিদ, ২ নং গেট হয়ে নিউ মার্কেট যাওয়ার কথা। কিন্তু তারা মুরাদপুরে স্ট্যান্ড করে ফেলেছে। তাছাড়া বেশ কয়েকটি পয়েন্টে অবৈধ স্ট্যান্ড রয়েছে। সবই ট্রাফিক পুলিশের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) হারুন উর রশিদ হাযারী দৈনিক আজাদীকে বলেন, আইন না মানার সংস্কৃৃতির কারণে গণপরিবহনগুলোকে শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না। যানজট কমানোর জন্য জনবহুল মোড়গুলো থেকে দূরবর্তী স্থানে ‘বাস থামিবে’ সাইনবোর্ড দিয়ে বাস থামানোর স্থান করে দেওয়া হলেও চালকেরা মানছে না। ট্রাফিক আইন না মানার কারণে আমরা প্রতিনিয়ত অনেক গাড়িকে মামলা দিই।
তিনি জানান, সচেতনতার জন্য চালক-হেলপারদের প্রতি মাসে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে গাড়ির চালক, মালিক, যাত্রী, পথচারীরা সচেতন হলে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে।

x