ধর্ষণের আলামত নষ্ট!

পুলিশের আংশিক ব্যর্থতা স্বীকার চার নারী ধর্ষণ

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৩:১৩ পূর্বাহ্ণ
542

কর্ণফুলীর শাহমীরপুরে চার নারী ধর্ষণের ঘটনায় তাৎক্ষণিক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে আংশিক ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পুলিশের পক্ষ থেকে এ দায় স্বীকার করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বন্দর জোনের উপ কমিশনার হারুনউররশিদ হাযারী। আলোচিত এই ঘটনা নিয়ে গতকাল দুপুরে আকস্মিকভাবে কর্ণফুলী থানায় এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে হারুনউররশিদ হাযারী বলেন, ‘ঘটনার পরপরই স্পর্শকাতর এ বিষয়টিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল কর্ণফুলী থানা পুলিশের। এক্ষেত্রে থানা পুলিশের আংশিক গাফিলতি ছিল এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এ ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং আসামিদের গ্রেফতারেই আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’ উপকমিশনার চার নারী ‘ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে গেছে’ বলেও জানান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের (ভুক্তভোগীদের) সাথে কথা বলেছি। ঘটনার পর তারা গোসল করে কাপড় ধুয়ে ফেলেছিল। পাবলিক তো এগুলো জানে না, আমরা পুলিশের লোক এগুলো জানি, ধর্ষণের আলামত সংরক্ষণ করার জন্য এ জিনিসগুলো রাখতে হয়।’ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক আলামত নষ্টের বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছেন বলে জানান হাযারি। তবে তিনি বলেন, ধর্ষণের শিকার নারীদের ডাক্তারি প্রতিবেদন এখনও পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে পাননি তারা।

প্রসঙ্গত, গত ১২ ডিসেম্বর কর্ণফুলীর শাহমীরপুরে দুবাই প্রবাসীর ঘরে ডাকাতির পর তিন গৃহবধূ ও তাদের এক ননদকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় মামলা নিতে পুলিশের বিরুদ্ধে গড়িমসি করার অভিযোগ ওঠে। পরে ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নির্দেশে কর্ণফুলী থানা পুলিশ প্রায় ৫ দিন পর মামলা নেয়। ঘটনার পর থেকেই মামলার তদন্তে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ তুলে কর্ণফুলী থানার ওসির অপসারণ করার দাবি জানিয়ে সভা সমাবেশ করছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি ও পুলিশের গাফিলতির বিষয়ে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে কয়েক দফায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে স্থানীয় এলাকাবাসী। এতে কর্ণফুলি থানা পুলিশের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছিল। এ কারণেই আকস্মিকভাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন বলে মন্তব্য স্থানীয় বাসিন্দাদের।

সংবাদ সম্মেলনে উপকমিশনার (বন্দর) হারুণ উর রশিদ হাযারি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘অস্বীকার করার কিছু নেই। মামলা নেওয়া এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের আংশিক ব্যর্থতা ছিল। তখন বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার ছিল।’ কর্ণফুলী থানার ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে হারুনউররশিদ হাযারী বলেন, ‘বিষয়টি সিএমপি কমিশনার স্যারকে জানাব।’ তবে ওসির মত তিনিও বলেছেন, এজাহার দিতে বাদীর ‘ভুল’ হয়েছিল। ভূমি প্রতিমন্ত্রীর চাপে মামলা নেওয়ার বিষয়টিও তিনি এড়িয়ে গেছেন। লিখিত বক্তব্যে হারুন উর রশিদ হাযারী দাবি করেন, ‘মামলার বাদী ঘটনার দুই/তিন দিন পর থানায় এসে দস্যুতার কথা বলললেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে ধর্ষণের বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। ওই দিন রাত হয়ে যাওয়ায় বাদী আর থানায় মামলা না করে পরদিন অভিযোগ দাখিল করবেন বলে জানিয়েছিলেন। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর থানার একজন পরিদর্শক (তদন্ত) ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করেন। বাদী রাতে এসে অভিযোগ দিলে মামলা হয়।’ এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত সুজন ওরফে আবুকে ২৮ ডিসেম্বর টিআই প্যারেডের মাধ্যমে ভিকটিমের শনাক্ত করার কথা রয়েছে। পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও কোনো মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। তবে বলা হয়েছে, অপর দুই আসামি মাহমুদ ফারুক ও ইমতিয়াজ উদ্দিন বাপ্পীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা চলছে এবং তাদের উভয়কে পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে আরও ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ভিকটিমের ডাক্তারী পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এরমধ্যে ঘটনাস্থল হতে সব ধরণের আলামত জব্দ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও পেশাদারীত্ব নিয়ে মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে।

এ সময় সিএমপির সহকারী কমিশনার (কর্ণফুলী জোন) জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তের অনেকগুলো পদ্ধতি আছে। রিমান্ডও একটা পদ্ধতি, টিআই প্যারেডও একটা পদ্ধতি। আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নেওয়ার আগে চূড়ান্তভাবে শনাক্তের জন্যই টিআই প্যারেড করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন কাউকে ধরে রিমান্ডে নেওয়া, এটা একটা সহজ পদ্ধতি। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনে অনেক ঘটনা থাকে। এতটুকু বলতে পারি, আসামিদের গ্রেফতারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। খুব শীঘ্রই আপনাদের সুখবর দিতে পারব।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন কর্ণফুলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সৈয়দুল মোস্তফা, কর্ণফুলী থানার ওসি (তদন্ত) হাসান। ওসি ছৈয়দুল মোস্তফা জানান, ধর্ষণের কিছু আলামত উদ্ধার করে ঢাকায় ডিএনএ টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধর্ষণের পর অজ্ঞতাবশত পরনের কাপড় চোপড় ধুয়ে ফেলাতে কিছু আলামত নষ্ট হয়ে যায়। তারপরও বেডশিট ও অন্যান্য আলামত উদ্ধার করে সেগুলোর ডিএনএ টেস্ট করা হচ্ছে।

এদিকে নারী উন্নয়ন ফোরাম নামের একটি সংগঠনের অভিযোগ, অনেক টালবাহানা শেষে পুলিশ মামলা নিয়ে তিন জনকে গ্রেফতার করলেও তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ না করে ‘অযথা সময়ক্ষেপণ’ করছে। এ সংগঠন ধর্ষকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ২৭ ডিসেম্বর বুধবার চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনরের কার্যালয় এবং পরদিন কর্ণফুলী থানা ঘেরাওয়ের কর্মসূচিও পালন করবে বলে জানিয়েছে। এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর এ সংগঠনটি মামলা নিতে বিলম্ব এবং ধর্ষকদের গ্রেপ্তারে গড়িমসির অভিযোগে কর্ণফুলী থানার ওসি সৈয়দুল মোস্তফাকে প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ একই পরিবারের চার নারীকে ধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রথম থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ঘটনার ১৩ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ মালামাল উদ্ধার ও ঘটনার ক্লু বের করতে পারেনি। সোমবার হঠাৎ করে পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হচ্ছে জেনে এলাকাবাসী ধারণা করেছিল, ঘটনার রহস্য উদঘাটন, মালামাল উদ্ধার ও আসামীরা ধরা পড়েছে । স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, ‘শুরু থেকে পুলিশ রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছে। আমি বলার পরও তারা মামলাটি নেয়নি। পরে অবশ্য ভূমি প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ১৭ ডিসেম্বর রাতে তারা মামলা নিয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘১৮ ডিসেম্বর পুলিশ দুই জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে আবু নামে একজন ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে চার ভিকটিম পুলিশকে নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ এখন পর্যন্ত আবুকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।’ পুলিশ আবুকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই অন্য তিন আসামির নাম বেরিয়ে আসবে বলে তিনি জানান।

ভুক্তভোগী ওই পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১২ ডিসেম্বর রাতে কয়েকজন ডাকাত জানালার গ্রিল কেটে বাড়ির ভেতরে ঢুকে। পরে প্রতিটি রুমে প্রবেশ করে আলমারিতে থাকা ১৫ ভরি স্বর্ণ, ৫টি দামি মোবাইল সেট ও ৮৭ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। মালামাল নেওয়ার পর চার নারীকে আলাদা রুমে নিয়ে ধর্ষণ করে। বাড়ির ৩ সহোদর দুবাই প্রবাসী। মামলার বাদী ছোট ভাই ঘটনার সময় পটিয়ায় ছিলেন। মামলার বাদী জানান, আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আশেপাশে সবাই আমাদের বিশ্বস্ত। কোনদিন কল্পনাও করতে পারিনি এ ধরণের ঘটনা ঘটবে। ক্ষতিগ্রস্তদের ধারণা ডাকাতিতে অংশ নেয়া অনেকের বাড়ি ঘটনাস্থলের আশেপাশে।

এদিকে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক শাস্তির দাবিতে কর্ণফুলী কলেজ বাজার এলাকায় গতকাল সামাজিক সংগঠন আলোর পথে, কর্ণফুলী ব্ল্যাড ব্যাংক ও তথ্য ও মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এতে বড় উঠান ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল আলম ও কর্ণফুলীর মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান বানাজা বেগম নিশিসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এ মানববন্ধন কর্মসূচিতে পাঁচ শতাধিক বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

x