নগরীর যত্রতত্র বাজার

বাড়ছে জনদুভোর্গ, বিলুপ্ত হচ্ছে ঐতিহ্য, চাঁদা আদায় নিয়ে হয় সংঘর্ষ, চসিক হারাচ্ছে রাজস্ব

মোরশেদ তালুকদার

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
639

বাসা থেকে বেরুলেই গলির মোড়ে দেখা মিলে ভ্যানগাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সবজি বিক্রেতার। গলি পেরিয়ে মূল সড়কে আসবেন, সেখানেও একই চিত্র। পুরো রাস্তার এক পাশ দখলে নিয়ে বসানো হয়েছে বাজার।
কথাগুলো বলছিলেন মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা মো. বখতেয়ার আলম। সরেজমিন গিয়েও তার এ কথার সত্যতা মিলেছে। মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন জায়গায় বাজার বসতে দেখা গেছে গতকাল সন্ধ্যায়।
শুধু মুরাদপুর নয়, নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে শতাধিকেরও বেশি জায়গায় দেখা গেছে এমন চিত্র। অর্থাৎ সড়ক দখলে নিয়ে যত্রতত্র বসানো হয়েছে বাজার। এর মধ্যে অন্তত ৫০টি জায়গায় প্রায় স্থায়ী রূপ নিয়েছে বাজারগুলো। যত্রতত্র অবৈধ বাজার গড়ে ওঠায় ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটো দিকই আছে। ইতিবাচক বলতে কেবল চলার পথেই প্রয়োজনীয় সবজি কিনতে পারছেন ক্রেতা। ফলে থাকছে না নির্দিষ্ট বাজারে যাওয়ার ঝামেলা।
এর বিপরীতে নেতিবাচক দিকই বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, সাপ্তাহিক বাজারের যে ঐতিহ্য ছিল সেটা এখন বিলুপ্ত হচ্ছে। তাছাড়া রাস্তায় বাজার বসায় সংকীর্ণ হচ্ছে সড়ক। এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে যানবাহন চলাচলে। যার কারণে বাড়ছে যানজট। আবার বাজার করতে আসা লোকজনও দুর্ঘটনাজনিত ঝুঁকিতে পড়ছেন। এছাড়া যেখানে-সেখানে বাজার গড়ে ওঠা এসব বাজার শহরকে অপরিচ্ছন্ন করতেও রাখছে ভূমিকা। আবার এসব বাজারকে ঘিরে বাড়ছে অপরাধও। অভিযোগ আছে, স্থানীয় প্রভাবশালীরাই এসব বাজার বসার নেপথ্যে থাকেন। এক্ষেত্রে দৈনিক নির্ধারিত হারে চাঁদা আদায় করেন সেই প্রভাবশালী মহল। বিভিন্ন সময়ে চাঁদা আদায়কে ঘিরে সংঘর্ষেও জড়ান তারা। সর্বশেষ গত বুধবারও ইপিজেড থানার স্টিল মিল বাজারে সংঘর্ষ হয়েছে। ফলে বাড়ছে নগরবাসীর দুর্ভোগ। এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শহরে চসিকের অনুমোদিত বাজার আছে মাত্র ১৮টি। এ সুবাদে একটি চক্র নগরের যত্রতত্র অবৈধ বাজারগুলো বসিয়েছে। এসব বাজারের কারণে রাজস্ব হারাচ্ছে সংস্থাটি। কিন্তু সড়ক ও ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চসিক অবৈধ বাজারগুলো উচ্ছেদে উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে গত রমজান মাসে ৩৭টি অবৈধ কাঁচাবাজারের একটি তালিকাও করা হয়েছে।
চসিকের অনুমোদিত বাজারগুলো হচ্ছে, কাজীরহাট, চকবাজার, বলিরহাট, বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার, পাহাড়তলী কাঁচাবাজার, ফকিরহাট, বক্সিরহাট, হাজী আবদুল আলী আর্কেড বাজার, বিবিরহাট কাঁচাবাজার, দেওয়ানহাট বাজার, আবদুল মাবুদ সওদাগর বাজার, কমল মহাজনহাট ও হামিদউল্লাহ খান বাজার, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কর্নেল হাট, আনন্দবাজার, ফইল্যাতলী, ফিরিঙ্গিবাজার ও বিবিরহাট কাঁচাবাজার।
নগরীর অবৈধ বাজারগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা দৈনিক আজাদীকে বলেন, কিছু জায়গায় ভ্রাম্যমাণ বাজার বসে। ভ্যান নিয়ে আসে বিক্রেতারা, আবার পরে চলে যায়। কিছু জায়গায় স্থায়ীভাবেই বসেছে। এক্ষেত্রে যেখানে পর্যাপ্ত জায়গা আছে সেখানে জনসাধারণের সুবিধার্থে বৈধতা দেওয়া যায়। কিন্তু ফুটপাত বা রাস্তায় কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়া যাবে না। আবার কিছু জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বসে। যেমন সকালে জামালখান এলাকায় যে বাজার বসে নির্দিষ্ট সময় পর বিক্রেতারা চলে যায়। তবে যেসব অবৈধ বাজার রয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। এক্ষেত্রে উচ্ছেদ করে আসার দুই-একদিন পর তারা আবার বসে যায়।
এ প্রসঙ্গে চসিকের বাজার মূল্য পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও রামপুর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এস এম এরশাদুল্লাহ দৈনিক আজাদীকে বলেন, অবৈধ বাজার উচ্ছেদের বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত আছে। প্রায় সময় আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটগণ গিয়ে অবৈধ বাজারগুলো উচ্ছেদ করে থাকেন। আবার কাউন্সিলরগণও তদারকি করেন, যাতে অবৈধ বাজার বসতে না পারে। আসলে বিভিন্ন জায়গায় হয় কী, ভ্যানগাড়ি দাঁড়াতে দাঁড়াতে বাজারে পরিণত হয়। উচ্ছেদ করলে কয়েক দিন পর এসে আবার বসে যায়। জনগণ যতদিন সচেতন না হবেন ততদিন এসব বাজার বসাও বন্ধ হবে না। যেখান-সেখান থেকে কিনতে আমরা অভ্যস্থ হয়ে উঠছি বলে এসব বাজার বসার সুযোগ পাচ্ছে।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. শফিকুল মান্নান ছিদ্দিকী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ভাসমান বাজারগুলোই বেশি ক্ষতি করছে। যেখানে-সেখানে বসা এসব বাজারের কারণে সৌন্দর্যহানি বেশি ঘটছে। মোমিন রোড, জামালখান, স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় বাজারগুলোর কারণে সৃষ্ট বর্জ্য বেশি লক্ষ্য করা যায়। শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে এসব বাজার অবশ্যই উচ্ছেদ হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে গত তিন-চার দিন ধরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে যেসব অবৈধ বাজার দেখা গেছে সেগুলো হচ্ছে, কাটগড় রাস্তার পাশের বাজার, বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটির পাশের বাজার, স্টিল মিল রাস্তার পাশে বাজার, বেপারিপাড়া রাস্তার পাশের বাজার, আগ্রাবাদ এঙেস রোড বাজার, টিঅ্যান্ডটি কলোনির সম্মুখে বাজার, মাদারবাড়ি দারোগা হাট রোডের বাজার, সদরঘাট রোডস্থ সিটি কলেজের সম্মুখের বাজার, মেমন হাসপাতালের সামনের বাজার, সিরাজুদ্দৌলা রোডের বাজার, দেওয়ানহাট রেললাইন সংলগ্ন বাজার, চকবাজার ধুনির পুল হতে ফুলতলা পর্যন্ত বাজার, পুরাতন চান্দগাঁও থানার পিছনে পাঠাইন্যাগোদার বাজার, জামালখান রোডে সকালবেলায় বসানো বাজার, ডিসি হিল, অঙিজেন মোড়ের বাজার, দেওয়ানহাট ব্রিজ সংলগ্ন রাস্তার উপর বাজার, মিয়াখান নগর বৌবাজার, তুলাতলী জামাই বাজার, আতুরার ডিপো মোড়ের বাজার, ঈদগাঁ রাস্তার মোড়ের বাজার, ৩ নং ওয়ার্ড চালিতাতলী বাজার, রাজাখালী ব্রিজের দক্ষিণ পাশে সাজেদা সুপার মার্কেট বাজার, পাহাড়তলী ঝাউতলা বাজার, মুরাদপুর ১ নং রেললাইন সংলগ্ন বাজার, ৩ নং পাঁচলাইশ আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন বেলতলা বাজার, ১ নং ওয়ার্ডের হাটহাজারী, বালুছড়া, ফতেয়াবাদ ও আমান বাজার, ফইল্যাতলী বাজার সংলগ্ন বাজার, সিইপিজেড মোড়ের বাজার, বন্দরটিলা বাজার, আমিন জুট মিলস মসজিদের পাশের বাজার, পাহাড়তলী আকবর শাহ মাজার সংলগ্ন বাজার, মোহরা জানালী হাট সংলগ্ন বাজার, এ কে খান রোড বাজার (ফকির তালুক), বঙিরহাট বান্ডেল রোডের সামনের বাজার, কাটগড় বাজারের পশ্চিম পাশের মুসলিমাবাদ বাজার, মনসুরাবাদ, নয়াবাজার বিশ্ব রোড, হালিশহর এ ব্লকের গাউসিয়া মোড়, দিদার মার্কেটের পেছনে, ৪১ ওয়ার্ড নাজিরপাড়া বাজার এবং দেওয়ান বাজার মোড়ে রাস্তার উপরের বাজারটিও চসিকের অবৈধ বাজারের তালিকায় রয়েছে।
এসবের বাইরেও আরো অবৈধ বাজার থাকার অভিযোগ আছে। এর মধ্যে সিরাজুদ্দৌলা রোডস্থ সাবএরিয়া এলাকায় বাজারটির জন্য সেখানে প্রায় যানজট লেগে থাকে। একই সঙ্গে বাজারটি সাধারণ পথচারীদেরও দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে। মুরাদপুরের ১ নং রেলগেট এলাকায় বসা বাজারটির প্রায় রেললাইনেও চলে আসে। এতে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মোমিন রোডের কয়েক জায়গায়ও ভ্যানগাড়িতে করে ভাসমান বাজার বসে। যেগুলো সড়কটিতে যানজট সৃষ্টির জন্য দায়ী।

x