নকল ও ভেজাল প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোতে লোকবল বাড়াতে হবে

বৃহস্পতিবার , ৯ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ
45

কোনো কিছুই ভেজালের ছোবল থেকে বাদ যাচ্ছে না। জীবন রক্ষাকারী পানিও আজ নিরাপদ নয়। শহর এলাকায় যত্রতত্র নকল কারখানা বানিয়ে পুকুরডোবা এবং ওয়াসার পানি কোনো রকমে ছেঁকে বাজারজাত করা হচ্ছে। সে পানিতে থাকছে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়ামলেডইকোলাই। এ ছাড়া এগুলো বিশুদ্ধ নামীদামি কোম্পানির সিলমোহর দিয়ে দেদার চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। দেশীবিদেশী কোনো ফল কেনার আগে ক্রেতাকে কয়েকবার ভাবতে হচ্ছে। কেননা ফলে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল।

নকল ও ভেজালের বিরুদ্ধে বছরের নানা সময়ে অভিযান চললেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। তুলনামূক শাস্তি লঘু হওয়ার কারণে নকল ও ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য কিছুতেই থামছে না। সারা দেশে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল ও মানহীন পণ্য। এর ফলে ক্রেতারা যেমন প্রতারিত হচ্ছে, তেমনি হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। একশ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী ক্রেতাদের ঠকিয়ে মুনাফার পাহাড় গড়লেও তাদের বিরুদ্ধে তেমন ব্যবস্থা নেই।

গত ২রা আগস্ট ‘নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় বিএসটিআইয়ের অভিযান কম, সুযোগ নেন অসাধু ব্যবসায়ীরা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক আজাদীতে। এতে বলা হয়েছে, ‘দিন দিন খাদ্যে ভেজালের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। বেকারি পণ্য ও মোড়কজাত নানা ধরনের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য পণ্যে ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) লোগো ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে অনেক পণ্য। আবার বেশিরভাগ পণ্যে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ থাকে না। এই ধরনের অনেক অনিয়মের বিরুদ্ধে বিএসটিআই সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ৯৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করেছে। এসময় মামলা হয়েছে ১৪০টি। এছাড়া জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫৩ লাখ ১৮ হাজার টাকা কম। তবে ২০১৬১৭ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে মামলা বেড়েছে ৩০টি ও অভিযান বেড়েছে ৪৩টি। বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধুমাত্র নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় বছরের অন্তত ২৫০টি অভিযান কম পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসন থেকে আবার সব সময় ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়া যায় না। বেশি অভিযান পরিচালনা সম্ভব হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সতর্ক থাকতেন এবং ভেজাল পণ্যের দৌরাত্ম্যও কমে আসতো।’

দেশে উৎপাদিত পণ্যের মান প্রণয়ন, প্রণীত মানের ভিত্তিতে পণ্যসামগ্রী উৎপাদন ও গুণগত মান পরীক্ষা বা বিশ্লেষণ করে মানের নিশ্চয়তা প্রদান করা বিএসটিআইয়ের কাজ। বিএসটিআই মাত্র ১৫৫টি পণ্য বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করে। বাকি পণ্যগুলো বাধ্যতামূলক না হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা এগুলোতে ভেজাল মেশাচ্ছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য যে ম্যাজিস্ট্রেট ও লোকবল দরকার, তা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। সীমিতসংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে পুরো শহরে অভিযান পরিচালনা করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তা ছাড়া অভিযান পরিচালনার সময় প্রায়ই পুলিশের সংকট দেখা দেয়।

আবার বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে নকলভেজাল বন্ধে সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এজন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি পাড়ামহল্লায় খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠলে এ আপদ থেকে সহজেই নিস্তার পাওয়া যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে নকল ভেজালের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। খাদ্যে ভেজালকারীদের সামাজিকভাবে চিহ্নিত করে কঠোর সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। ভেজাল বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নেবেআমরা তেমনটিই দেখতে চাই।

কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ড এমনভাবে বাড়াতে হবে যাতে অপরাধীরা ভয় পায়। প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রধানকে পণ্যে ভেজাল রোধের দায়িত্বে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিশুখাদ্যেও চলছে যথেচ্ছভাবে ভেজাল। জনস্বার্থে এ ব্যাপারে সরকারকে আইনগত ব্যবস্থা যেমন জোরদার করতে হবে, তেমন নকল ও ভেজাল প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোতে লোকবলও বাড়াতে হবে। সব ধরনের ভেজালের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করতে হবে। জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি এবং সবার সুন্দর জীবনের স্বার্থে ভেজালবিরোধী অভিযানে কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি উদ্যোগী হতে হবে।

x