দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান

রবিবার , ২৫ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ
23

বিশ্বাসে মিলায় শান্তি
বন্ড মিয়া এসে গাড়িতে সুটকেস তোলার কাজে লেগে পড়ায়, দ্রুত ওর জন্য জায়গা করে দিয়ে সরে পড়লাম। এর প্রথম কারণ হলো এক কাজে দশ জন হাত লাগালে নাকি, আমাদের দেশে ভগবানেরও ভূত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না বলে জানি , কিন্তু এই চীন দেশের মাটিতে , দুই চায়নিজ আর এক বাঙ্গাল মিলে , কটা ব্যাগ তুলতে গেলে, এখানকার মাও সেতুং বা কনফুসিয়াসের কি অবস্থা হয় তা তো জানি না। আর যা জানি না, তা নিয়ে অকারণ বাড়াবাড়ি করা তো ঠিক না। এ তো হলো ব্যাপারটার দার্শনিক কারণ। আর এর প্রায়োগিক কারণ হলো গাড়ির পেছনে রাখা ব্যাগ টানার হোটেলের ট্রলি, আর গাড়ির মাঝখানের স্বল্প পরিসর জায়গায় দাঁড়িয়ে তিন জনে ধাক্কাধাক্কি করে ব্যাগ সুটকেস তুলতে গিয়ে কখন কার পায়ে বা গায়ে কোন একটা বোমা সুটকেস পড়ে , এয়ারপোর্ট যাত্রা বাতিল করে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য আবার এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয় , তার তো ঠিক ঠিকানা নেই । অতএব ওদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে , নিরাপদ দুরত্বের দাঁড়িয়ে, এক এক করে ব্যাগগুলো তোলার সময় গুনতেও থাকলাম , কারণ সাবধানের মার নাই। আমি চাই না হারাধনের দশটি ছেলের কাহিনীর উল্টা হিসাবের মতো ভ্রমণের নানান পর্যায়ে ব্যাগ সুটকেস বাড়লে বাড়ুক , কিন্তু খোয়া যেতে পারবে না একটিও।
ব্যাগ তোলা শেষ হতেই বন্ড মিয়া গাড়ির পেছনের ডালা বন্ধ করে , রওয়ানা করলো সামনের দিকে মানে তার ড্রাইভিং সিটের দিকে। অনুসরণ করলাম আমিও তাকে । কারণ আমি তো ছিলাম তারই সহসিটযাত্রী গতকাল সারাদিন, মানে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটটাই তো বরাদ্দ ছিল আমার জন্য গতকাল, আজো তার ব্যাত্যয় হবে কেন?
ড্রাইভিং সিটে গিয়ে উঠে বসার আগে, কেতা মাফিক বন্ড মিয়া সসম্মানে আমার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকলো। সহাস্যে ওকে ধন্যবাদ দিয়ে , গাড়িতে উঠার উপক্রম করতেই, পেছনের সিট থেকে লাজুর গলা ভেসে এলো
“সব ব্যাগ ঠিকঠাক মতো উঠিয়েছ তো ?”
সিটে উঠে বসতে বসতে বললাম , তাই তো মনে হয়। আচ্ছা বলতো মোট ব্যাগ আর সুটকেস মিলে মোট কটা লাগেজ আমাদের?
“তা তো গুনি নাই , আর গোনার দরকারই কি , দেখলেই তো বোঝা যায় সব এলো কিনা; ব্যাগ সুটকেস গুলোর রং তো আলাদা আলাদা “ জবাব লাজুর
বুঝলাম অকারণ তর্ক করে লাভ নাই । পৃথিবীর কোন স্বামী আজ পর্যন্ত কোনদিন, স্ত্রীর সাথে তর্কে জিতেছে বলে শুনিনি এখনো। স্ত্রী’র সাথে তর্কে নয়, বিশ্বাসে মিলায় শান্তি, এ কথাকে শিরোধার্য্য করে বললাম , হু , ঠিকই বলেছ।
“তার মানে কি, সব উঠেছে তো “?
হ্যাঁ বললাম তো উঠেছে সব।
“আচ্ছা টিপস দিয়েছ কি, ঐ লোকটাকে, যে রুম থেকে আমাদের ব্যাগ সুটকেস গুলো সব বয়ে নিয়ে আসলো এ গাড়ি পর্যন্ত “? জিজ্ঞেস করলো লাজু
স্বীকার করতেই হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এটি। কারণ এই রিসোর্টটি তাদের একটি অনিচ্ছাকৃত যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য যে রকম তিন তিন বার আক্কেল সেলামি দিল, তাতে তো আমারো উচিৎ ভাল সেবার জন্য এদেরকে টিপস দিয়ে পুরষ্কৃত করা। অথচ আমি তা বেমালুম ভুলে গেছি!
অতএব দ্রুতই,“হ্যালো, হ্যালো” বলে তড়িঘড়ি করে সেই বেল বয়কে ডাকতে শুরু করলাম , যে নাকি ততক্ষণে যাত্রা শুরু করেছে কন্সিয়ার ডেস্কের দিকে।
চমকে অনিশ্চিতভাবে ফিরে তাকালো বেল বয়, ঐ শব্দের উৎসের দিকে , মানে গাড়িতে বসে থাকা আমার দিকে। আমিই যে তাকে ডেকেছি তা নিশ্চিত করার জন্য ততক্ষণে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে , হাত দিয়ে ইশারা করলাম আসার জন্য। এ ফাঁকে দ্রুত কোমরে বাঁধা ছোট্ট ট্রাভেল ব্যাগে রাখা মানিব্যাগ টি আলগোছে ফাঁক করে, ওটির খুচরা নোট রাখার অংশে দুটো দশ রেন মেন বির নোট দেখেই , দুটোই টেনে নিয়ে রাখলাম হাতের মুঠোতে, যাতে সে এলেই তার হাতে গুঁজে দিতে পারি টাকাটা আলগোছে। যাকে টিপস দেবো তার সামনে মানি ব্যাগ খুলে টাকা খোঁজার ব্যাপারটা , কেন জানি মোটেই ভাল লাগে না নিজের। আর যদি কাউকে ওটা করতে দেখি তবে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু ঠেকে আমার কাছে।
এদিকে যাকে ডাকছি, ব্যাপার সে কিছু আঁচ করতে পেরেছে বলে মনে হলো না ; কারণ চেহারায় তখনো সে অনিশ্চিতভাব নিয়ে প্রথমে কিছুটা সামনের দিকে এগুলেও , পরক্ষনেই এগুনো বাদ দিয়ে থমকে দাঁড়িয়েই থাকলো, ঐ জায়গায় । তার চেহারায় যে ভাবটি দেখছি তা যে অনিশ্চিত ভাব , তা আমি নিশ্চিত বলতে পারি না, কারণ চায়নিজদের ফেস রিডিং আমি করতে পারি ,বা এ ক’দিনে শিখে গেছি তা, সে দাবি করতে পারি না । যখন স্ব চায়নিজদের চেহারাই আমার কাছে এখনো একই মনে হয়। তারপরও কেন জানি ধরে নিলাম ওরা চেহারার ভাবটা বাঙালিরর চেহারার অনিশ্চিত ভাবই হবে।
অতএব দরজা গাড়ির দরজা খুলে নিজেই নেমে তার দিকে হাঁটা শুরু করলাম । তাতেই টনক নড়ল তারও; অতএব যন্ত্রচালিতের মতো সেও হাঁটা শুরু করলো আমার দিকে।
এদিকে মাথায় দ্রুত চিন্তা চলছে, কতো টিপস দেয়া উচিৎ তাকে। আমি তো মুঠোতে ২০ রেন মেন বি দেয়ার জন্য রেখেছি, ওটা কি যথেষ্ট? নাকি আদৌ টিপস দেয়া ঠিক না এখানে। কারণ চায়না তো নামে আর সরকারি কাগজে কলমে এখনো সমাজতান্ত্রিক, কে জানে টিপস কে এরা এখনো হয়তো ঘুষেরই নামান্তর মনে করে!
দু’জন দুজনের দিকে এগুতে থাকায়, মাঝামাঝি একটা জায়গায় দুজন মুখোমুখি হতেই, ওকে ধন্যবাদ বলে ডান হাতে রাখা নোট দুটো এগিয়ে দিতেই , হাসি মুখে কিছুটা দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে নোট দুটো হাতে নিয়ে, আমার দিকে তাকাতেই, ওর পিঠ চাপড়ে আবারো ধন্যবাদ দিয়ে ফিরতি হাঁটা শুরু করলাম গাড়ির দিকে।
আচ্ছা টিপস যে দিলাম, সেটা কি ঠিক আছে? টিপসের ব্যাপারে দেশে আমার ভুল বা দ্বিধা, কোনটাই হয় না। কিন্তু বিদেশে এলে এ নিয়ে কোন ভুল হয়ে যাচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে থাকি বিষম দ্বিধায় , যার কারণে ভুল হয়ে যায় প্রায়ই। আবার কোন কোন সময় দ্বিধান্বিত আমি ব্যাপারটা পুরোপুরি এড়িয়েই যাই আর আজো যে ,ওকে টিপস দেয়ার কথা ভুলে গিয়ে গাড়িতে উঠে পড়েছিলাম , সেটাও কি আমার অবচেতন মনে জাকিয়ে বসে থাকা সেই দ্বিধার কারণেই হলো কি না , সেটাই বা অস্বীকার করি কিভাবে? আর এই যে দ্বিধাটার কথা বলছি , সে দ্বিধাটা হলো কোন দেশে কি রকম টিপস দিতে হয়, তা জানা না থাকার দ্বিধা। এছাড়া দেশে দেশে টিপস সংস্কৃতিও ভিন্ন।
যার মধ্যে উপমহাদেশের বাইরে শুধু দুটো দেশের ব্যাপারে নিশ্চিত আমি। তার একটি হল সিঙ্গাপুর, আরেকটি আমেরিকা। সিঙ্গাপুরে টিপস দেয়ার কোন বাধ্য বাধকতা নেই। আর আমেরিকার এটা শুধু বাধ্যবাধতাই নয়, বরং কোন জায়গায় কত টিপস দিতে হবে তার একটা অলিখিত রেইট ও আছে। আমেরিকার যে কোন সার্ভিসই হল টিপস নির্ভর। শুনেছি যে, রেইট মোতাবেক টিপস না দিলে, আমেরিকায় পড়তে হয় অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে। টিপস নিয়ে এতসব ভজঘট তথ্য জানা থাকায়, অনেক সময়ই টিপস দেয়ার কথা মনে থাকলেও, অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ার ভয়ে দিই না তা।
সে যাক, এখন টিপস নেয়ার সময়ের এই হোটেলের বেল বয়ের দ্বিধান্বিত চেহারায় , প্রথমত মনে হলো টিপস দেয়াটা সম্ভবত এখানে রেয়াজ হয়ে ওঠেনি এখনো ; আর পরবর্তীতে ওর হাসিমুখ দেখে মনে হলো যে, নাহ ওতে সে নামে হলেও সমাজতান্ত্রিক দেশে, সে নিজে ঘুষ নেবার অভিযোগে আর আমি ঘুষ দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হবো না। টিপস বিষয়ক এসব চিন্তার ফাঁকে ততক্ষণে ফের উঠে গিয়ে বসলাম বন্ড মিয়ার পাশের সিটে।
দ্বিতীয়বারের মতো গাড়িতে উঠে বসতেই, বন্ড মিয়ার গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে, হোটেলের গাড়ির ড্রাইভার, নাহ ধরনের হোটেলের গাড়ি চালকদের ড্রাইভার বলা ঠিক না, শোফার বলা উচিৎ। কারণ এতে হোটেলের গাড়িচলাকদের কোন সমস্যা হয় কিনা জানি তবে হোটেলের মান থাকে না। সে যাক, যা বলছিলাম গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে, এ ধরনের হোটেলের শোফাররা কেতা মাফিক যা করে থাকে, তাই করলো বন্ড মিয়া । মানে উচ্চারন করলো দুটো গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, “পাতপোর্ত, তিকিত”
বন্ড মিয়ার চিংলিশে উচ্চারিত ঐ দুই শব্দ কানে যেতে , আমার অজান্তে আমারই হাত চলে গেল, বিদেশ ভ্রমণের সার্বক্ষণিক সঙ্গী কাধে ঝোলানো ছোট্ট ব্যাগটির দিকে, গাড়ির সিটে বসার কারণে যেটি নাকি এখন আমার কোলে বসে চুপচাপ এক দেড় ঘণ্টার একটা ঘুম দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল । যদিও জানি নিশ্চিত যে, ঐ ব্যাগের সামনের পকেটে আছে আমার পাসপোর্ট আর টিকিট, তারপরও আবারো ওটির চেইন খুলে উঁকি দিয়ে দেখলাম যে, হ্যাঁ আছে দুটোই যথাস্থানে। একই সাথে পেছনের সিটে বসে থাকা লাজু আর হেলেনকে বললাম তারা ও যেন দেখে নেয়, বিদেশভ্রমণের এই দুই অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ আছে কিনা সাথে। এই চেক করে দেখাটা লাজুর জন্য আরো বেশী জরুরি! তার কারণ ওর কাছে , ওর নিজের পাসপোর্ট, টিকিট ছাড়াও আছে দীপ্র আর অভ্রর গুলোও।
পেছন থেকে কথার বদলে খচমচ খসখস শব্দ আসায়, সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থাতেই বেশ কসরত করে ঘাড় ফিরিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ঘটনা কি। দেখলাম লাজু আর হেলেন দুজনেই যুত করে বসার জন্য তাদের হাত ব্যাগ গুলো রেখেছিল গাড়ির মেঝেতে তাদের পায়ের কাছে, যেগুলো কোন কারণে ততক্ষণে ঠাই নিয়েছে কিনা নিশ্চিন্তে ওদের সিটের নীচে; হয়তো আমার ব্যাগটির মতোই ওদের হাত ব্যাগগুলোর সুযোগ মতো একটা ঘুম দেয়ার ইচ্ছা ছিল, কারণ সারাদিন যখন ওগুলোকে হাতে নিয়ে বা কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটাহাঁটি, দৌড়ঝাঁপের ফলে সৃষ্ট নানান মাপের দুলুনির কারণে ঐ বেচারাদের ঘুম তো দূরের কথা নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসৎ থাকে না। অতএব এখানে যখন পাওয়া গেছে ঘুমানোর সুযোগ, তাই তার আলগোছে ঢুকে গিয়েছিল সিটের নীচে, তাদের মালিকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ।
ফলাফল হেলেন আর লাজু সিটে বসা অবস্থায় যতটা পারা যায় মাথা নিচু করে হাত বাড়িয়ে সিটের তলা থেকে টেনে বের করে আনলো যার যার ব্যাগ কলের উপর নিয়ে, দ্রুত ওগুলোর চেইন খুলে ভেতর থেকে পাসপোর্ট আর টিকিটগুলো বের করে হাত উপরে তুলে আমার চোখের সামনে নাড়িয়ে, ওগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করলো। তারপরও লাজু যেহেতু তার নিজেরটা ছাড়াও পুত্রদের পাসপোর্ট টিকিট বহন করছে, আর বারকয়েক নবায়ন করার কারণে যেহেতু ওদের সবারই পাসপোটের্র বইয়ের সংখ্যা একাধিক, যেগুলো আবার একটার সাথে আরেকটাকে পিন মেরে রাখা হয়েছে , তাতে লাজুর একহাতে কায়ক্লেশে জায়গা করে নেয়া পাসপোর্টের বইয়ের বান্ডিল টা দেখে বোঝা মুশকিল ওতে দুজনের পাসপোর্ট আছে নাকি তিন জনের!
তাই অতিরিক্ত সাবধানতা হিসাবে, বললাম, শোন প্রতিটা বান্ডিল আলাদা করে দেখো তো, তিনটা বান্ডিল আছে কিনা তোমাদের তিনজনের। কারণ এখানে আসার পর ইমিগ্রেশন বৈতরণী পার হওয়ার পর তো আর একবারই ওগুলোকে বের করতে হয়েছিল; আর তা হলো হোটেলে আস্তানা গাড়ার সময়। সে রাতে কাঁঠাল বোঝাই হয়ে হোটেলে এসে, নাম লেখানোর সময়তো আমাদের সবারই ছিল তাড়া রুমে যাওয়ার, অতএব যে কোন ভুল হতেই পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

x