দোলাচল

তহুরীন সবুর ডালিয়া

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ
17

যানজট আর খানাখন্দের রাস্তা পেরিয়ে সেই পশ্চিম বাকলিয়া থেকে বটতলী পুরোনো রেলস্টেশনে এসে পৌঁছাতে হাঁপ ধরে গেলো তবারক সাহেবের। রিকশার ঝাঁকুনিতে চিকিয়ে উঠেছে পুরোনো ব্যথা। ঈষৎ খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্যান্টের ওপর ডান কোমড়ে হাত বুলালেন তিনি। বছর দেড়েক আগে অতো বড় অপারেশনটা হলো তার। কোমড়ের ডানদিকে জোড়া হাড়ের জয়েন্ট বলটা ফেটে গেলো। বাসা থেকে সবে সকালের নাস্তা সেরে বেরিয়েছিলেন অফিসের উদ্দেশ্যে। হুড ফেলে বসেছিলেন রিকশায়। হয়তোবা অন্যমনস্ক ছিলেন খানিকটা। পেছন থেকে কিসে ধাক্কাটা পড়লো বুঝে উঠার আগে টের পেলেন অথবা নিজেকে আবিষ্কার করলেন রাস্তার একধারে প্রায় বড় নালার পাশে বেকায়দায় শয্যাগত অবস্থায়। উঠে বসতে গিয়ে বুঝতে পারলেন, সম্ভব নয়। এরকম পরিস্থিতিতে অনেক পথচারী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে, কেউ কেউ ছুটে আসে সাহায্যের জন্য। যে ছেলে দুটি তবারক সাহেবকে দু’দিক থেকে ধরলো, তিনি ওদের একজনকে অনুরোধ করলেন, প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা হাতে নিতে সাহায্য করতে। ছেলেটি প্যান্টের পকেট থেকে প্রায় বেরিয়ে আসা মোবাইলটি সযতনে তুলে দিতে গেলো তবারকের হাতে কিন্তু দুই নম্বর ছেলেটি নিজের হাতে মোবাইলটি নিতে নিতে বললো, ‘আঙ্কেল আমাকে নম্বর বলুন, আপনি পারবেন না, আপনার হাতে রক্ত।’
তাইতো! কোমড়ের যন্ত্রণায় টের পাননি হাতের ইনজুরী। ডান তালুর প্রায় অনেকটা রাস্তার ঘষানিতে ছিঁড়ে রক্তাক্ত হয়ে আছে। স্বভাবতই স্ত্রী তাহমিনার নম্বরটাই বললেন, আর আর বলতে পারলেন ছেলে দুটিকে, “বাবারা তোমরা আমাকে একটা হাসপাতালে পৌঁছে দাও।” ব্যথা তখন মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে। কোমড়ের সেই চিকিৎসা চট্টগ্রাম এ করা সম্ভব হয়নি। ঢাকায় অপারেশন হলো। স্টিলের পাত ঢুকানো হলো ভাঙা হাড়ের পজিশন ঠিক রাখতে। যেদিন হাসপাতাল থেকে রিলিজ পাবেন সেইদিন সার্জন সাহেবের মৌখিক ও লিখিত প্রেসক্রিপশন বুকের মধ্যে শেলের মত এসে বিঁধলো তবারক সাহেবের।
‘উঠে, দাঁড়িয়ে হাঁটু মুড়ে আর নামায পড়তে পারবেন না। নামায পড়বেন চেয়ারে বসে বসে।
দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভাঙতে পারবেন না। থেমে থেমে সিঁড়ি দিয়ে উঠবেন।
আগের মত আর দৌঁড়াতে পারবেন না।
আজ থেকে এ জীবনে আর কখনোই নয়।’
তাহমিনা নিঃশব্দে অনেকক্ষণ কাঁদলো। জীবন এখন অনেকটা নিয়ম কানুনের নিগড়ে বাধা। তাহমিনার ইচ্ছে ছিলো না, তবারক একলা মামুনকে দেখতে যাক। কিন্তু স্কুল থেকে ছুটি মিললো না মিনার। মামুন তাদের বেশি বয়সের একমাত্র সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ্যাপ্লাইড মেথের উপরে তার ২হফ ণবধৎ। ছেলেটি জ্বরে পড়েছে আজ ৪ দিন হতে চললো। মনের মধ্যে অস্থিরতা থেকেই ছুটিটা নিলেন। ট্রেনের উঁচু সিঁড়িটাও তার জন্য বিপদজনক, কিন্তু বাসে দীর্ঘ সময় খোঁড়া পা নিয়ে বসে থাকাও আরেক বিপদ, অগত্যা ট্রেন।
নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্টে সীট খুঁজে বসতে না বসতেই ট্রেনটি দুলে উঠে চলতে শুরু করলো। ডান পা টা খানিকটা ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলেন তিনি, আর তখুনি কাঁধের পাশে ব্যাক প্যাকের খোঁচা, পাশ ফিরে দেখলেন, কিশোরীপানা মুখের এক তরুণী। ‘সরি’ বলে সরে দাঁড়াতে গিয়ে দুই সীটের মধ্যবর্তী প্যাসেজে চলাচলরত মানুষের ধাক্কা খেলো মেয়েটি। তিনি আশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালেন, তাতে করে করুণ হলো তরুণীর দৃষ্টি।
‘কোন সমস্যা ?’
‘জি আঙ্কেল, বন্ধুর মাধ্যমে টিকিট কেটেছিলাম ফোনে ফোনে, এই দেখেন মেসেজ। এক হাজার টাকাও দিয়েছি। কিন্তু সিটটি দেখছি আরেকজনের দখলে। তার হাতে একই নম্বরের টিকিট।’
এই এক নতুন প্রতারণা শুরু হয়েছে। এক টিকেট ব্ল্যাকে চৌদ্দজনের কাছে বিক্রি করা। আশেপাশের অনেক সহযাত্রীই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠলো। তবারক সাহেবের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বয়সে কম এক ভদ্রলোক সিট ছেড়ে দিলো কিছুক্ষণের জন্য মেয়েটিকে বসতে দিয়ে। বিব্রত মেয়েটি লাল হয়ে সিটটিতে বসে পড়লো। তবারক সাহেব লক্ষ্য করলেন, কম্পার্টমেন্ট ভরতি তরুণ-তরুণী। সবার হাতে হাতে কারেন্ট এ্যাফেয়ার্সের বই, নোটখাতা, পত্রিকা এবং মুখে চাকরির পরীক্ষা সংক্রান্ত পারস্পরিক অভিজ্ঞতার টিপস।
আগামীকাল শুক্রবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা। সারা বাংলাদেশে চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা লক্ষাধিক। এদের দখলে গেছে আজ পুরো ট্রেন।
তবারক সাহেবের চাকরি মধ্যগগনের প্রায় শেষের দিকে। আর এইসব উজ্জ্বল উচ্ছল প্রাণবন্ত তরুণ তরুণীরা শুরু করতে চলেছে তাদের নতুন জীবন। আশা, সম্ভাবনা, স্বপ্ন ও হতাশার কথা তারা সোচ্চারে বলে চলেছে।
‘বুঝলি দোস্ত যে পরীক্ষাটা বেশি ভালো হয়, সেই চাকরিটাই হয় না। হা হা হা।’
তবারক সাহেব কান পাতলেন। আগামীকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা। পদ আছে ২ হাজার ২ শতটি। ক্যান্ডিডেট সারা বাংলাদেশে ৬/৭ লক্ষ। কেউ পড়ছে, কেউ কন্ঠে সুর তুলছে। অধিকাংশ ছেলেমেয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আর ভাইবা বোর্ড নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। সামনে মুখোমুখি সিটের তরুণ চারটি বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
মনটা হঠাৎ শঙ্কায় ভরে উঠলো তবারক সাহেবের। একমাত্র সন্তান মামুন। আশা করে আছেন- আর দু’আড়াই বছর পর ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যদি ভালো কোথাও ঢুকতে পারে অথবা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে। এটিই এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে সোনার হরিণের গল্প হয়ে উঠেছে।
মাঝে মাঝে ডান পা’টা এমন বিদ্রোহ করে, তবারক সাহেব ঠিক জানেন না, কতদিন আধা সরকারী অফিসের এই মাঝারি কর্মকর্তার চাকরিটা তিনি চালিয়ে যেতে পারবেন। আশা ভরসা এখন মামুন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মূহূর্তে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছে। ছেলেটা না আবার এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। তাইতো ছেলের এখন গায়ে জ্বর। মনটা আজকাল খুব সংকীর্ণ হয়ে গেছে, সবসময় শঙ্কায় ভরে থাকে। কোন কিছু নিয়ে উদারভাবে, বড় মনে আর চিন্তা করতে পারেন না। বয়সের দোষ নাকি অর্থকষ্টের গ্লানি-কোনটা যে মনটাকে এতো সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে কে জানে।
তবারকের নিজের ছাত্র জীবনে পাড়ার বড় ভাইদের দেখে দেখে রাজনীতি করার ইচ্ছে যে ছিলো না, তা নয়। ফুটবল খেলাও তাকে বড় টানতো তখন। পাড়া ও কলেজ মাঠে দু’দুবার সেরা স্ট্রাইকারের সম্মান তার জীবনে এখন সুখ স্মৃতি।
ছেলেটা বড় ক্রিকেট পাগল। তাদের সময়ে এদেশে ক্রিকেটের তেমন চল ছিলো না। সবে শুরু বলা যায়। ফুটবল ছিলো সবার ধ্যান জ্ঞান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মৃন্ময়ী নামের এক হিন্দু মেয়ের প্রেমে পড়লেন তবারক। মৃন্ময়ীর দীঘল কালো জল ভাসানো চোখ, হাটু অব্দি নেমে পড়া চুলের ঢালে মশহুর তবারকের দিন রাত্রি ভেসে গেছে আকাশ কুসুম কল্পনাতে। সকালবেলা লম্বা চুলের বিনুনী ঝুলিয়ে ষোলশহর রেলস্টেশনে ভার্সিটির শাটল ট্রেনের অপেক্ষায় যখন এসে দাঁড়াতো মৃন্ময়ী, মনে হতো জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে উঠে এসেছে নাটোরের বনলতা সেন। অচেনা কোন এক যুবকের সাথে পাখির নীড়ের মত চোখ ভাসিয়ে কথা বলছে মৃন্ময়ী। তবারকের দূর থেকে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করতো, ‘বলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে। কি কথা তার সাথে, তাহার সাথে!’ কিন্তু যা হয় তার জীবনে, সব কিছুতে বড্ড বিলম্ব। বিলম্ব হয়ে গেলো মৃন্ময়ীর সামনে এসে দাঁড়াতে। মৃন্ময়ী তার চোখের সামনে ছাত্র ইউনিয়নের ভার্সিটি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রহমত উল্লাহর হাত ধরলো “আমারি বধূয়া আনবাড়ি যায়, আমারি আঙ্গিনা দিয়া।” রহমত ফাইন আর্টসের ছাত্র, লম্বা চুলে ক্যাম্বিসের ব্যাগ কাঁধে ভার্সিটির বারান্দা ধরে হাঁটতো দুলকি চালে। একটা ভাব ছিলো শালার, তাতে মজে গেলো মৃন্ময়ী।
সব শহরের সব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটা ঘ্রাণ থাকে, প্রাণ থাকে। তবারকের পক্ষে ভার্সিটির সেই প্রাণের গভীরে ঢোকাও তেমন সম্ভব ছিলো না। হুমায়ুন আজাদের সেই বিখ্যাত কবিতার মত-“যতই উপরে যাই ততই নীল যতই গভীরে যাই ততই মধু”। ভার্সিটির সেই নীল সেই মধু স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি তবারকের পক্ষে। তাকে ভার্সিটি শেষে বিকেল থেকে সন্ধ্যারাত পর্যন্ত বাবার ছোট্ট ডিসপেনসারী দেখাশোনা করতে হতো। রাতের বেলা ডিসপেনসারী বন্ধ করে বাজার সওদা নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাঝরাত প্রায়। বাড়ি মানে একপাল ভাইবোন, বাবা, মা, দাদী, বিধবা ফুফু ও চাচী।
তার বুকের গভীরে সুপ্ত একটা স্বপ্ন ছিলো, কোনো এক বিশ্বকাপের খেলা তিনি সরাসরি মাঠ থেকে দেখবেন। আশ্চর্য এই যে, স্বপ্নটি এখনও মরে যায়নি। বরং ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কালিন্দা গ্রাবার কিতোরোভিচের মত খেলা পাগল এক তরুণী প্রেসিডেন্ট তার স্বপ্নটিকে চাগিয়ে তুলেছে পুনরায়। কানের পাশে রেলকর্মীর চিৎকারে চিন্তাসূত্র ছিন্ন করে বাস্তবে ফেরেন তবারক। চা, কফি, চিপস, চকলেট আর নাস্তার ঘ্রাণে হাক ডাকে ভরে উঠেছে গোটা কম্পার্টমেন্ট। এক কাপ চায়ের জন্য সতৃষ্ণ হলেন তবারক সাহেব। এখন ট্রেনে এসেছে পূর্ণ গতি। আশা, ভরসা, শঙ্কা সম্ভাবনায় স্বপ্ন দোলাচলে দোলায়মান মানুষগুলোকে পেটের মধ্যে সেধিয়ে নিয়ে ট্রেনটি ছুটে চলেছে তার গন্তব্যের পথে।।

x