দৈনিক আজাদী : নন্দিত ষাট বসন্তের অভিযাত্রা

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

সোমবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৫ পূর্বাহ্ণ
30

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। প্রায় তিন হাজার বছরের প্রাচীন এই জনপদের পরাধীনতার কলঙ্ক মুক্তির দিন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশলক্ষ শহীদানের প্রাণ বিসর্জন ও দুইলক্ষ জননী, জায়া, কন্যার সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশের পর থেকেই স্বাধীনতাকামী বাঙালির কঠিন পথযাত্রায় সহযাত্রী হিসেবে আজাদীর ভূমিকা ছিল বরাবরই অসাধারণ। এজন্যই ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ শিরোনামে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্রের গৌরব অর্জন করতে পেরেছে দৈনিক আজাদী। ঊনষাট বছর পেরিয়ে ষাট বছরে এই পত্রিকার পদার্পণ শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো বাংলাদেশে এক অপরিমেয় আনন্দবার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
১৯৬০ সালে প্রকাশিত দৈনিক আজাদী ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের ২য় পত্রিকা। এর পূর্বে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক ইত্তেফাক। দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক। যিনি মোহময় অন্য পেশাকে গ্রহণ না করে সম্পূর্ণ নির্লোভ ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বপরিমন্ডলেও সামগ্রীক অর্থ, সমাজ, বাণিজ্য, বন্দর, রাজনীতি, ধর্ম, সমাজনীতি, সাহিত্য ইত্যাদির পরিচয় তুলে ধরে এক অমূল্য সম্পদের ভিত রচনা করেছেন। আজকের দিনে তাঁকে আমি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। দীর্ঘ সময় ধরে এই পত্রিকার আরেক পবিত্র অহংকার ছিল প্রয়াত অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে তিনি শুধু জাতির বিবেকখ্যাত হননি, প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সুযোগ্য জামাতা এই সম্পাদক ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাংবাদিক জগতের আদর্শ এবং দেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সুযোগ্য পুত্র বর্তমান পত্রিকার সম্পাদক জনাব এম. এ. মালেক একজন আলোকিত মানুষ। সজ্জন ব্যক্তিত্ব শুধু নন, শিক্ষানুরাগী এবং একজন মহৎ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবেও বিশেষভাবে খ্যাতিমান। লায়ন্স ইন্টার্ন্যাশনাল, পাহাড়তলীস্থ চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল, ইম্পেরিয়াল হাসপাতালসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত থেকে দেশের গণমানুষের সেবায় নিজেকে নিবেদন করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিয় এবং গুণী পিতার স্মৃতিকে জাগরুক রাখার জন্য প্রায় পনের লক্ষ টাকার স্মৃতিবৃত্তির মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। প্রায় ফোরামে বক্তব্য প্রদানকালে বলেন, নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ নয়; সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ এবং জনগণের এক্ষেত্রে সেবা পাওয়ার অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার নৈতিকতা ও আদর্শিকতার দর্শনে উনি বিশ্বাসী।
পত্রিকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জাতির জনকের প্রতি নিরন্তর শ্রদ্ধা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই করুণ ও হৃদয়বিদারক ইতিহাসের অধ্যায়কে তাৎপর্যপূর্ণ সহকারে বিশেষায়িত করে থাকে এই পত্রিকা। ‘শোকাবহ আগস্ট’ শিরোনামে মাসব্যাপী বিশ্ব ইতিহাসের নিকৃষ্টতম, বর্বরতম ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা, মহাকালের মহানায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে শাহাদত বরণের মাসটিকে প্রতিদিনই প্রচ্ছদে ও উপসম্পাদকীয় বিশেষ কলাম উপস্থাপন করে চলেছে।
সূচনালগ্ন থেকেই এই পত্রিকার যন্ত্রকৌশল তথা কোহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেস মহান ভাষা আন্দোলনের উপর লিখিত প্রথম কবিতা কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ প্রকাশ ও প্রচার করে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক এবং প্রেসের ম্যানেজার দবির উদ্দিন শাসক গোষ্ঠীর তীব্র রোষানলে পড়ে যারপরনায় নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
ধর্মভিত্তিক অন্ধ গোঁড়ামীকে ধারণ করে বাঙালি জাতি ও বাংলাভাষাকে পরিপূর্ণভাবে অবজ্ঞা করে শোষণ-বঞ্চনার যে কালো অধ্যায় রচিত হয়েছিল তা শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও স্বীকৃত।
এ প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের অমর বাণীটি উল্লেখ করতে চাই – ‘ভবিষ্যতের ধর্মীয় আদর্শের মধ্যে থাকবে পৃথিবীর যা কিছু সৎ ও মহৎ এবং সেই সঙ্গে থাকবে ভবিষ্যৎ উন্নতির অনন্ত সম্ভাবনা।’ এইসব চেতনা শাণিত বক্তব্যগুলোকে ন্যূনতম আমলে নেয়নি বলেই বিশ্ব সভ্যতা উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেও আদর্শিক ও নৈতিকতায় প্রচন্ড এক পশ্চাৎপদ অবস্থানে রূদ্ধ হয়ে আছে। মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা-ভাবনা, কৃষ্টি-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ইত্যাদির মূলে রয়েছে সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্মের মৌলিক মেলবন্ধন এবং বিশ্বমানবতাবাদে উজ্জিবিত অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, সত্য-সুন্দর-কল্যাণ ও আনন্দের জাগতিক পরিপূর্ণতা।
বস্তুতপক্ষে সংবাদ মাধ্যম এবং সাংবাদিকতা সম্পূরক ও পরিপূরক এবং বহুমাত্রিক অর্থে প্রচলিত প্রত্যয় হিসেবে বিপুল সমাদৃত। যদিও সংবাদ পরিবেশনায় তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ, সম্পাদনা ও প্রকাশ ইত্যকার বিষয়গুলো প্রাচীনকাল থেকেই প্রায়োগিক বিষয়রূপে ঐতিহাসিকভাবে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে নানা অনুষঙ্গের সাথে সম্পৃক্ত, প্রাচীন ভারতেও তার যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে। সম্রাট অশোকের আমলে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ পাথর ও স্তম্ভে খোদিত হয়ে রাজ্যের সর্বত্র তথ্য বা প্রজ্ঞাপনরূপে প্রচারিত হতো।
সে সময় দেশ-বিদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজে গুপ্তচরও নিয়োগ করার প্রচলন ছিল। সুলতানি আমলে ‘বারিদ-ই-মামালিক’ (গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ) রাজ্যের তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের দায়িত্ব পালন করতেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির আমলে তা ছিল অধিকতর বিস্তৃত। মুগল আমলে ‘ওয়াকই-নবিশ’, ‘সাওয়ানিহ-নবিশ’ এবং ‘খুফিয়ানবিশ’ নামক সংবাদ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সক্রিয় ছিল। এছাড়াও ‘হরকরা’, ‘আকবর-নবিশ’ নামে তথ্য সরবরাহের বিভিন্ন ব্যবস্থাও ছিল। সামাজিক, সাংস্কৃতিক খবরাখবর সরবরাহের জন্য ভাট, কথক ও নরসুন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে আধুনিক সাংবাদিকতার উম্মেষ হলেও উপনিবেশ হওয়ার কারণে এশিয়ার অন্য অঞ্চলের চেয়ে বাংলায় এর প্রভাব অধিকতর দ্রুততার সাথে প্রসার লাভ করে। শ্রীরামপুরের ব্যাপ্টিস্ট মিশন জে সি মার্শম্যান সম্পাদিত ১৮১৮ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ‘দিগদর্শণ’ ছিল প্রথম বাংলা সাময়িক পত্র। একই বছর মে মাসে জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, তারিণীচরণ শিরোমণি প্রমুখ এর সম্পাদনা সহায়তায় মার্শম্যান সম্পাদিত ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়। একই সময়ে বাঙালি সম্পাদক ও মালিক হরচন্দ্র রায় কর্তৃক ‘বাঙ্গাল গেজেট’ নামক প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক প্রকাশের সূচনা ঘটে (সূত্র: গুগল, ইয়াহো, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া ইত্যাদি ইন্টারনেট সংস্করণ)। সংবাদ পরিবেশন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনায় এসব প্রকাশনা সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলা গদ্য, প্রবন্ধ ইত্যাদিও এর মধ্যে সমৃদ্ধি লাভ করে।
প্রকৃতপক্ষে ১৮৩১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সংবাদ প্রভাকর’ ই ছিল বাঙালিদের কাছে উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্র। নতুন লেখক সৃষ্টির মাধ্যমে গদ্যরীতির পরিবর্তন এবং নতুন সাহিত্য সৃজনের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অনন্য সাধারণ। উল্লেখ্য যে, ১৮৫৭ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ববঙ্গে ৭৬টি সংবাদপত্র ও ১৬২টি সাময়িকপত্র প্রকাশ পেলেও অখন্ড বাংলায় এই দুইটির সমন্বয়ে মোট প্রকাশনা ছিল ৯০৫টি। ১৮৫৭ সালে নভেম্বরে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকায় সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চারনে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। পূর্ববঙ্গের ঢাকা বা অঞ্চল ভিত্তিক পত্রিকা প্রকাশ পেলেও এদের প্রচার সংখ্যা ছিল খুবই কম। ১৮৬৩ সালের সরকারি হিসেব অনুযায়ী ঢাকা নিউজ, ঢাকা প্রকাশ, ঢাকা দর্পণ এবং হিন্দু হিতৈষিণীর প্রচার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩০০,২৫০,৩৫০ এবং ৩০০ কপি।
এটি সর্বজনবিদিত যে, সমাজ-সভ্যতার ক্রম বিকাশের ধারায় অতীতের যে কোন উৎপাদন ব্যবস্থার তুলনায় আধুনিক পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়নের যুগে সমাজের সার্বিক পরিবর্তনে গণমাধ্যমের বিশাল ইতিবাচক ভূমিকা নিঃসন্দেহে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। ভিন্ন আঙ্গিক ও প্রেক্ষাপটে স্বরূপ প্রকাশের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক কালে অবাধ তথ্য প্রবাহের ক্ষেত্রে এর বহু মাত্রিকতা গুরুত্ব সহকারে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এই যুগ সন্ধিক্ষণে গণমাধ্যম বিশেষ করে সংবাদপত্রের প্রচার ও প্রসারে বিষয়বস্তু নির্বাচন, প্রযুুক্তিগত কৌশল, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য, বিপণন ব্যবস্থা সকল কিছুই উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। সকল সমাজ পরিক্রমায় প্রচলিত ধারণা যে, সাধারণ মানুষের তেমন উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন নেই বললেই চলে। প্রকৃত বিনোদনবিহীন দুঃখ-দুর্দশা, বিলাপ-ক্রন্দন, হতাশা ইত্যাদি নিত্যকার জীবনের সঙ্গী।
পাশ্চাত্যের অনুকরণে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তশ্রেণী নিজেদের নানাবিধ বিনোদন বলয় তৈরি করলেও সৃজনশীলতা, মননশীলতা, যুক্তিশীলতা, মানবিকতা ইত্যাদি বিষয়গুলো বরাবরই থেকে গেছে জ্ঞান নির্ভরতার বিপরীতে। অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মযজ্ঞ ধর্মাশ্রিত হলেও ধার্মিকতার পরিবর্তে ধর্মান্ধতাই প্রাধান্য লাভ করেছে। মানুষের প্রতি ভালবাসা, শ্রদ্ধা বা মানবকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থেই ধার্মিকতার সাবলীল ও সুন্দর মানস গঠনের ব্যত্যয় ঘটেছে। মূলতঃ বর্তমানে মিডিয়া যুগে (গবফরধ ঊৎধ) সুবিধাভোগীগোষ্ঠীর অনুকূলে সংবাদপত্রের ভূমিকাই যেন মুখ্য হয়ে গেছে।
উল্লেখিত প্রসঙ্গে বিখ্যাত যোগাযোগ বিজ্ঞানী উইলিয়াম গর্ডন বলেন, পাবলো পিকাসোর চাইতে বড় মাপের চিত্র শিল্পী হয়েও ওলফগ্যান্‌গ মজার্র্ট (ডড়ষভমধহম গড়ুধৎঃ) শিল্পবিপ্লব বা আধুনিক গণমাধ্যম প্রসার যুগের পূর্বে জন্মেছিলেন বলেই অতি কষ্টে তাঁকে জীবনধারণ করতে হয়েছিল, অথচ প্রচার যুগের বিশেষত্বের কারণে পিকাসো খ্যাতি লাভ করে একটি মাত্র ‘স্থির জীবন-চিত্র’র বিনিময়ে ফ্রান্সের দক্ষিণে একটি বাড়ি কিনতে সক্ষম হয়েছিলেন। এদেশের এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী, সুলতান বা কিবরিয়া স্যারের কথা উল্লেখ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক ডিসেম্বর ২০০২ প্রকাশিত ‘পরিসংখ্যান পকেট বই ২০০১’ মতে ১৯৯৭ সালে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ছিল ২১৬ যার বিপরীতে সার্কুলেশন সংখ্যা ছিল ২৩,৭৭,০০০। ১৯৯৮ সালে সংখ্যাটি বেড়ে ২২১ হলেও ১৯৯৯ সালে ২১৭ তে নেমে আসে। ১৯৯৮ সালে দৈনিক পত্রিকা সমূহের প্রচারণা সংখ্যা ২৫,৩৯,০০০ যা ১৯৯৯ তে ২৬,৩২,০০০ দাড়াঁয়। উল্লেখ্য যে, ১৯৯৭ সালে ২১৬ টি পত্রিকার মধ্যে ২০০টি বাংলা এবং ১৬টি মাত্র ছিল ইংরেজি পত্রিকা যা ১৯৯৮ সালে বাংলা পত্রিকার ক্ষেত্রে ২০৫ ও ১৯৯৯ সালে ছিল ২০১।
১৯৯৯ সালে বাংলা পত্রিকার প্রচারণার সংখ্যা ছিল ২৪,৬১,০০০ এবং ইংরেজি পত্রিকার প্রচারণার সংখ্যা ১,৯১,০০০ অর্থাৎ সর্বমোট প্রচারণার সংখ্যা ছিল ২৬,৫২,০০০, যা তখনকার বাংলাদেশের সরকারি হিসেব মতে মোট জনসংখ্যার ২.১৫ শতাংশ মাত্র। বিভিন্ন সূত্রমতে বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় সহস্রাধিক পত্রিকা প্রকাশ পাচ্ছে। রাজধানী কেন্দ্রিক প্রথম সারির পত্রিকাগুলোসহ চট্টগ্রামে প্রকাশিত আজাদী, পূর্বকোণ, বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ, সুপ্রভাত বাংলাদেশ, পূর্বদেশ দেশের বৃহত্তর জনগণের আশানুযায়ী দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক সংবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনোদন, রাজনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য ইত্যাদির প্রচার নিত্য নৈমিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে।
ইতোমধ্যে ভিন্নমাত্রিকতা পেয়েছে অগণিত প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক সম্প্রচার মাধ্যমের প্রচার ও প্রকাশ, বিভিন্ন ঈধনষব ঘবঃড়িৎশ, ঊষবপঃৎড়হরপ গবফরধ, অঁফরড়-ঠরফবড়, ঙহষরহব পত্রিকা, ফেইসবুক, সামাজিক যোগাযোগ যা অধিকাংশক্ষেত্রে ইতিবাচক ব্যবহারের পরিবর্তে অপব্যবহার বা অধিক ব্যবহারের ফলে বিশেষ করে তরুণ সমাজকে যে প্রভাবিত করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ এবং মিথ্যা সংবাদ/চিত্র/পোর্টাল প্রচারের মাধ্যমে একদিকে সমাজকে করছে কুলষিত অন্যদিকে যুব সমাজকে সৃজনশীলতার বিপরীত স্রোতে কোন অপ-আসক্তি বা অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছে কিনা, তার গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা অত্যধিক প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। দেশের সভ্য, সৎ ও যোগ্য মানুষের এক ধরণের চরিত্র হরণ যেন অন্ধকারের অপসাংবাদিকতাকে জনগণের কাছে বিশাল প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এদিকে সংবাদপত্রের মালিক ও সকল কুশীলবকে অধিকতর যত্নবান হওয়ার আহবান জানাই।
দৈনিক আজাদী শহর, নগর ও গ্রামীণ জনপদের সকল ধরনের সংবাদ, বিজ্ঞাপন, সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, খেলাধুলা, শিক্ষা-সংস্কৃতি-সাহিত্য, নৃত্য, বিতর্ক, গান, আবৃতি বিশেষ করে শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান, গবেষণা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ইত্যকার বিষয়গুলোকে গুরুত্বসহকারে প্রচার করে থাকে। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, অঞ্চল, গোত্র নির্বিশেষে আজাদীর পরিবেশনা অসাধারণ। রুচিশীল কৃষ্টি, ঐতিহ্য, চারুশিল্প, চলচ্চিত্রের প্রকাশ ও বিনোদন প্রকাশের দৃষ্টিভঙ্গীও অনবদ্য।
চমৎকারভাবে সুপঠিত এবং সুলিখিত শুধু কালো কালির মধ্যে নয় প্রিয় সংবাদ কর্মী ও সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধকার, প্রতিবেদকের লেখনিতে এই পত্রিকার সত্যনিষ্ঠতার পরিচয় পাওয়া যায়। দৈনিক সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে সমসাময়িক, সাধারণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, বিভিন্ন অপরাধমূলক, সামাজিক, সাংগঠনিক সংবাদ সহ ইত্যাদি সংবাদসমূহ বিশেষভাবে বিবেচিত। মাসব্যাপী আনুমানিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পত্রিকায় নিয়মিত সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় ছাড়া উল্লেখযোগ্য সমসাময়িক সংবাদ, সাধারণ সংবাদ, রাজনৈতিক সংবাদ, অপরাধমূলক সংবাদ, সামাজিক সংবাদ, সাংগঠনিক সংবাদ, বিশেষ সংবাদ, আন্তর্জাতিক সংবাদ, দুর্ঘটনাজনিত সংবাদ, খেলাধুলা এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক নিয়মিত পরিবেশন করেছে। আমি দৈনিক আজাদীর সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করছি।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x