‘নগরীর ত্রাস’ হিসেবে ১৬ সন্ত্রাসী চিহ্নিত

সিএমপি’র তালিকা হালনাগাদ

আজাদী প্রতিবেদন

সোমবার , ১৫ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ
770

নগরজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে মাত্র ১৬ অপরাধী! সাম্প্রতিক সময়ে নগরীতে অপরাধের ধরন, কারণ এবং উৎস বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ এদের নির্দিষ্ট করেছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সিএমপিতে সন্ত্রাসীদের যে তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে তাতে ১৬ জনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যদিও এদের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। তবে যেকোনো মুহূর্তে জামিনে বেরিয়ে এসে তাদের আবারো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না পুলিশ কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে যেমন রাজনৈতিক সংগঠনভুক্তদের নাম আছে, তেমনি নাম আছে পেশাদার অপরাধীদেরও, যারা ‘ভাড়াটে’ হিসেবে নির্বাচনের আগে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে। নগরীর বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ বিষয়টি সম্পর্কে বলেন, আমরা সন্ত্রাসী তালিকার মধ্যে ‘নগরীর ত্রাস’ হিসেবে ১৬ জনকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছি।
এ প্রসঙ্গে নগরীর ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিউদ্দিন সেলিম আজাদীকে বলেন, আমরা দেখেছি টপ সিক্সটিন প্রায়শ নিজ নিজ এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসছে। কখনো তারা সরাসরি অংশ নেয়, কখনো আবার তার অনুসারীদের দিয়ে এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, আমার থানা এলাকায় ১৬ জনের একজন শিবির ক্যাডার সোহেল। দীর্ঘদিন চট্টগ্রামের বাইরে থেকে তার অনুসারীদের দিয়ে এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। এখন সংবাদ আছে, সে চট্টগ্রামে এসেছে। তার বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা আছে, যার মধ্যে ১২টি মামলাই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আমরা অভিযান চালাচ্ছি। আশা করি সে ধরা পড়বে।
আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) সদর দফতর থেকে সব থানার ওসিকে নির্বাচনের আগে সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করতে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি থানা ভিত্তিক সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরিরও কাজ চলছে।
সিএমপি সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে সিএমপির সন্ত্রাসী তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। সে তালিকানুযায়ী ৬৮ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ ৩৯৬ জন অপরাধীকে তালিকাভুক্ত করা হয়। এর আগে সিএমপিতে সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ হয় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আমলে এবং ২০০১ সালে বিএনপির আমলে। তবে ২০০৮ সালেও সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ হয়। সিএমপির সর্বশেষ তালিকায় মোট সন্ত্রাসী ছিল ৪০৬ জন। এর মধ্যে শীর্ষসন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত ছিল ৭৫ জন। তালিকানুযায়ী কোতোয়ালী থানায় ৫৫ জন, ডবলমুরিং থানায় ৪৩ জন, বাকলিয়া থানায় ২৫ জন, পাঁচলাইশ থানায় ৪৩ জন, খুলশী থানায় ২২ জন, পাহাড়তলী থানায় ২০ জন, বন্দর থানায় ৪৪ জন, হালিশহর থানায় ২৫ জন, কর্ণফুলী থানায় ১৮ জন, চান্দগাঁও থানায় ২৫ জন, পতেঙ্গা থানায় ৩১ জন এবং বায়েজিদ থানায় ৫৫ জন। তালিকাভুক্ত শীর্ষসন্ত্রাসীদের মধ্যে কয়েকজন ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে ক্রিমিনাল ডাটাবেইজ উদ্বোধন করেন তৎকালীন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী ডা. আফছারুল আমিন। তবে উদ্বোধন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল এর কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বেশিদূর এগোয়নি ডাটাবেজ তৈরির কাজ। একই কারণে সন্ত্রাসীদের তালিকা আর হালনাগাদও করা হয়নি। এর প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালে সন্ত্রাসীদের তালিকা করার জন্য নগরীর প্রতিটি থানায় চিঠি দেওয়া হলেও সে তালিকা আর তৈরি হয় নি। তবে এবার প্রকৃত অপরাধীরাই তালিকাভুক্ত হবে বলে আজাদীকে নিশ্চিত করেন সিএমপির কয়েকজন ওসি।
কোতোয়ালী থানার ওসি মোহম্মদ মহসিন জানান, সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা চলমান কার্যক্রমের একটি অংশ। আগের তালিকার যারা মারা গেছে বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে তাদের নাম বাদ দিয়ে বর্তমানে সক্রিয় অপরাধীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে এ তালিকা করা হচ্ছে। আলোচিত ১৬ জনের মধ্যে তাঁর থানা এলাকায় অমিত মুহুরীকে ত্রাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে ওসি কোতয়ালী বলেন, সে এখন জেলখানায় থাকলেও তার অনুসারীরা এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত। সে নিজেও যেকোনো সময় বের হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পাহাড়তলী থানার ওসি সদীপ কুমার দাশ বলেন, নগরীর প্রতিটি থানায় সন্ত্রাসীদের তালিকা রয়েছে। পুলিশ এদের দমনে সর্বদা তৎপর। তাঁর থানা এলাকায় ত্রাস হিসেবে তিনি কুইন্টাল রোজারিও’র নাম উল্লেখ করেন। সে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত উল্লেখ করে ওসি বলেন, পাহাড়তলীর শীর্ষ সন্ত্রাসী রহমতউল্লাহ চৌধুরী ডনের অনুসারী হিসেবে তাকে চিনতো মানুষ। এখন সে নিজেই মূর্তিমান আতংক।
সদরঘাট থানার ওসি নেজামউদ্দিন আজাদীকে জানান, নগরীর ১৬ ত্রাসের একজন হিসেবে তাঁর থানা এলাকায় রয়েছে কদমতলীতে হারুন মার্ডারের আসামি মো. আলমগীর। বয়স বেশি নয়; তবে ইতোমধ্যে ভাড়াটে কিলার হিসেবে সে নাম কুড়িয়েছে জানিয়ে ওসি সদরঘাট বলেন, হারুনকে গুলি করেছিল সে। ইতোমধ্যে এ মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে তার নাম বলেছে। সিসিটিভি ফুটেজেও তাকে চিহ্নিত করা গেছে গুলি বর্ষণকারী হিসেবে। এছাড়াও কয়েকদিন আগে সে ভাড়াটে কিলার হিসেবে পাঁচলাইশ এলাকায় আনোয়ারা জেলা পরিষদ সদস্য জাহাঙ্গীরকে হত্যার উদ্দেশ্যে এলোপাথাড়ি কুপিয়েছে। কদমতলীতে ব্রোকারদের সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এখন উঠে পড়ে লেগেছে। তার কাছে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলেও জানান ওসি নেজামউদ্দিন।

x