দৈনিক আজাদী অনুসরণ করেছে নিরপেক্ষ ইতিবাচক ভূমিকা

বৃহস্পতিবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ
36

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদী। ১৯৬০ সালের এই দিনে অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বর এটির আত্মপ্রকাশ। আজাদী চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সংবাদপত্র। সুদীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত চট্টগ্রামের দুঃখ-হাহাকার-সংকট আর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে ধরতে এটি পরিণত হয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসার মুখপত্রে। চট্টগ্রামের জনমানুষের কথা বলার জন্য- সর্বোপরি বঞ্চিত ও অবহেলিত জনপদের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য নিয়ে ৫৯ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল দৈনিক আজাদী। আজাদী আজ শুধু একটি সংবাদপত্রই নয়, এটি এখন চট্টগ্রামের আয়না হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আজ সেই প্রিয় আজাদী পদার্পণ করলো ৬০ বছরে। এ উপলক্ষে দৈনিক আজাদীর পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, হকার ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই কৃতজ্ঞতা।
আজাদী সম্পর্কে পাঠকদের ধারণা চমৎকার। তাঁরা বলেন, আজাদী মানে সূর্যোদয়। সূর্যোদয় যেমন দিনের সূচনা করে চারদিকে আলো ছড়িয়ে দেয়। তেমন শত শত লেখকের লেখনি লিপিবদ্ধ করে আজাদী ছড়িয়ে দিচ্ছে জ্ঞানের আলো চারদিকে। আলোকিত করছে আমাদের চারদিক। অনুপ্রাণিত করছে লেখকদের। কাল যাদের কেউ চিনতো না , আজাদীর কল্যাণে আজ তাঁদের অনেকে ঘরে ঘরে পরিচিত। আজাদী প্রতিদিন লেখক সৃষ্টি করে চলেছে। আজ যে কুঁড়ি, কাল সে ফুল হয়ে প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ছড়িয়ে দিতে পারছে তার সুবাস এই পত্রিকার মাধ্যমে। এত অস্থিরতার মাঝেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সুস্থ মনন চর্চা।
আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আবদুল খালেক হলেন বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রথম মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার, যিনি নিজের উজ্জ্বল পেশা ছেড়ে লাইব্রেরি, প্রেস ও পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন পশ্চাদপদ মুসলিম সমাজকে শিক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচিত একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি তিনি ছেপেছিলেন অসীম সাহসিকতায়। বায়ান্নের ২২ ফেব্রুয়ারি রাতেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসে শুরু হয়ে যায় কবিতাটি প্রকাশের কার্যক্রম। গভীর রাতে কম্পোজ ও প্রুফের কাজ যখন সমাপ্ত প্রায়, তখন সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী হঠাৎ হামলা শুরু করে প্রেসে। কিন্তু প্রেস কর্মচারীরা অতীব দ্রুততায় সম্পূর্ণ কম্পোজ ম্যাটার এমনভাবে লুকিয়ে ফেলে যে, তন্ন তন্ন করে খোঁজাখুঁজির পরও পুলিশ তার খোঁজ পায়নি। ফলে ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’-র প্রকাশনার কাজ শেষ করা যায়। পরদিন তেইশে ফেব্রুয়ারি তারিখে লালদীঘি প্রতিবাদ সভায় কবিতাটি পাঠের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। পাক-সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারকে গ্রেফতার করতে এলে প্রেস ম্যানেজার দবির আহমদ চৌধুরী নিজ কাঁধে ছাপার দায়িত্ব তুলে নেন। তাই গ্রেফতার করা হয় প্রেস ম্যানেজার দবিরকে। অবশ্য পরে তাঁর জামিন দেয়া হয়েছিল। ভাষা ও দেশ মাতৃকার সেবায় নিবেদিত ব্যক্তিত্ব আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার পরবর্তী সময়ে আজাদী প্রকাশে ব্রত হন। আজ থেকে ৬০ বছর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ সালে সেই স্বপ্নের আজাদী আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এর আগে অবশ্য তিনি কোহিনূর নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। আজাদী প্রকাশের দুই বছরের মাথায় ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। এই সময় অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আমৃত্যু কাজ করে যান। ষাটের দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যত আন্দোলন সংগ্রাম- সবকিছুর সঙ্গে দৈনিক আজাদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। আমাদের পরম আনন্দের বিষয়, আজাদী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক। কেননা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় লাভের পর ১৭ ডিসেম্বর প্রথম প্রকাশিত হয় দৈনিক আজাদী। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটকে ধন্যবাদ জানাই- তাঁরা আমাদের এই স্বীকৃতিটা দিতে কার্পণ্য করেননি।
দৈনিক আজাদী দীর্ঘ পরিক্রমায় অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়েছে। জন্মলগ্ন থেকে আজাদী বৃহত্তর চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের কথা বলেছে। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আজাদী একটি আবেগ ও অনুভূতির নাম। এটি চট্টগ্রামের গণমানুষের হৃদয়ের স্পন্দন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চট্টগ্রামের তথা বাংলাদেশের গণমানুষের সংবাদ প্রকাশের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত। দৈনিক আজাদী দৃঢ়, আপসহীন সংবাদ পরিবেশন করে নির্দলীয়, এই বৈশিষ্ট্যের কারণে দৈনিক আজাদী আজ সবার কাছে লক্ষ্যণীয়।
আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটা আরো বেশি দৃঢ় ও মজবুত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের আস্থার জায়গায় আমরা আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো-আজাদীর ৬০ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে এটাই আমাদের অঙ্গীকার। দলমতের ক্ষেত্রে আজাদী অনুসরণ করেছে নিরপেক্ষ ইতিবাচক ভূমিকা। আর এ জন্য দলমত নির্বিশেষে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে আজাদী। এই পাঠক সমাজই আজাদীকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই সুধী পাঠকদের কাছে আমাদের ঋণ চিরদিনের।

x