দ্রোহ ও প্রেমের সমান্তরাল রেখা

ইউসুফ জাফরের কবিতা

মোহাম্মদ জাকের হোছাইন

শুক্রবার , ৩১ মে, ২০১৯ at ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
28

অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ -এ প্রকাশিত হয়েছে কবি ইউসুফ জাফরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিকেলে চৈত্রের খররোদ…’। শব্দাঞ্জলি প্রকাশ করেছে গ্রন্থটি। ১৯৬৮ থেকে ২০১৬ সাল ব্যাপী রচিত উল্লেখযোগ্য কবিতাসমূহ নিয়েই এ কাব্যের অবয়ব। বাংলার ইতিহাসে এ সময়ে ঘটে গেছে ৬৯ -এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট, ৯০-এর স্বৈরাচারের পতন। একজন সংবেদনশীল এবং রাজনীতি সচেতন কবি হিসাবে তাঁর কবিতায় ওঠে এসেছে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং এ সঙ্গে মানুষের সহজাত ও শাশ্বত অনুভূতি-প্রেম।
কবি সত্য ও সুন্দরের আরাধনা করেন। তাই এ কাব্যের প্রথম কবিতা ‘একটি ফুল দাও নিষ্পাপ’। কবির কাছে একটি ফুল একটি এটম বোমার চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী। কারণ ফুল বা প্রেমই জয় করতে পারে পৃথিবী , বদলে দিতে পারে সমাজ, রাষ্ট্র । তাই সমাজ, রাষ্ট্র তথা মানুষের কাছে কবির একান্ত চাওয়া- ‘আমাকে একটি ফুল দাও/তোমাদের পুষ্পিত বাগান থেকে /একটু ভালোবাসা দাও তোমাদের স্বপ্নগুলো থেকে’। ফুল আর ভালোবাসা পেলে সমাজ-রাষ্ট্র সুস্থ থাকবে। মানুষের জীবন হবে আনন্দ-সুখের। ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলনের সময় কবি একটি সূর্যের প্রত্যাশায় দিন গুনেছেন। সেই সূর্যটি এলে পরাধীনতার অন্ধকার, ক্ষুধার অন্ধকার, বিচিত্র মোহ আর কারা-প্রকোষ্ঠের অন্ধকার দূরে সরে যাবে। এ সূর্যকে দূর আকাশ থেকে পেড়ে আনবে বলে একাত্তরে যারা মিছিলে গিয়েছে কবি তাদের সাথে সামিল হয়েছেন। ‘জয়, বাংলার জয়’ বলে তাঁর কন্ঠও প্রকম্পিত হয়েছে মুক্তির স্লোগানে। এই মিছিলের অগ্রনায়ক ছিলেন বাঙালী জাতির জনক। ‘স্পন্দিত লাভায় জন্ম নেয়া ভারী কণ্ঠের এক বিশাল পুরুষ, চোখের তারায় কাঁপে যার ব্যাঘ্রের ক্ষিপ্রতা’; যার আহবানে ‘টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া/প্রতিটি ঘর হয়ে যায় দুর্গ / রাতের অন্ধকারে নিকানো দাওয়া হয়ে পড়ে নির্ভীক সভাস্থল’। তাই কবি তাঁকে জানান লাল সালাম। তাঁর কন্ঠ থেকে তখন নি:সৃত হয়: তোমায় ভালোবাসি / তোমায় ভালোবাসি জনক ।
সামাজিক অসাম্য, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, উপনিবেশকতা কবিকে বারবার বেদনার্ত করেছে; হৃদয়ের গভীরে রক্তপাত ঘটিয়েছে। তাই তাঁর কবিতারা এ অশুভ আর অসুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে- বিপ্লবের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
কেবল দ্রোহ আর বিপ্লব নিয়েই তো মানুষের জীবন নয়। এসবের সাথে আছে প্রেম- ভালোবাসা। তাই মধ্যরাতে বৃষ্টি এলে ঐন্দ্রিলার কথা মনে পড়ে, রঞ্জনার সোনালী বাগানে যেতে ইচ্ছে করে। কতোদিন হয়নি দেখা ঐন্দ্রিলার সাথে। তাই হৃদয়-মন বড়ই তৃষ্ণার্ত। কিন্তু তৃষ্ণা পেলে কী হবে? লজ্জাবতী কিশোরী তো জল নিয়ে আসেনা কাছে। উল্টো, ‘মধ্যরাতে বৃষ্টির জলের ঝাপটা মেখে মসৃণ রূপোলী গালে চেয়ে থাকে সুনীল বিন্যাসে’। আবার মধ্যরাতে বৃষ্টির ঐন্দ্রিলা কখনো হয়ে যায় রঞ্জনা। কত নামেই তো ডাকে মানুষ তার প্রিয়জনকে। কেবল একটু ভালোবাসা পেতে , আর একটু ভালোবাসা দিতেই এতো ডাকাডাকি , এতো নাম ধরে। ডাক শুনুক আর না শুনুক আমৃত্যু ডেকে যাওয়ার নামই তো ভালোবাসা।
প্রেম মানুষকে সাহসী করে তোলে । সেই সাহসের জোরে প্রেমাস্পদ বলে ওঠে : তুমি একজন শুধু আমার পক্ষে থেকো / আমি এই ভণ্ড পৃথিবীর বিপক্ষে দাঁড়াবো’ (মিনার মনসুর)। কবি ইউসুফ জাফরও সাহসী উচ্চারণে বলে ওঠেন: ‘আর কোন ভয় নেই রঞ্জনা / তোমার চোখের অঞ্জন মেখে আমি /নরকেও যেতে পারি’। রঞ্জনার চোখের অঞ্জনে কী আছে তাহলে? ‘আগ্রাসী শিখার তাণ্ডব নৃত্যের’ মাঝেও রঞ্জনার চোখ কবিকে মুক্ত রাখবে, সাহস যোগাবে প্রতিবার। কবি তাই আশ্রয় খোঁজেন সেই চোখে : চাঁদের বিমল আলোয় আমায় /জড়িয়ে রাখো রঞ্জনা/তোমার সোনালী বাগানে /নরোম কবোঞ্চ গণ্ডে চেতনার ঘ্রাণ
নিয়ে/নিবিড় সুপ্তিতে থাকবো পড়ে। প্রিয়ার মরাল গ্রীবায় চেতনার ঘ্রাণ নিয়ে কবি নিবিড় ঘুমে ঢলে পড়তে চান একান্ত নির্ভরতায়। ‘রঞ্জনার সোনালী বাগানে’ কবিতাটি আভাস দেয় কবি এবং রঞ্জনার মাঝে অদৃশ্য একটি বাধা আছে। বাধাটি হতে পারে সামাজিক কিংবা ধর্মীয়। কিন্তু একান্ত গোপন। কবি স্মৃতি জাগানিয়া গল্পের ফাঁকে টুস করে বলে ফেললেই কেবল এ রহস্যের উন্মোচন হবে।
ভালোবাসার মানুষটির সাথে কবি ঘর বাঁধতে পারেন আর না পারেন, কিন্তু তার মঙ্গল কামনাতেই প্রহর কাটে । তাই অসময়ে বৃষ্টি এলে কবি তাঁর প্রিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন:ভিজেনা বৃষ্টির জলে অমন করে ভিজেনা /অসময়ে বৃষ্টি এলে ভিজেনা কেউ।্‌ সরাসরি নিষেধও না আবার উপদেশও না। ক্যামোন যেনো পরোক্ষ সব। এ পরোক্ষ কথার মিষ্টি আনন্দ কেবল ভালোবাসার মানুষরাই বোঝে- অন্যেরা কভু নয়।
‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’ কবি হয়তো তারে ‘হারিয়েছে দূর অজানায়’। সময়ের আবর্তে হয়তোবা তিনি প্রত্যাখ্যানের নিপুণ শিকার। তাই তার মাঝে জেগে ওঠেছে প্রচণ্ড অভিমান । সেই অভিমান থেকেই তির্যক প্রশ্ন : তুমি /এ কোন প্রদর্শনীতে নেমেছো রমণী? এ কোন বেসাতি নতুন /এ কেমন প্রেমজ কঠিন অনল জ্বালিয়ে ভস্ম করো পৃথিবী ? এখানেই থামেননি কবি। আরো চোখা প্রশ্ন ছুঁড়ে মারেন কবি: অথচ কী উল্লাসে ভাঙো, ভাঙো জল তুমি / এ কোন দারুণ খেলায় মেতেছো রমণী ? একদিন যাকে ভালবাসাতো কবি, হয়তো সে দারুণ খেলেছে কবির হৃদয় নিয়ে । তাই কবির হৃদয়ে রাবনের চিতা জ্বলে । অথচ তার প্রিয়া দেখেও দেখে না, বোঝেও বোঝেনা । এ ক্যামোন তরো ভালোবাসা । কবির হৃদয়ে এখন ঝাঁ ঝাঁ করে চৈত্রের খররোদ। পুড়ে যাচ্ছে হৃদয়ের বসতি । একটু বৃষ্টি দরকার । হয়তো সহসা বর্ষার বৃষ্টি নিয়ে আসবে কবির নতুন কবিতা। কারণ ভালোবাসা মরে, পিছুটান মরেনা।
কবি সত্তরের দশকে ছিলেন বাঁশখালী কলেজের বাংলা বিভাগের তুমুল জনপ্রিয় অধ্যাপক, পরবর্তীতে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। অবসর জীবনে এখন সুফি গবেষক ও কাব্যসাধক।

x