নগর দারিদ্র্য দূর করতে উন্নয়নের স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করুন

বুধবার , ২৬ জুন, ২০১৯ at ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ
22

দেশে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে নগর দারিদ্র্যও। এ নগর দরিদ্ররা অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সহিংসতাসহ নানা ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এদের বোঝা হিসেবে মনে করার কোন সুযোগ নেই। এলজিইডি ভবনের সম্মেলন কক্ষে সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘অ্যাড্রেসিং পভার্টি : হোয়াট ওয়ার্কস, হোয়াট ডাজনট’ শীর্ষক পরামর্শ সভার আলোচনায় একথা উঠে আসে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত সভায় বিভিন্ন এনজিওর কর্মী ও সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে নগরায়ন খুব দ্রুত হচ্ছে। একই সঙ্গে নগর দারিদ্র্যও বাড়ছে। এটি নগরায়ণের অন্যতম একটি দিক। নগর দরিদ্রদের বোঝা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এসডিজিতে কাউকে ফেলে না রাখার একটি দর্শন রয়েছে। তিনি বলেন, নগর দারিদ্র্যের অন্যতম একটি সমস্যা হলো স্বাস্থ্য এর বড় শিকার হচ্ছে দরিদ্ররা। তাদের আয় বেশি। কিন্তু এর বিশাল অংশ চলে যাচ্ছে স্বাস্থ্যখাতে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সেন্টার ফর আর্বান স্টাডিজের কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম নাজিম বলেন, আবাসিক ভাড়া দিয়ে থাকলে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু বস্তি এলাকায় এটি পাওয়া যায় না। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে ঠিক। কিন্তু নগর দারিদ্র্য মোকাবেলা করা ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টরা এখনও ব্যাপকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আসে নি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে দেশে নগরায়ন হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গ্রামীণ উন্নয়ন তথা অবকাঠামোগত ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার পরও উন্নত জীবনযাপন, বেশি আয়ের আশা, গ্রামের নদী ভাঙন ইত্যাদি কারণে মানুষ শহরমুখী হচ্ছেন। এছাড়া অপুষ্টি, জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং ভৌগোলিক কারণে সৃষ্ট দারিদ্র্যের ফলে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের চাপ বাড়ছে। ফলে নগর বা শহরগুলোয় অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। শহরে দরিদ্রদের জীবন মান অনেক নিচে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নগর দারিদ্র্য একটি নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এটি উন্নয়নের সমস্যা। গ্রামে যে উন্নয়ন হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। গ্রামেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কেউ কেউ তাতে সন্তুষ্ট নয়। বিপদগ্রস্ত মানুষ ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো নগরে আসছে। এখন গ্রামেও কৃষি-শ্রমিক তেমন আর পাওয়া যায় না। তারা বেশি আয়ের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো নগর ও শহরগুলোতে চলে আসেন। তাদের কাছে কষ্টের বস্তিজীবন আয়ের বিবেচনায় সহনীয়। গ্রামের তুলনায় ঢাকা-চট্টগ্রামে গরিব আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা সংকুচিত। তারপরও মানুষ আসছে। পরিকল্পিত নগরায়নের অভাবে দেশের বেশিরভাগ বিনিয়োগ, উন্নয়ন উদ্যোগ, সেবা প্রতিষ্ঠান নগরকেন্দ্রিক হওয়ায় কর্মসংস্থানও শহরকেন্দ্রিক। এ কারণে বাস্তুহারা মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে শহর ও শহরতলিতে অমানবিক অবস্থায় বিভিন্নভাবে বস্তি, ঝুপড়িও খোলা আকাশের নিচে বসবাস করে। তাদের খাদ্যের নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উপযুক্ত কর্মসংস্থান পয়োনিষ্কাশন, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন জৈবিক ও মানবিক বিষয়গুলো খুবই অস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আয় বৈষম্য। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনে প্রবৃদ্ধির কার্যকারিতা কমছে। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে উৎপাদনশীল খাতে জোর দেওয়ার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধিকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। এছাড়া শিল্প ও সেবাখাতে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, টেকসই কৃষি উন্নয়ন, আয় বৈষম্য কমিয়ে আনা, জমির পুনর্বণ্টন, খাসজমি বরাদ্দে পরিবর্তন আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নগর দরিদ্রদের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তকরণে জোর দিতে হবে।
দরিদ্রদের বঞ্চিত করে নগরায়ন সম্ভব নয়। নগরকে চলমান রাখতে তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদেরও রয়েছে নগর ও নাগরিক সুবিধার অধিকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধা। থাইল্যান্ডে নগর দরিদ্রদের গৃহায়নের জন্য বিশেষ তহবিল রয়েছে। ভারতের আহমেদাবাদসহ বিভিন্ন শহর এবং ও শ্রীলঙ্কায় ও মালয়েশিয়ায় লক্ষ লোকের আবাসনের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ভারতের পরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ১৩ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রামের দারিদ্র্য কমে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে, কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাদ দিয়ে মধ্যম আয়ের দেশ বা এসডিজি সম্ভব নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে গার্মেন্ট, অনানুষ্ঠানিক খাত, পরিবহন শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের দারিদ্র্য কমাতে চাইলে তাদের উন্নয়নের স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রশংসিত হচ্ছে সর্বত্র। তবে এ কথাও সত্য, উন্নয়নের এ দুর্বার অগ্রগতির মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যে নিপতিত রয়েছে। বিশেষ করে দেশের দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে এখনও দারিদ্র্যের হার বেশি। এছাড়া নগর দারিদ্র্যও সেভাবে কমে আসে নি। নগর দারিদ্ররা বহুবিধ অবহেলা-অবজ্ঞা, বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। কিন্তু নগর নির্মাণ, নগরের সৌন্দর্যবর্ধন ও সুরক্ষা এবং নগর পরিচ্ছন্নতায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। গৃহ কর্মসহ নগরবাসীর বিভিন্ন সেবা প্রদান ও পরিচর্যায় তারা বড় ধরনের অবদান রেখে চলেছে। এছাড়া গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ছোট-বড় কল-কারখানা ও অন্যান্য উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে বড় সংখ্যক নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠী সরাসরি যুক্ত। নগরে যে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়াচ্ছে তারা নতুন। আগে যারা এসেছেন তারা কিন্তু দরিদ্র বা অতি দরিদ্র নয়। এর সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে চাপ তাও দুই মহানগরীকে চাপের মুখে রাখছে। নগর দারিদ্র দূর করতে হলে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ, জাতীয় নীতিমালা এবং শাসন পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিকেন্দ্রীকরণ।

x