ধর্ষণের বিরুদ্ধে গণজোয়ার চাই

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৭ জুলাই, ২০১৯ at ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ
27

আমাদের সোনার বাংলায় সোনার মানুষের অভাব আছে। কিন্তু পোড়াকপালীর অভাব নেই। প্রত্যন্ত থেকে পৌর, জনবহুল থেকে নির্জন যে-কোনো এলাকায় যে-কোনো বয়সী একটি মেয়ের কপাল পুড়তে বেশিক্ষণ লাগে না। মেয়েদের কপাল যে কতভাবে পোড়ে কমবেশি আমরা সকলেই তা জানি। এই সেদিন শরীয়তপুরের জাজিরা পৌর এলাকায় একটি হতদরিদ্র মেয়ের কপাল পুড়ল। নিজের ঘরে তাকে আটকে রেখে একাধিকবার ধর্ষণের পর ধর্ষক তাকে শ্বাসরোধ করে পরপারে পাঠাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার কপাল মন্দা সে মরেনি। উপরন্তু ঘটনা জানাজানি হয়েছে। ধর্ষক ধরা পড়েছে। এমনকি গ্রেপ্তারও হয়েছে। হলে কি হবে, ধর্ষক মাসুদ ব্যাপারী যে মেয়র ইউনুস ব্যাপারীর পুত্র! ৮ দিনের মাথায় তার জামিন হলো। মেয়রপুত্র বলে নয় এমন জামিন তো আকছার হয়। এসব বিষয় এখন এতটাই গা-সওয়া হয়েছে যে আমাদের কৌতূহলের চোখ আর ধর্ষককে দেখে না। কিন্তু এমন আসামির পক্ষে যখন একজন নারী আইনজীবী দাঁড়ান তখন চোখ তুলে তাঁকে দেখতেই হয়। এক্ষেত্রে সোনায় সোহাগার মতো ফুটেছে আরও এক নারীর নাম। জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্বপ্রাপ্ত এ নারী ধর্ষকের পক্ষে জামিন মঞ্জুর করেন। এও আমাদের দেখতে শুনতে ও জানতে হলো!
আমাদের জয়নব আক্তার ইতি নিশ্চয়ই গলা খুলে জোরালো যুক্তিপূর্ণ ভাষায় এক ধর্ষকের জামিন চেয়েছেন। এবং আমাদের মরিয়ম মুন মঞ্জুরী সে আবেদনে সাড়া দিয়ে যে মহৎ কর্মটি করেছেন সেজন্য তাঁদের অভিনন্দিত না করে, তাঁদের গর্বে গর্বিত না হয়ে আমরা কেন লজ্জায় অধোবদন হচ্ছি, কেন মর্মে মর্মে মরে যাচ্ছি? কেন আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের কৃষ্ণনগর থেকে ৬৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে ওদের এবারের লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজয়ী মহুয়া মিত্রের কথা? কেন শরীয়তপুরের জয়নব আক্তার ইতি এবং মরিয়ম মুন মঞ্জুরীর গলা ছাপিয়ে শুনতে পাচ্ছি মহুয়া মিত্রের গলা? গত ২৫ জুন (২০১৯) ওঁদের রাষ্ট্রপতির ভাষণের পক্ষে ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর মাত্র ১০ মিনিট ২১ সেকেন্ডের একটি ভাষণ দিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপির তিন শতাধিক এমপিকে এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের এমপিদের অধোবদন করে দিলেন মহুয়া মিত্র? কর্তৃত্ববাদের কালে একটি সরকার বিরোধী কণ্ঠ কতটা ব্যতিক্রম হতে পারে নিয়মতান্ত্রিক পথে হেঁটেই তার দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন এক নারী। ইংরেজি, হিন্দি এবং কখনো উর্দুতে তিনি তাঁর বক্তৃতায় ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে তাঁর দেশে ফ্যাসিবাদের জুড়ে বসার স্বরূপটি উন্মোচন করে ফেললেন। ঘোর কেটে সরকার দলীয় সাংসদবর্গের হৈ হৈ রৈ রৈ করে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কবি রাহাত ইন্দোরির কবিতার পংক্তি উচ্চারণ করে যবনিকা টানেন মহুয়া মিত্র। বাংলা অনুবাদে পংক্তি দু’টি আলতাফ পারভেজের অনুবাদে : সবার রক্ত মিশে আছে এখানকার মাটিতে/ এ তো কারও বাপের হিন্দুস্থান নয়! সঙ্গে সঙ্গে প্রিয় পাঠক, মিশেল ওবামাকে মনে পড়ে যাচ্ছে তো? বিনা সম্বোধনে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করেই মিশেল বললেন, আমেরিকা আমার বা আপনার নয়। এদেশ আমাদের। জন্মগ্রহণ করি বা আশ্রয় নিই, দেশটা আমাদের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর অতি সাম্প্রতিক আলোড়ন তোলা যে মন্তব্যে চারজন নারীকে যাঁর যাঁর দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে অভিশংসনের শিকার হতে গিয়ে নমনম করা একটি নিন্দা প্রস্তাবের জোরে বেঁচে গেলেন সেই চার নারীর পক্ষে কথা বলেছেন মিশেল ওবামা। মজার ব্যাপার হলো ওই চার নারীর মধ্যে অন্যতম আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও করতেস। এই করতেস প্রভাবিত মহুয়া মিত্র প্রদত্ত ওজস্বী ভাষণটি সম্পর্কে আলতাফ পারভেজ তাঁর কলামে (দৈনিক প্রথম আলো ৫.৭.১৯) বলেছেন, ‘…ক্রমে দম বন্ধ হয়ে আসা দক্ষিণ এশিয়ায় মহুয়া যেন কিছু অক্সিজেন নিয়ে এলেন।’
নারীর প্রতি পৌরুষ উজাড় করা বলপ্রয়োগ বা তুই-তোকারি সম্বোধনের সঙ্গে অল্পবিস্তর ধারণা আমাদের কারও নেই,্‌ এমন নয়। কিন্তু কোনো সরকারি নারী কর্মকর্তাকে কোনো সরকার দলীয় নেতাও কি, ‘তুই আমাকে চিনিস? আমার নাম শুনেছিস? তোকে আমি দেখে নেব। আমি না চাইলে তুই ইজ্জত নিয়ে বের হতে পারবি?’ এমন ভাষায় শাসাতে পারেন? হ্যাঁ, পারেন। বোয়ালখালী উপজেলার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে এমন ভাষায় শাসিয়েছেন। ২ কোটি ৮০ লক্ষ ৩ হাজার ৪৪৫ টাকার কাজ। দরপত্রের ফর্ম খোলাখুলি বিক্রি না করার নেতৃনির্দেশ প্রকল্প কর্মকর্তা মানতে পারেননি। তিনি নিয়মের বাইরে যাননি। অতঃপর সন্ধ্যার পরে তাঁকে ডাক বাংলোয় ডেকে পাঠানো হয়। তিনি বিষয়টি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন এবং নিরাপত্তা পেয়েছেন। তবে ফেসবুক ও ভুঁইফোঁড় অনলাইন পোর্টালে তাঁর বিরুদ্ধে ছবিসহ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে তাঁকে। সুপ্তশ্রী সাহা, যাঁর শরীরে বইছে মুক্তিযোদ্ধার রক্ত তিনি কি অত সহজে ভেঙে পড়ার মানুষ? তিনি পিছপা হননি। সাহস হারাননি। আমরা তাঁকে সাধুবাদ জানাই। প্রসঙ্গত এক নারীকে আক্ষরিক অর্থে ঘাড়ধাক্কা দেওয়ার অপরাধে মন্ত্রিত্ব খোয়ানো যুক্ত-রাজ্যের মার্ক ফিল্ডের গল্পটা শোনাই।
সেখানকার পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী মার্কফিল্ড। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের ম্যানসন হাউসে চলছিল অর্থমন্ত্রীর বার্ষিক ভাষণ ও ভোজসভা। মিলনায়তনের একপাশ দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এক নারী। প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন। প্রথমে তিনি একটি পিলারে সঙ্গে ঠেসে ধরেন ওই নারীকে। তারপর ঘাড় ধরে ঠেলতে ঠেলতে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বাইরে একরকম ছুঁড়ে দিয়ে আসেন। ঘটনার ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে গেল। সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল চারদিকে। এমন জঘন্য আচরণের নিন্দা হলো অনেক। এক সাক্ষাৎকারে সেই রাতেই মার্ক জানালেন তাঁর ধারণা ছিল ওই নারী অস্ত্রধারী। তাঁর কাছে অস্ত্র থাকতে পারে। তবে তাঁর গায়ে হাত দেওয়ার জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের দফতর থেকে বলা হলো প্রধানমন্ত্রী ভিডিওটি দেখেছেন এবং তাঁর কাছে ঘটনাটা উত্তেজক মনে হয়েছে। ঘটনার তদন্ত হবে তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
যে নারীকে কেন্দ্র করে ঘটনাটা ঘটলো তিনি জলবায়ু আন্দোলনের কর্মী। লাল পোশাক পরিহিত এই আন্দোলনকারীরা ২১ জুন গলায় ‘ক্লাইমেট ইমার্জেন্সী’ লেখা উত্তরীয় পরে জোরপূর্বক ওই অনুষ্ঠানে প্রবেশ করেছিলেন। অনুষ্ঠানের অতিথিরা জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ভূমিকা রাখতে পারেন এমন অনুমানই তাঁদের অনুপ্রবেশের হেতু এবং তাঁরা পরিচয় দিয়েই ঢুকেছিলেন কিন্তু রক্ষা পেলেন না একজন প্রতিমন্ত্রী। যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রে আরেকটি লক্ষ্যণীয় ব্যাপার নিয়ে গল্প হতে পারে। ২০১৫ সালে প্রণীত ‘দ্য রিকল অব এমপিস অ্যাক্ট’ আইনে বলা হয়েছে, মিথ্যাচার, দুর্নীতি কিংবা কোনো অপরাধে আইনপ্রণেতা দণ্ডিত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা ওই আসনে উপনির্বাচন দাবি করতে পারে। ১০ শতাংশ ভোটার স্বাক্ষর দিলেই আসনটি শূন্য হবে। এ আইনের আওতায় চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে দুজন আইনপ্রণেতা পদ হারিয়েছেন। আহা, এমন একটা আইন যদি থাকতো আমাদের এ মুহূর্তে কজন আসন হারাতেন ভাবুনতো!
শিশুরা যে কোনো ধরনের (খুন জখম অপহরণ ধর্ষণ ইত্যাদি) নির্যাতনের বা অপঘাত মৃত্যুর সহজ শিকার। অধুনা অজাচারের কিছু খবরও আমাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন ২৬৯টি সংগঠনের জোট) সদ্য প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এবছরের প্রথমার্ধে খুন নিখোঁজ এবং অপহৃত শিশুদের একটি গা হিম করা পরিসংখ্যান দিয়েছে। দেখা গেছে এ পরিসংখ্যান ২০১৮ সালে বছরব্যাপী পরিসংখ্যনটিকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরাতো বটেই সাধারণ বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষটিও বলবে বিচার হয় না বলে অপরাধ কমে না। সাহস করে ক্ষতিগ্রস্তরাও বিচারপ্রার্থী হয় না। আমাদের জাতীয় সংসদে প্রদত্ত তথ্যই বলছে গত ৪ বছরে ১৭ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে কিন্তু মাত্র ২০ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। অপরাধীদের সাজার হার ২ শতাংশ মাত্র। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে গত ১০ জুলাই ‘যৌন নিপীড়ন থেকে শিশুদের রক্ষা’ (সিওসিএসও) শীর্ষক সংশোধনী আইনটি পার্লামেন্টের লোকসভায় পাশ হয়েছে। রাজ্যসভায় পাশ হবার অপেক্ষায় থাকা এই আইনে গুরুতর যৌন নিপীড়নের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যান্য অপরাধের শাস্তিও কঠোর করা হয়েছে। প্রসঙ্গত বলতে চাই শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের চেয়েও ভয়ঙ্কর শাস্তির বিধান বিশ্বের দুচারটি দেশে নতুন করে বহাল করা হয়েছে। গত ১১ ই জুলাই ইউক্রেন পার্লামেন্টের এক বিশেষ অধিবেশনে ২৪৭ জন এমপির ভোটে শিশু ধর্ষণের অপরাধে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নপুংশক করার আইনটি পাশ হয়। অপরাধী ধর্ষক প্রমাণিত হলে ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে আইনটি কার্যকর হবে। এর এক মাস আগে অর্থাৎ গেল জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা রাজ্যেও একই ধরনের আইন পাশ হয়। কাজাখাস্তানেও এমন শাস্তির অর্থাৎ খোজাকরণের বিধান রয়েছে।
দৈনিক খবরের কাগজ দিয়ে যাদের দিন শুরু হয় তারা আজ আগ্রহ ভরে পত্রিকা হাতে নিতে বা কাগজের ভাঁজ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। একের পর এক ভয়াবহ শিশু ও নারী নির্যাতনের খবর জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন বহু খবরকে গুরুত্বহীন করে তুলছে। গত ১১ জুলাই জাতীয় সংসদের ৩য় অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে খোদ প্রধানমন্ত্রী নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে বিদ্যমান আইনকে কঠোর করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। গণমাধ্যমে ধর্ষকের চেহারা বারবার দেখানোর ও ছাপানোর কথা বলেছেন। তারও আগে ধর্ষকের ব্যাপারে পুরুষদের সোচ্চার হবার কথা তিনি বলেছেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান। তৃণমূল পর্যন্ত এ দলের সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে আমরা জানি। চাই যে ধর্ষণের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক আন্দোলনের ডাক আসুক ওখান থেকে। সমগ্র দেশ আজ ওই আন্দোলনে শামিল হতে প্রস্তুত।

x