নগরে জলাবদ্ধতা : নাগরিক মনে ক্ষোভ আতঙ্ক আর হতাশা

বুধবার , ১০ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
136

দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামেও টানা কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন নগরীর বেশিরভাগ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা- খালভরাট, বেদখলের কারণে চলতি বছরে অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভোগান্তি পোহাতে হবে। তবে পরিস্থিতি উন্নয়নে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন না কর্তৃপক্ষের কেউ।
চট্টগ্রামে বৃষ্টি মানেই এখন জলাবদ্ধতা। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা, যেখানে বছরের পর বছর ধরে অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ যেমন রয়েছে, তেমনি আতঙ্ক আর হতাশাও কাজ করছে। এ বছর শহরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। মাত্র দুদিনের বৃষ্টিতে অবস্থা ভয়াবহ। দৈনিক আজাদীতে গতকাল প্রধান শিরোনাম হয় ‘শঅর ডুবি গেইয়্যে’।
বর্ষাকাল ছাড়াও বৃষ্টি এলেই চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে এই ভেবে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে তাদের পড়তে হবে। সবার মনে একটাই ভাবনা -শহরের জলাবদ্ধতার সমস্যা যত দ্রুত সম্ভব দূর করা উচিত, তবে এটি কীভাবে হবে তা তারা জানেন না। অনেকের মতে, বন্দরনগরী হিসেবে এই সমস্যাটাকে যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত ছিল সেভাবে করা হয়নি এবং এখনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আমদানি-রপ্তানির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাদের মতে চট্টগ্রাম শহরে এমন জলজটের পরিস্থিতি দেশের বাইরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেহেতু এখানে বন্দরে বহু পণ্য আনা-নেওয়ার বিষয় থাকে ফলে জলাবদ্ধতার বিষয়টি এ ক্ষেত্রেও এক ধরনের সমস্যা তৈরি করে।
এই জলাবদ্ধতার দায়টা কার? এই প্রশ্নটা ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষার জন্য মানুষ কার কাছে যাবে! আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কিংবা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ– কেউ দায় নিতে চায় না। বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় গত হলেও এই প্রকল্পের কোনো সুফল দৃশ্যমান হয়নি। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নগরীর খালগুলো থেকে মাটি তোলার কাজ শেষ করা যায়নি। দখলদারদের উচ্ছেদ করার কার্যক্রম চলছে। আগামী বছর সুফল পাওয়া যাবে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা বলেন, ‘জলাবদ্ধতা শুধু বৃষ্টির জন্য হয় না। এখানে বৃষ্টি ছাড়াও জোয়ারের কারণে জলাবদ্ধতা হয়। গত সপ্তাহে বৃষ্টি হয় নি, তবু খাতুনগঞ্জ এবং আগ্রাবাদ এলাকায় পানি ওঠার খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি। কাজেই এ জলাবদ্ধতা সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সিডিএ যে প্রজেক্টটা বাস্তবায়ন করছে সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। প্রজেক্টের আওতায় স্লুইস গেইটগুলো নির্মাণ না হলে কিন্তু পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না। সেটুকু সময় অপেক্ষা করতে হবে।’
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নগরীর নালা পরিষ্কারের দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের। সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নালা পরিষ্কার করে থাকে। কিন্তু নগরীর সব নালা ভরাট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরের উন্নয়নে নিয়োজিত সরকারি সংস্থা বিশেষ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসনের মধ্যে আমরা সমন্বয় দেখি না। সমন্বয় না থাকায় তারা জলমগ্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে নিজেরা দোষ এড়ানোতেই বেশি ব্যস্ত। দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই বলছেন, মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হলে এই দুর্ভোগ কমবে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা জলাবদ্ধতার কারণ উল্লেখ করে বলেন, পানি নিষ্কাশনের দুটি পথ রয়েছে। প্রথমত ভূ-গর্ভে পানি শোষণ করে নেওয়া এবং অন্যটি খাল বিল ও ড্রেন দিয়ে নদীতে চলে যাওয়া। এখানে এই দুটি পথের একটিও কার্যকর নেই। যে কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পিত উপায়ে খাল উদ্ধার করতে হবে, নালা পরিষ্কার রাখতে হবে। যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা নাগরিক দায়িত্ব। তাহলে নালা নর্দমা পরিচ্ছন্ন থাকে। এক্ষেত্রে নাগরিকদের দায়ও রয়েছে।

x