নগরীর ৮ সরকারি কলেজে আসনের ১০ গুণ আবেদন

একাদশে ভর্তি

রতন বড়ুয়া

শনিবার , ১৮ মে, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
676

একাদশ শ্রেণি ভর্তিতে আবেদনের সময়সীমা শেষ হয়নি এখনো। আগামী ২৩ মে পর্যন্ত সুযোগ রয়েছে আবেদনের। কিন্তু এরই মধ্যে (গতকাল ১৭ মে পর্যন্ত) মোট আসনের প্রায় ১০ গুণেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে নগরীর ৮ সরকারি কলেজে। কলেজগুলো হলো, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, হাজী মোহাম্মদ মহসিন সরকারি কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ, সরকারি কমার্স কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজ, বাকলিয়া সরকারি কলেজ ও চট্টগ্রাম মডেল স্কুল এন্ড কলেজ। প্রথম সারির কলেজ হিসেবে পরিচিত এসব কলেজের তিন শাখায় (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা) এবার মোট আসন সংখ্যা ৮ হাজার ৬৬০টি। কিন্তু গত ১২ মে থেকে শুরু হয়ে গতকাল পর্যন্ত এই ৮ কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন পড়েছে ৮৯ হাজার ৩১৬টি। যা মোট আসন সংখ্যার ১০ গুণেরও বেশি। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কলেজ শাখা সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। আর একই সময়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অনুমোদিত সবকয়টি কলেজে আবেদন পড়েছে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪৯টি। মোট ৮৯ হাজার ৫৬৫ জন শিক্ষার্থী অনলাইন ও মোবাইল এসএমএস-এর মাধ্যমে এসব আবেদন করেছে। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর জাহেদুল হক আজাদীকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
শিক্ষাবোর্ডের তথ্য মতে, মোট আবেদনের মধ্যে ৪ লাখ ৭০ হাজার ৮৭টি আবেদন পড়েছে অনলাইনে (ওয়েবসাইটে)। অনলাইনে আবেদনকারীর সংখ্যা ৮১ হাজার ৮৪০ জন। আর মোবাইল এসএমএস-এর মাধ্যমে আবেদনকারীর সংখ্যা ৭ হাজার ৭৮০ জন। এসএমএস-এ মোট আবেদন পড়েছে ৮ হাজার ১৬২টি। আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মোট আবেদনের ৫ ভাগের এক ভাগ দখল করেছে মহানগরীর ৮ সরকারি কলেজ। অথচ, চট্টগ্রামে বোর্ড অনুমোদিত মোট কলেজের সংখ্যা ২৬৬টি।
এদিকে, এবার চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এসএসসি পাস করেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫১ জন। তবে গতকাল পর্যন্ত কলেজ ভর্তিতে আবেদন করেছে ৮৯ হাজার ৫৬৫ জন। সে হিসেবে চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীন এসএসসি উত্তীর্ণ আরো ২৭ হাজার ২৮৬ জন শিক্ষার্থী এখনো আবেদন করেনি। যদিও মাদ্রাসা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনেক শিক্ষার্থীও কলেজ ভর্তিতে আবেদন করেছে বলে বোর্ড সূত্র জানিয়েছে।
শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নগরীর সরকারি কলেজগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে বিজ্ঞানে আসন রয়েছে ৬০০টি। আর মানবিকে ৩৫০টি। সবমিলিয়ে কলেজটির ৮৫০ আসনের বিপরীতে ১৭ মে (গতকাল) পর্যন্ত আবেদন পড়েছে ১৩ হাজার ৮৪৮টি। যা মোট আসনের তুলনায় ১৬ গুণেরও বেশি। হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি কলেজে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ৬৫০টি। এর মধ্যে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৬০০ করে এবং মানবিকে ৪৫০টি আসন রয়েছে। কলেজটির তিন বিভাগে গতকাল পর্যন্ত আবেদন পড়েছে ১৭ হাজার ৪২৯টি। যা মোট আসনের ১০ গুণেরও বেশি। সরকারি সিটি কলেজে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ৯৬৫টি। এর মধ্যে বিজ্ঞানে ৫৮৫, ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৭৩০ এবং মানবিকে ৬৫০টি আসন রয়েছে। কিন্তু কলেজটির ১ হাজার ৯৬৫ আসনের বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত আবেদন পড়েছে ২৩ হাজার ৪১৬টি। চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের তিন শাখায় মোট আসন রয়েছে ১ হাজার ২৫০টি। এর মধ্যে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৪৫০টি করে এবং মানবিকে ৩৫০টি আসন রয়েছে। কলেজের ১ হাজার ২৫০ আসনের বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত আবেদন পড়েছে ১০ হাজার ৩৫১টি। সরকারি কমার্স কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা শাখার ৮৫০ আসনের বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত আবেদন পড়েছে ১ হাজার ৮০৭টি। বাকলিয়া সরকারি কলেজে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ৬০টি। এর মধ্যে বিজ্ঞানে ৩০০, ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৫১০ এবং মানবিকে ২৫০টি আসন রয়েছে। কলেজটির ১ হাজার ৬০টি আসনের বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত আবেদন পড়েছে ১২ হাজার ৫৬২টি। কলজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজের বিজ্ঞান এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৮০টি করে মোট ১৬০টি আসন রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত কলেজটিতে আবেদন করেছে ৫ হাজার ১৯৬টি। আর ২০১৭ সালের শেষ দিকে সরকারি হওয়া চট্টগ্রাম মডেল স্কুল এন্ড কলেজে মোট আসন রয়েছে ৭৭৫টি। এর মধ্যে বিজ্ঞানে ৩৭৫, ব্যবসায় শিক্ষায় ২৫০ ও মানবিকে ১৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ রয়েছে। মোট ৭৭৫টি আসনের বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত কলেজটিতে আবেদন পড়েছে ৪ হাজার ৭০৭টি। অবশ্য, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালের শেষ দিকে সরকারি হলেও এখনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা।
প্রথম সারির কলেজগুলিতে আবেদনের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি স্বীকার করে কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর জাহেদুল হক বলেন, এর কারণ হচ্ছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তরা তো রয়েছেই, বলতে গেলে মেধাবী সব শিক্ষার্থী এ কলেজগুলিতে ভর্তি হতে চায়। যার ফলে কলেজগুলিতে আবেদনের সংখ্যা বেশি। তবে এসব কলেজে আসনের বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ নেই। তাই অনেক শিক্ষার্থীকে হতাশ হয়ে অন্য কলেজে ভর্তি হতে হবে।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কলেজ শাখার তথ্য মতে, বোর্ড অনুমোদিত মোট ২৬৬টি কলেজে (সরকারি-বেসরকারি) এবার শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কলেজের সংখ্যা ২২টি। আর বাকি ২৪৪টি বেসরকারি (এমপিওভুক্ত, সিটি করপোরেশন অধিভুক্ত ও এমপিও বর্হিভুক্ত)। এর মধ্যে মহানগরে সিটি করপোরেশনের পরিচালনাধীন কলেজ রয়েছে ২২টি। এছাড়া বোর্ডের অধীন আরো ৩০টি কলেজ সম্প্রতি জাতীয়করণ করা হয়েছে। তবে এসব কলেজে এখনো সরকারি সুবিধা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। সব মিলিয়ে এসব কলেজে মোট আসন সংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫টি। এর মধ্যে বিজ্ঞানে ৩২ হাজার ৮৬৫, মানবিকে ৫৬ হাজার ৮৫৮ এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৫৬ হাজার ৩৭২টি আসন রয়েছে।
আর চট্টগ্রাম মহানগরে অনুমোদিত কলেজের সংখ্যা প্রায় ৮৫টি। এর মধ্যে সরকারি ৮টি ও সিটি করপোরেশনের অধীন ২২টি ছাড়া বাকি ৫৫টি কলেজ বেসরকারি (এমপিওভুক্ত ও এমপিওবিহীন)। মহানগরের এসব কলেজে মোট আসন রয়েছে ৪৮ হাজার ৬৬২টি। এর মধ্যে বিজ্ঞানে ১৬ হাজার ৩৫টি, ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ২১ হাজার ২৩টি এবং মানবিকে ১১ হাজার ৬০৪টি আসন রয়েছে।
এদিকে, গতবারের তুলনায় বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করেছে এবার। এসএসসিতে গতবার মোট পাস করে ১ লাখ ২ হাজার ৩৭ জন। তবে এবার পাস করেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫১ জন। হিসেবে গতবারের তুলনায় ১৪ হাজার ৮১৪ জন বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে এবার। গতবারের তুলনায় বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করলেও সামগ্রিকভাবে আসন সংকট হবে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর জাহেদুল হক। তিনি বলেন, বোর্ড অনুমোদিত চট্টগ্রামে ২৬০টির বেশি কলেজ রয়েছে। এবার নতুন করে আরো ৬টি কলেজে পাঠদান চালু হচ্ছে। সবমিলিয়ে বোর্ডের অধীন কলেজগুলোতে আসন সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। আর এবার এসএসসি পাস করেছে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫১ জন। যা মোট আসন সংখ্যার তুলনায় কম। তবে মাদ্রাসা ও কারিগরির অনেক শিক্ষার্থী প্রতি বছর কলেজে ভর্তি হয়। এরপরও সামগ্রিকভাবে আসন সংকট হবে না। সব শিক্ষার্থীই কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবে।
পছন্দক্রম ও কলেজ পরিবর্তনের সুযোগ : সাবমিট করা আবেদনে পছন্দক্রম ও কলেজ পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে এবার। তবে অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রেই এ সুবিধা তুলনামূলক বেশি। যা এসএমএস-এর মাধ্যমে করা আবেদনে পাওয়া যাবে না। অনলাইনে (ওয়েবসাইটে) আবেদনকারীরা ৫ জুন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫ বার পছন্দক্রম ও কলেজ পরিবর্তনের সুযোগ পাবে। কিন্তু পছন্দক্রম পরিবর্তনের সুযোগ পেলেও কলেজ পরিবর্তনের সুযোগ পাবে না এসএমএস-এর মাধ্যমে আবেদনকারীরা। কলেজ ও পছন্দক্রম পরিবর্তনের সুযোগ থাকায় খরচসহ যাবতীয় বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এ সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম। ইতোমধ্যে আবেদন করলেও তালিকা থেকে কলেজ বাদ দেওয়া এবং নতুন করে যোগ করার যে সুযোগ আছে, সব দিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীরা তা কাজে লাগাতে পারে বলেও মন্তব্য করেন বোর্ড চেয়ারম্যান।
ভুল সংশোধনের সুযোগ : আবেদনে কোনো ধরনের ভুল সংঘটিত হলে তা সংশোধনের সুযোগ রাখা হয়েছে এবার। আবেদনে ভুল হলে কিংবা শিক্ষার্থীর অজান্তে অন্য কেউ আবেদন করে দিলে শিক্ষাবোর্ডে আবেদনের মাধ্যমে এর প্রতিকার চাইতে পারবে শিক্ষার্থীরা। আগামী ২৬ মে পর্যন্ত এ সংক্রান্ত আবেদন করা যাবে শিক্ষাবোর্ডে। আবেদনের ভিত্তিতে ভুল সংশোধন অথবা ভুয়া আবেদন বাতিল করবে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর জাহেদুল হক আজাদীকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে ভুল সংশোধন বা ভুয়া আবেদন বাতিলের জন্য ২৩ মে’র আগে শিক্ষাবোর্ডের কলেজ শাখায় যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
আবেদনের ক্ষেত্রে কলেজের পড়ালেখার মান-পরিবেশ, বাসা থেকে দূরত্ব এবং মাসিক বেতনসহ যাবতীয় খরচের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে কলেজের পছন্দক্রম ঠিক করার পরামর্শ দিয়ে দোকানের কম্পিউটার অপাটেরদের ইচ্ছে অনুযায়ী কলেজের পছন্দক্রম না দিতেও শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রফেসর জাহেদুল হক। এছাড়াও কোটার স্বপক্ষে যথাযথ কাগজপত্র থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলেই কেবল কোটায় আবেদন করার পরামর্শ দিয়ে কলেজ পরিদর্শক বলেন, দেখা গেলো, কেউ একজন কোটায় আবেদন করেছে। আবেদন করায় কোটায় ভর্তির জন্য ওই শিক্ষার্থী মনোনীত হলেও যথাযথ কাগজপত্র দেখাতে না পারলে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তি করাবে না। এতে করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভর্তি ঘিরে সংশয় দেখা দিবে। তাই আবেদনের ক্ষেত্রে যাবতীয় বিষয় যাচাই-বাছাই করে তবেই আবেদন করতে হবে।
পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনকারীদের আবেদন : পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদনকারীদেরও একই সময়ের (২৩ মে) মধ্যে আবেদন করতে হবে। তবে পুনঃনিরীক্ষায় ফল পরিবর্তন হলে সেক্ষেত্রে ৩ ও ৪ জুন পুনরায় আবেদন করার সুযোগ পাবে ফল পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীরা। আগামী ১ জুন পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান। আর পুনঃনিরীক্ষণে ফল পরিবর্তন হলে পরিবর্তিত ফলাফল স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটিক) ভাবে ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য ভাণ্ডারে হালনাগাদ (আপডেট) হয়ে যাবে বলেও জানিয়েছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।
মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ ও নিশ্চায়ন : আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিতদের ফল প্রকাশ করা হবে ১০ জুন। প্রথম পর্যায়ে মনোনীত শিক্ষার্থীদের নিশ্চায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে ১১ জুন থেকে ১৮ জুনের মধ্যে। নিশ্চায়ন না করলে ওই শিক্ষার্থীর মনোনয়ন এবং আবেদন বাতিল বলে গণ্য হবে।

x