ধর্ষণের প্রতি শূন্য সহনশীলতা চাই যুগপৎ সরকারের, সমাজের

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ
27

সিয়েরা লিওন।

পশ্চিম আফ্রিকার একটি ছোট্ট দেশ। মাত্র ৭৮ লক্ষ মানুষ অধ্যুষিত সে দেশটিতে ধর্ষণ মহামারীর রূপ নিয়েছে। গত ১ বছরে ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৫০৫ টি। পরিসংখ্যানটি জেনে চমকে উঠেছেন প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস মাদা বিও। তবে ৫ বছরের একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ ও বিচলিত হন যে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বসলেন তক্ষুণি। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাজার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বিচার বিভাগকে শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বলেছেন এবং দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন শিশুটির ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে।
গত ৩১ শে জানুয়ারি (২০১৯) সেগুনবাগিচার সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে মহিলা পরিষদ এক সংবাদ সম্মেলনে ১৪টি জাতীয় দৈনিকের খবরের ভিত্তিতে জানুয়ারিতে দেশব্যাপী ৭৯টি ধর্ষণের তথ্য দিয়েছেন। মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়াবহতা ও মাত্রার প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আরও একবার। আমরা এ বিষয়ে তাঁর উদ্বেগ ও সরকারের শূন্য সহনশীলতার নীতিগ্রহণের পৌনঃপুনিক দাবির প্রতি কৃতজ্ঞ। মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যানটিতে ধর্ষণের শিকার শিশুদের সংখ্যা আলাদা করে আসেনি। তবে দৈনিক প্রথম আলোর এক হিসেবে ধর্ষণের ৪১টি ঘটনার কথা এসেছে যার ২৯জনই শিশু। অর্থাৎ ধর্ষণের শিকারদের অধিকাংশই শিশু। এসব খবর আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। আমরা জানি আমাদের দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু আমাদের আইন কতটা গতিশীল? একের পর এক ধর্ষণের খবর এসেছে বহুদিন বহুকাল। সম্প্রতি সেই সঙ্গে ধরপাকড় বা গ্রেফতারের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। ধর্ষিতা এখন আর আগের মতো নিরুপায় বা অসহায় নয়। পরিবার তো বটেই সমাজ এখন তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু বিচার?
গত ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে জনৈক আমির হোসেনকে মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করেছেন। রায়টি কি সত্যিই স্বস্তি দিয়েছে আমাদের? ঘটনাটা ২০০৫ এর । অর্থাৎ বেঁচে থাকলে আজ সেই শিশুটির বয়স হতো ২৪ বছর। এ বয়সে এসে এ মামলার রায় শুনে তাকে কোন ধরনের অস্বস্তি, অপমান, লজ্জা ও বেদনার শিকার হতে হতো সহজেই তা অনুমান করা যায়। ১০ বছরের শিশুকন্যাটি বেড়াতে এসেছিল ফুফুর বাড়িতে। হাটহাজারী উপজেলার মেখল গ্রামে ওই বাড়ির দিন মজুর ওকে ঝোঁপঝাড়ে নিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বিষয়টা ধামাচাপা দিতে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। যথারীতি মামলা হয়। দীর্ঘ ৩ বছরের তদন্ত শেষে পুলিশ এ মামলার অভিযোগপত্র দেয় ২০০৮ সালে ২৫ আগস্ট। ২০০৯ সালে বিচার শুরু হয়। মোট ১৯ জনের সাক্ষ্য নেন আদালত। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় হলো তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০,০০০ টাকা জরিমানা। এবং একই আইনের ৯ (২) ধারায় সে পেল মৃত্যুদন্ড ও ১ লক্ষ টাকার অর্থদণ্ড। আসামীর সঙ্গে তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ একটি পরিবার ভোগ করবে অন্যরকম শাস্তি। ত্বরিত বিচার হলে এদের যন্ত্রণার কোনও কারণ ছিল না। এ ধরনের বিচারের রায় গত দুতিন বছরে থেকে থেকে হচ্ছে দেশব্যাপী। গত মাসে খাগড়াছড়ির মানিক ছড়িতে ৫ বছরের একটি শিশুকে খাবারের লোভ দেখিয়ে শ্মশানে নিয়ে যায় ২৪ বছরের মোস্তাফিজ। শিশুটির তীব্র চিৎকারে ঘটনা জানাজানি হয়। মোস্তাফিজ হাতেনাতে ধরা পড়ে। তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তুু এই মুহূর্তে সে কি কারাগারে? বিচার প্রক্রিয়া কি শুরু হয়েছে?আমরা জানি না।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অব ইকনমিক মডেলিং) দুদিনব্যাপী সম্মেলনের ৫টি কর্ম অধিবেশনের শেষ অধিবেশনটি ছিল সিমিন মাহমুদ স্মরণে। মৃত্যুর আগে তিনি ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রধান গবেষক। তাঁকে স্মরণ করে ‘শ্রমবাজার এবং কর্মসংস্থানের প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ (সিমিন তাঁর স্ত্রী ছিলেন) বলেছেন, নারীদের কাজ করার ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা কমে আসছে কিন্তু নারীর কর্ম সংস্থান কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। অথচ নারীর উদ্যোগী ভূমিকা জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার এবং শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। বেড়েছে শিশুর প্রতিষেধক টিকা গ্রহণের হার। আমরা সাধারণ বুদ্ধিতে বুঝি এই জনসংখ্যা হ্রাসের অর্থ হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিশুর কাঙ্ক্ষিত বেড়ে ওঠা। আজ এই শিশুরাই ঘরে বাইরে, দোকানে, নির্মাণাধীন দালান-কোঠায়, স্কুলে, বনে-জঙ্গলে, কবরস্থানে শ্মশানে এবং কোথায় নয় এবং কার হাতেই না নিগৃহীত হচ্ছে! ধর্ষণের কারণে শিশু মরছে, ধর্ষণে ব্যর্থ হলেও তাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। এভাবে শিশুদের পিষে মারা হলে মাকে আবার শিশুরক্ষার স্বার্থে গৃহবন্দী করার একটা চক্রান্ত হয়তো বা ফলপ্রসূ হয়। ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ অবশ্য নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলেছেন। সমান শ্রমে নারীর কম মজুরি পাওয়ার কথাও বলেছেন। প্রয়াত সহধর্মিণী সম্পর্কে তিনি বলেন, তাঁর (সিমিনের) বিশ্বাস ছিল ‘কেবল অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রথার পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন। কারণ নারীর ক্ষমতায়ন শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়, এর সামাজিক মাত্রা আছে।’ সমান শ্রমে নারীর কম মজুরি প্রাপ্তির কারণটি অর্থনীতির যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যাবে না বলে স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ। তার কারণ নিয়োগদাতারা মনে করেন একজন পুরুষকে সংসার চালাতে হয়; একজন নারীকে তা করতে হয় না। তাঁর এই পর্যবেক্ষণটি অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নিশ্চয়ই। নারীকে ঘিরে, নারীর জন্য বঞ্চনার পাহাড় গড়ে ওঠা তাই স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। কোথাও এমন মানসিকতা কাজ করে বলেই হয়তো ধর্ষণের বিচার প্রলম্বিত হয়। প্রলম্বিত বিচার মানে অস্বীকৃত বিচার। সেজন্যেই বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ২০১৭র ২৮ মার্চ ধর্ষিতা দুই ছাত্রীর মামলার আসামী জামিন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রাষ্ট্রপক্ষ তার জামিন বাতিলের আবেদন করায় আবার তাকে গ্রেফতার করা হলো। এ মামলার বিচারও কবে শেষ হবে কে জানে! শাজনীন হত্যার বিচার হতে লেগেছিল প্রায় দেড় যুগ। একটা সময় ছিল, ছিল এই সেদিনও, ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে বাধ্য হতেন ধর্ষিতার পরিবার। ধর্ষণ-ঘটনার সকল দায়, তাবৎ লজ্জা ছিল মেয়েদের। আজ পরিস্থিতি আগের মতো নেই। নেই বলতে একটা ‘ট্যাবু’ হয়তো ভেঙেছে কিন্তু চারপাশে আদৌ তেমন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে কি? উন্নয়ন অঢেল ঠিকই সেইসঙ্গে বৈষম্যও যে আকাশ-পাতাল। ধর্ষক স্বীকারোক্তি দিয়েছে কিন্তু প্যাথলজিক্যাল টেস্ট নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়েছে। দলবেঁধে গৃহবধূকে ধর্ষণ করা হবে তার আগে তার স্বামীকে গ্রেফতার করিয়ে থানার হেফাজতে রেখে দেওয়া হলো। ৯৯৯ এ ফোন করে বাবা মেয়েদের ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচালেন। কিন্তু পুলিশ চলে যাবার পর ঘর ছেড়ে পালাতে হলো পুরো পরিবারকে। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পরিবার বিচার চেয়েছে। মামলা করেছে। চিহ্নিত আসামী ধরা পড়ার আগে পাওয়া গেল গলায় চিরকুট ঝোলানো ধর্ষকের লাশ। হারকিউলিসরা সাবধান বাণী দিচ্ছে। দিচ্ছে মামলা তুলে নেবার হুমকি। উল্টো হত্যার মামলার আসামী এখন ধর্ষিতার পরিরার। তিনমাস, ছমাস, নমাস আটকে রেখে ধর্ষণ? সভ্য সমাজে? সম্ভব? থানায় ঝুলছে নারী পুলিশকর্মীর লাশ। ধর্ষণে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ধরা পড়ে যাচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে?
আসলে একটা ঝড় বইছে এলোমেলো, উথাল-পাতাল। ‘তনু’ হত্যার অপরাধীরা অশরীরী হয়তো বা কিন্তু অপরাধী যখন ধরা পড়ে, লোকে ধরিয়ে দেয় তখনও বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীর অসহায়ত্ব ঘোচে না কেন?

x