নকশি কথক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান

কাজী সাইফুল হক

শুক্রবার , ১৬ নভেম্বর, ২০১৮ at ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ
102

‘কিংবা এ-কালের বাঙালি লেখকরা ভাবছেন- হাসিটা ইনফেরিয়ার আর্ট? ওতে তাঁদের মর্যাদা নষ্ট হবে? কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ তো সে কথা ভাবেন নি।’
– নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
বাংলাভাষায় রম্যসাহিত্য (স্যাটায়ার) নামে যে ঋদ্ধ একটে সাহিত্য আছে, তা বর্তমানের বড় গাম্ভীর্য(!) লেখকরা এইটেকে পাত্তাহীনে রাখতে চান। তাদের ভাবনাটে এমন- হাস্যরসটা দুর্বল শিল্প; যে শিল্পে গহনতা নেই কিংবা নেই নির্জনতা! এই নিয়ে খুঁৎ ও খেদোক্তিও আছে- তিনি তো রম্যলেখক! তিনি রম্য লিখেন এবং তাই তার লেখা নিম্নমানের! রম্য-রস নিম্ন শ্রেণির চেতনা নয়; এমন মানসিকতা যাদের তারাই চেতনার নিম্নে বাস করছেন বলে ধারণা।
সাহিত্যে চিন্তার ছাপ রেখে হাসাতে পারাটা খুব একটা সহজ কাজ, তা কিন্তু নয়। সহজ কথা সহজভাবে বর্ণনা করার যে তিক্ততা সেইটে রবিঠাকুরের চেয়ে আর কে বেশি বুঝেছেন? বড়ো গাম্ভীর্যের সাথে দু’চারটে মন্দ মেশাতে পারলে চোখের জল বিয়োগ সম্ভব, কিন্তু হাসিটা যেভাবে ভাবছেন ওভাবে সম্ভব নয়। এইটে শুধুই রম্যের মোড়কে প্রযোজ্য। অধুনা সাহিত্যে এই কথাটে খুব করে তোলা যায়। সাহিত্যে রস সৃষ্টিতে লেখকদের বিশেষ উৎসাহ দেখতে পাচ্ছেন না বলেও অনেক প্রাজ্ঞজনের ধারণা-মত। অথচ একজন বঙ্কিম কিংবা সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা পড়লে সাহিত্যের উঁচুতলা আর নিচুতলার বৈষম্য বের করা সম্ভব। কতো সিরিয়াস কথা বাই-সিরিয়ালি তাঁরা হেসে হেসে বলেছেন; ওটা ভাবাও সুখের-পুলকের! রবীন্দ্রনাথের বেলায়ও একই কথা। এ মহান শিল্পীও বলেছেন রসে-কষে। এই যে, সাহিত্যে বৈষম্য; সেই বৈষম্য রুখে দিতে রম্যসাহিত্যিক আবদুশ শাকুর সাহসের সাথে যে সত্য উচ্চারণ করেছেন, পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন তাতে করে রম্যসাহিত্যের ভিত নিয়ে সংশয় কেটে যায়। রম্যসাহিত্যের প্রতি তাতে করে জমে যায় বিন্দু বিন্দু ভালোবাসার ঘাম-ঘ্রাণ। তিনি বলেন, ‘সে কথা কোনো কালের কোনো ভাষায় কোনো মহৎ লেখকই ভাবেননি, ভাবেননি বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মহাকবি মধুসূদন দত্ত, ভারততাত্ত্বিক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, আধুনিক গদ্যের প্রাণপুরুষ প্রমথ চৌধুরী, ভাবেননি পরবর্তী কালের জগদীশ গুপ্ত, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, সতীনাথ ভাদুড়িও।’
এবং বাংলাসাহিত্যে শেষ পর্যন্ত স্যাটায়ারের শেষ কথারই জয় হয়েছে। য়্যুনেস্কো যখন বলেন, ‘মানবজীবন এক সকরুণ প্রহসন’; তখন কারণ-অকারণ হাসি-কান্নায় মানুষের ভাবনাগুলো স্বভাবনায় মূর্তিমান হয়ে উঠে মানুষেরই সমাজে। বলতে দ্বিধা কিবা সংকোচ কোথায়? স্যাটায়ার হচ্ছে সাহিত্যের ‘জেওর’। যে যতই বলুক না কেন, রসবিনে সাহিত্য-শিল্পের আসর সিরিয়াসলি-ই ঊন এবং অপূর্ণ।
আবু ইসহাক, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, সৈয়দ মুজতবা আলী, আসহাব উদ্দীন আহমদরা প্রলম্বিত সময় ধরে এই রস আস্বাদনে পাঠকশ্রেণির মাঝে মুগ্ধতা রেখে গেছেন। এ সাহিত্য কতো দিনের জন্য, কতোগুলো মানুষের জন্য আর কতোগুলো দেশ-প্রদেশের জন্য প্রযোজ্য হবে তার ক্যালকুলেশন করা যায় না। তাঁদের প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে, নিজস্বতা নিয়ে সাহিত্যে হাজির হয়েছেন, টিকে থেকেছেন এবং থাকবেনও। এঁদের ভেতর আরো একজন রম্যকথাসাহিত্যিকের নাম আমরা স্বমহিমায়-স্বগর্বে লিখে দিতে পারি। তিনি নকশি কথার মানুষ অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান (ইবনে সাজ্জাদ)। নামে-বেনামে সাহিত্যের এই রসস্রষ্টা বিরস রচনা নামে আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে রম্যশিল্পের উৎকর্ষে কাজ করেছেন। নিজস্ব স্টাইলে লিখেছেন অসংখ্য মানোত্তীর্ণ রচনা। তাঁর কলামগুলো গণমানুষেরই কলাম। তাঁর বিরস রচনা গণমানুষেরই কথা।
এই রম্যসাহিত্যিক নিজের ব্যাপারে বলতে গিয়ে বিরস রচনার সাতকাহনে বলেন- ‘অধম অসময়ে অতিরিক্ত প্রাণি হিসেবে ধরাধামে আগমন হেতু দুর্জন, দুর্ভোগ, দুর্যোগের ঘেরাটোপে পতিত হইতে বাধ্য হইয়াছি।’ তিনি তাঁর সময়ের পরবর্তী সময়কে ধারণ করে যখন ‘মানুষের পতিত জীবন’র বীজতলা চিহ্নিত করেন; তখন আমাদের মতো প্রাণিদেরও সামনে-পেছনে হাত নিয়ে দেখতে হয়। স্পর্শে অনুভব করতে হয়- কী গজেছে আর কী খসেছে! ‘দুর্জন, দুর্ভোগ, দুর্যোগ’র মতো জোড়া-তেজোড়া শব্দের মহড়া দিয়ে তিনি সাহিত্যে অনন্য সুন্দরের অন্যূন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর প্রায় লেখার ভাঁজে ভাঁজে খোঁজ মেলে এমনসব শব্দজেওর।
সাহিত্যে স্যাটায়ার নিয়ে তাঁর নিজের বক্তব্য আমাদেরকে নবপ্রাণে ভাবায়। তিনি বলেন, ‘বাংলাসাহিত্যে স্যাটায়ারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের নহে। অতীতে আমাদের সাহিত্যে স্যাটায়ারের পরিবর্তে অশ্লীলতা, নোংরামি প্রধান ছিল। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ‘ব্যঙ্গ’ একটি পাঠক উদ্দীপক বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হইয়াছে। আমার রচনাসমূহকে প্রকৃত স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গরচনা হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিযুক্ত হইবে বলিয়া মনে করি না। ইহাকে ঠ্যাঙানি কথন হিসেবে আখ্যায়িত করা যাইতে পারে। পাঠক অন্যনাম আখ্যা দিলেও হরষিত হইব। আমাদের দেশে অন্ন-আনন্দ-নিদান-নিবাসহারা-নিরক্ষর মানুষের শরীরে নকশিকাঁথা না থাকিলেও নকশিকথা ও নকশিগল্প রহিয়াছে। এই মানুষদের পুষ্পিত সৌরভ আমার রচনায় খুশবু ছড়াইয়া দিয়াছে। চিরায়ত বিশ্বসাহিত্য ও ভুবনজয়ী সাহিত্যিকদের অমর বচন নানাভাবে চয়নের কসরত করিয়াছি।’
এই যদি রম্যের রমরমা সংজ্ঞা হয়, তাহলে আমরা স্যাটায়ারের একটা নতুন রূপ দেখতে পাই। যার অন্যনাম ট্যাঙানি কথন। এখানেই তিনি ক্রম কাটিয়ে ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছেন। ইবনে সাজ্জাদ নতুন মোড়কে সাহিত্যে রস আমদানি করেছেন- এ কথা বলা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমাদের হাজার বছরের গালগল্প বা মুখে মুখে প্রচলিত সরেস মন্তব্যকে তিনি ‘নকশিকথা বা নকশিগল্প’ বলে যে নকশায়ন করেছেন, তাতে চোখ বুলাতেই বুক ভরে যায় আমাদের।
ইবনে সাজ্জাদ ‘বিরস রচনা’য় সংসারের পাচকঘর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ হাউস নিয়ে উচিত বক্তার বক্তব্য উপস্থাপনে ভূমিকা রেখেছেন। ‘গণতন্ত্র’ আমাদের সুখের একমাত্র মন্ত্র হলেও সেই গণতন্ত্র সবসময় ষড়যন্ত্র করেই চলেছে। সদিচ্ছার মরণ ঘটিয়ে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটুকুও বিঁধে দিচ্ছি আমরা। ক্ষমতার জন্য মমতার গণতন্ত্রকে কবরস্থ করে মিছে মায়ায় কাঁদছিও। গণমানুষের ঘামের পানি আর চোখের পানি যে এক হয়ে সাগরের সৃষ্টি করছে, সেদিকে কারোরই খেয়াল নেই। এই বালা আসমানি নয়; মনুষ্যসৃষ্ট বলেই তিনি রম্যের নেকাবে ‘টুপি ও সংবিধান’ গদ্যে পষ্টই বলেছেন, ‘হে সুহৃদ পাঠক, আমাদের গণতন্ত্র এখন খানদানের সমস্যায় পতিত হইয়াছে। বর্তমানে আমাদের রাজনীতিতে কি সাংবিধানিক সংকট হইয়াছে? না সংবিধানে জট পড়িয়াছে? …এই সংকট হইতেছে সদিচ্ছার সংকট।’ ‘খানদানি সমস্যা’টা কী? এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি গল্পের আশ্রয়ে বলেছেন- ‘টুপি হইলো খানদানের পরিচয়। নদীপথে মম টুপি বাতাস ষড়যন্ত্র করিয়া নিঃশ্বাস ফেলিয়া নদীগর্ভে ডুবাইয়া দিয়াছে। আমি আমার খানদান রক্ষার জন্য তথা টুপির পরিবর্তে লুঙ্গি দিয়া পাগড়ি ধারণ করিয়াছি মাত্র। খালি মাথা ছোট লোকের অখানদানি পরিচয়।’
এই হলো আমাদের সবখানের খানদানি পরিচয়ের উলঙ্গপনা আর বেহায়াপনা। যা আজকাল আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে এবং মিছে খানদানি নিয়ে আমরা লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছি বলেও তাঁর ধারণা।
এমনসব গভীর ও সুগভীর ছেদন আর বেদনমাখা মনের বুদ্ধিদীপ্ত কথা হাসিমাখা মুখের ঝরঝরে বয়ানে বয়ারে ভাসিয়ে দিয়ে, ইবনে সাজ্জাদ স্যাটায়ারের অনতিক্রম্য উচ্চতায় আসন নিয়েছেন নিশ্চিতই।

x