নগর উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণসহ ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান

সংসদে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল পাস

হাসান আকবর

বুধবার , ১১ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ
619

চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রয়োজনীয় সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং চারজন যুগ্ম সচিবকে পদায়নসহ বিভিন্নমুখী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বহুল প্রত্যাশিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বিল২০১৮ গতকাল সংসদে পাশ হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প ও মহাপরিকল্পনাসহ ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে পাশ হওয়া এই বিলে একজনকে চেয়ারম্যান করে ১৩ সদস্যের কর্তৃপক্ষ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সংসদে বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়ার সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বিলটি পাসের আগে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

বিলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সরকার মনোনীত চারজন বোর্ড সদস্যের মধ্যে একজন মহিলা এবং একজন আর্কিটেক্ট বা প্ল্যানার থাকাকেও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সিডিএর আইন ইংরেজির পরিবর্তে বাংলায় করা হয়েছে। এখন থেকে সিডিএ চট্টগ্রাম মহানগরীর অভ্যন্তরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন, উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন এবং সৌন্দর্য বর্ধনসহ সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে পারবে। বিলটি পাশ হওয়ার পর সিডিএর কার্যপরিধি বহুগুনে বৃদ্ধি পাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। সিডিএর পদস্থ একজন কর্মকর্তা গতকাল বিলটি পাশ হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সিডিএ পরিচালিত হচ্ছিল বহু বছরের পুরানো আইনে। সিডিএ এ্যাক্ট’ প্রনীত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে। পাকিস্তান আমলে প্রনীত এই আইনে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে বহু সীমাবদ্ধতা ছিল। পুরোপুরি ইংরেজিতে প্রনীত ওই আইনটি বর্তমানের বহু কিছুর সাথে অচল। বর্তমানে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসলেও সিডিএর পুরানো আইন দিয়ে তা যথাযথভাবে রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠেছিল। কার্য পরিধি এবং জরিমানাসহ বহু বিষয়ে বর্তমানের সাথে তাল মিলাতে সিডিএকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। এ অবস্থায় মন্ত্রনালয় থেকে সিডিএ এ্যাক্ট সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয় বছর তিনেক আগে। আইনটি সংশোধনের প্রথম ধাপেই ইংরেজির পরিবর্তে পুরো আইনটিকে বাংলায় করা হয়। আইনটি বাংলায় করতে গিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগোপযোগী নানা সংযোজন ঘটানো হয়েছে।

সিডিএ এ্যাক্ট অনুযায়ী সিডিএ পরিচালিত হয় একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন ১১ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ড দ্বারা। এরমধ্যে চারজন সরকার মনোনীত এবং বাকি সাতজনের মধ্যে দুইজন সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধি, একজন করে জেলা প্রশাসন, বন্দর, রেলওয়ে, ওয়াসা, চট্টগ্রাম চেম্বার প্রতিনিধি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত এগার জনের মধ্যে সরকার মনোনীত চারজন পরিচালকই পুরোপুরি রাজনৈতিক নিয়োগ। যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সিডিএর বোর্ড সদস্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোন ধরনের যোগ্যতা ছাড়া শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় একজন নেতাকে সরকার সিডিএর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য মনোনীত করেন। নয়া আইনে পুরানো আইন সংশোধন করে বোর্ড সদস্য হিসেবে সরকারের মনোনয়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় চারজন সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে এখন অবশ্যই এদের একজন মহিলা হতে হবে এবং অপরজনকে আর্কিটেক্ট কিংবা প্ল্যানার হতে হবে। এই শর্তটি জুড়ে দেয়ার ফলে সিডিএ বোর্ডের মান বাড়বে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।

অপরদিকে উক্ত এগারজন সদস্যের পাশাপাশি সরকার আরো চারজন যুগ্ম সচিবকে উক্ত বোর্ডে নিয়োগ দেবেন। এই চারজন কর্মকর্তা সার্বক্ষনিকভাবে সিডিএর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এদের মধ্যে একজন মেম্বার (প্ল্যানিং), একজন মেম্বার (ইঞ্জিনিয়ারিং), একজন মেম্বার (এডমিন) এবং একজন মেম্বার (ল্যান্ড এন্ড বিল্ডিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই চারজন কর্মকর্তাও সিডিএর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহন থেকে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সিডিএ আইন অনুযায়ী উন্নয়ন কর্মকান্ডের ধরন এবং পরিধির সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপটের অমিল স্পষ্ট। এই অবস্থায় সিডিএ এখন থেকে শিক্ষা খাতের জন্য স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্য খাতের প্রয়োজনীয় হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ, বিনোদনের জন্য যে কোন ধরনের ট্যুরিস্ট স্পর্ট গড়ে তোলা, পানি নিষ্কাশনের জন্য যে কোন ধরনের খাল খনন, ব্রিজ নির্মাণসহ বিভিন্ন ধরনের বড় অকাঠামোগত নির্মাণ কার্যক্রম চালাতে পারবে। চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রয়োজনে যে কোন ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করতে সিডিএ’র কোন বাধা থাকবে না। নয়া আইনে সিডিএকে সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।

সিডিএর নয়া আইনে চেয়ারম্যানসদস্য বা কোনো কর্মকর্তাকর্মচারী কোনো পদে বহাল থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য করলে শাস্তি হবে অনধিক দু’বছর কারাদন্ড অথবা অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড। নয়া আইনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘কর্তৃপক্ষ স্থাপিত সীমানা প্রাচীর, দেয়াল, খুঁটি ইত্যাদি অপসারণ করলে ২শ টাকা থেকে অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা।’ এছাড়া স্থাপনার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর নোটিশ দিয়েও দেয়াল বা দালানের অপসারণ না করলে শাস্তি হবে। পাকা দেয়ালের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা ও পাকা নয় এমন দেয়ালের জন্য ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।

আর মাস্টার প্ল্যান ভায়োলেট করে কোনো জমি ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। আগের আইনে প্রথম দিন অনূর্ধ্ব এক হাজার টাকা ও প্রতিদিন ৫০ টাকা করে জরিমানার বিধান ছিল। গতকাল সিডিএর নয়া এই আইন জাতীয় সংসদে পাশ হওয়ার ব্যাপারে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিডিএ এ্যাক্ট পাশ হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, নয়া আইনে বহু পজেটিভ পরিবর্তন এসেছে। নয়া এই আইন কার্যকর করে সিডিএ চট্টগ্রাম মহানগরীর উন্নয়নে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

x