দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
31

বেইজিং যাত্রা ও ভারত চায়না সম্পর্ক ভাবনা
টেবিলে দেয়া তথাকথিত, না বলা ভাল তথাভাবিত, ফাও রুটি আর পাঁপড় চিবুতে চিবুতে টুকটাক করে আলোচনা করছিলাম, আমাদের আগামিকালকের বেইজিং যাত্রা নিয়ে । এতে আস্তে আস্তে টেবিলের আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে উঠলো একসময় । লাজু আর হেলেন দুজনেই জিজ্ঞেস করলো, বেইজিংয়ে হোটেলে উঠার পর আমরা কোন ট্যুরে বেরুবো কিনা । বললাম, তা বুঝতে পারছি না বা বলতে পারছি না এখনি। যদিও ঢাকা থেকে দুই আড়াই ঘণ্টায় আমরা চলে এসেছি কানমিং, কানমিং থেকে, বেইজিং এর ফ্লাইং টাইম কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা । তার উপর এয়ারপোর্ট থেকে, হোটেলে যেতেও কতক্ষণ লাগে যে, তারও তো ঠিক ঠিকানা নাই। আর যাবই বা কিভাবে তার একটা খসড়া ধারণা থাকলেও, তা তো নিশ্চিত নয় । তবে কানমিং এয়ারপোর্টে নেমে পাওয়া শিক্ষা থেকে, একটা ব্যাপার ঠিক করেছি যে বেইজিং এয়ারপোর্টে কোন বঙ্গ সন্তানের পাল্লায় পড়ে, বঙ্গ চায়নিজ যৌথ প্রযোজনায় ঠিক করা কোন টেক্সিতে কাঁঠাল বোঝাই হয়ে যাবো না আর । অতএব বুঝতে পারছি না যাবো কিভাবে। আর বেইজিং এ, নিশ্চিত কানমিং এর চেয়ে ট্রাফিক জ্যাম হবে ঢের বেশী, অতএব এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দূরত্ব ৩০-৩৫ মাইল হলেও কতক্ষণ যে লাগবে পৌঁছুতে, তাও তো জানি না। সে জন্য আগামি কালকের জন্য কোন নির্দিষ্ট করে কোন ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করিনি ।
তাহলে বাবা, “হোটেলে পৌঁছানোর পর চল আমরা অ্যাপেল স্টোরে যাই “ বলল দীপ্র-“তুমি তাহলে ঠিক করে রাখনি এসবের কিছুই, তা হলে হবে কিভাবে? ” হতাশ ভঙ্গিতে বলল লাজু এ মাত্র আমার কথায় জড়িয়ে থাকা, আগামিকালকের হোটেলে পর্যন্ত পৌঁছানোর অনিশ্চয়তার কথা শুনে।
সচকিত হয়ে উঠলো আমার ভেতরকার কর্পোরেট ট্রেনিং পাওয়া নেতাটি। মনে পড়লো দলনেতা হিসাবে নেতার দায়িত্ব হল, দলে কনফিডেন্স সৃষ্টি করা । ঘোরতর অনিশ্চিত অবস্থাতেও একটা নিশ্চিন্ত পরিবেশ তৈরি করাই হলো নেতার কাজ। বুঝলাম আমার আলোচনায় ঘটে গেছে তার ব্যত্যয় , নিশ্চয়তার বদলে আমি কিনা তৈরি করে ফেলেছি, বেইজিং গিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে কিভাবে হোটেলে ফিরবো তা নিয়ে সবার মধ্যে না হলেও, লাজু আর হেলেনের মনে অনিশ্চয়তা। দ্রুত এটি ঠিক করা দরকার। অতএব বেশ দৃঢ়তার সাথেই বললাম, ওটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোন কারণ নেই। যেহেতু আমার ট্রাভেল ফাইলটা হাতে নেই এ মুহূর্তে, আর এর মধ্যে আমি, ঐটির বেইজিং অংশটি খুলেও দেখিনি, তাই মনে করতে পারছিলাম না কি লেখা আছে ওতে। কারণ ফাইলটি আমাকে তৈরি করে দিয়েছে, অফিসের আমার সার্বক্ষনিক সহকর্মী সায়মা। ও সব কিছু লিখে দিয়েছে ফাইলে । এছাড়া সে হোটেলের সাথে কথাও বলেছিল ফোনে, এয়ার পোর্ট থেকে আমাদের পিক আপ করার জন্য; কিন্তু হোটেল নাকি বলেছে পিক আপ করার কোন দরকার নেই, কারণ এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বাস সার্ভিস আছে। আর ওতে খরচ ও অনেক কম হবে । অফিস থেকে বেরুবার আগে, সায়মা আমাকে সে সব ব্যাপার আবার বুঝিয়েও বলে দিয়েছে। এমন কি কত নম্বর বাস ধরতে হবে তাও লিখে দিয়েছে। আমি শুধু চিন্তা করছিলাম বাস বাদ দিয়ে, ট্যাক্সিতে গেলে তাড়াতাড়ি যেতে পারবো। কারণ বাস তো চলবে তাদের টাইম টেবিল ধরে। আর ট্যাক্সি ঠিক করতে গিয়ে কানমিং এয়ারপোর্টের অভিজ্ঞতার কারণে ভাবছিলাম, যে বেইজিং ঐটি কিভাবে করতে পারি নির্ঝঞ্ঝাটে।
বাসে গেলে খরচ কম লাগবে, এটাই সম্ভবত মনে ধরলো লাজুর , বেশী। অতএব সে বলল নাহ ট্যাক্সির ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নাই, আমরা বাসেই যাবো।
বুঝলাম অনিশ্চয়তার ভাবটুকু দ্রুতই কাটাতে পেরেছি। হাফ ছাড়লাম তাই, আর মনে মনে শাসন করলাম নিজেকে, আর যাই হোক, এই চায়নায় কোন কারণেই কারো মনে কোন অনিশ্চয়তা তৈরি করা যাবে না আর। এরই মধ্যে দেখি, দুই চায়না কন্যা মিলে আমাদের দেয়া অর্ডারের খাবার সাজিয়ে দিয়েছে টেবিলে । সেদিনের মতো আজো দেখি ধরাচূড়া পড়া শেফ মহাশয়, চায়না কন্যাদের পেছন পেছন বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে হেঁটে আসছেন আমাদের টেবিলের দিকেই। ভাবলাম আগের দিনের”শেফ কবিরই হবেন। কিন্তু ঐ ধরাচূড়ার ফাঁক দিয়ে, মুখের যতোটা দেখা যায় তাতে বুঝলাম, ইনি কবির না। তবে গাত্র বর্ণে শেফ মহাশয়, কবির আর আমারই গাত্র বর্ণেরই লোক । অতএব ধরে নিলাম নির্ঘাত ভারতীয়ই হবেন উনি।
শেফ মহাশয় টেবিলের কাছাকাছি আসতেই হাত তুলে বললাম, হাই-একগাল বিগলিত হাসি দিয়ে চোস্ত ইংরেজিতে উত্তর এলো “ মুম্বাইয়ের নির্মল আমি স্যার, আশা করি দিনটা ভাল কেটেছে আপনাদের “হ্যাঁ হ্যাঁ খুব মজায় কাটিয়েছি দিন। আর এই চায়না মুল্লুকে পা দেয়ার পর থেকে তো মজার কমতি নেই, হাসতে হাসতে বললাম ‘আমাদের হোটেল টা ভাল লেগেছে তো, তা থাকবেন কতদিন আর ?’ নির্মল বাবুর প্রফেশনাল প্রশ্ন এবার । তবে যে ব্যাপারটা ভাল লাগলো তার, তা হলো প্রশ্নটা উনি করেছেন বেশ স্বাভাবিক গলায়, আন্তরিক ভঙ্গিতে । সাধারণত ট্রেনিং প্রাপ্ত লোকেরা এসব প্রশ্ন করে শুধু দায়িত্ব পালনের জন্য যান্ত্রিক ভঙ্গিতে কিম্বা তোতা পাখির মতো মুখস্ত ভঙ্গিতে । ওতে থাকে না, কোন আন্তরিকতা ; তাই বিমান বালাদের মেকি হাসির মতোই ঐ ধরণের শেখানো কথাবার্তা আমার মরমে ঢোকা তো দূরের কথা, কানেই ঢুকে না । নির্মল বাবুর ব্যাপারে তা হল না ।
তবে কি আসলেই নির্মল বাবু সত্যিই আমাদের ব্যাপারে আন্তরিকভাবেই খোঁজ খবর নিচ্ছেন, নাকি তার কথা আমার আন্তরিক মনে হয়েছে , গত কয়েকদিন ধরে এখানকার চিংলিশ শুনে বুঝতে গিয়ে যে ক্রমাগত ধস্তাধস্তি করতে হচ্ছে কানের সাথে মগজের, তাতে এখন মোটামুটি আমার বাংলিশের কাছাকাছি ভারতীয় ইংলিশ শুনে ওটা কানের ভেতর দিয়া মরমে পশিল বলিয়াই, উহা আন্তরিক মনে হইল কিনা, তা জানি না । আর সে বিশ্লেষণে যাওয়ার ফুরসৎ নাই এখন, কারণ তাড়া আছে রুমে ফিরে গিয়ে গোছগাছ করে, যদি লম্বা ঘুম দিতে নাও পারি, অন্তত দরকার বিছানায় শুয়ে একটু ভোর পর্যন্ত গড়াগড়ি দিয়ে শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দেয়ার ।
অতএব হেসে বললাম, তোমাদের এই রিসোর্ট কে ভাল না বলে উপায় আছে নাকি ? চমৎকার পরিবেশ। তবে হোটেলের চেয়ে অন্যান্য জায়গায় ঘোরাঘুরির কারণে পুরো রিসোর্টটা তো ঘুরেই দেখতে পারিনি, আর সে সুযোগও নাই আমাদের আর । কারণ আগামিকাল ভোরে উঠেই আমাদের এয়ারপোর্টে ছুটতে হবে বেইজিংয়ে যাওয়ার ফ্লাইট ধরার জন্য।
সাথে সাথেই নির্মল, “ওহ বুছেছি তোমাদের তো তাহলে তাড়া আছে এখন। ঠিক আছে এনজয় দ্য ফুড। খাবার কেমন হলো যাওয়ার সময়, পারলে বলে যেও । আর ফের কখনো কানমিং এলে, আবারো তোমাদের সাথে দেখা হবে এই হোটেলেই আশা করি “বলেই হাসিমুখে রওয়ানা করলো শেফ বাহাদুর তার কর্মস্থল, রসুই ঘরের দিকে। নির্মল বাবু চলে যেতেই, টেবিলের ছুরি চামচ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম সবাই । কারণ ঐ যে গোছগাছ করে শুয়ে পড়ার তাড়া আছে আমাদের সকলের মাথায়। খেতে খেতে আমি ভাবছি, আচ্ছা এ রেস্টুরেন্টে যে কোন আ লা কার্তে মেনুর অর্ডার করলে, ওয়েটাররা খাবার নিয়ে আসে যখন, তখন কি ঐ খাবার যে তৈরি করেছে সেই শেফের টেবিল পর্যন্ত এসে অতিথিদের খোঁজ খবর নেয়ার নিয়ম আছে নাকি ? না ব্যাপারটা হয় শুধু ভারতীয় খাবারের অর্ডার হলেই । আর তা যদি হয়ই, তবে কেন এরকম নিয়ম করেছে হোটেল কর্তৃপক্ষ ? নাকি ভারতীয় শেফরা যারা এখানে কাজ করছে, তারাই নিজ উদ্যোগে করছে এটি, এ আশায় যে, এতে তাদের এ চায়না মুল্লুকে সুযোগ ঘটে একটু দেশি মানুষের সাথে হিন্দিতে প্রাণ খুলে বাতচিত করার। অতএব ভারতীয় খাবারের অর্ডার পেলেই হয়তো তাদের মনে হয় যে, নিশ্চয়ই কোন ভারতীয় গেস্ট এসেছে হোটেলে।
সেটাই যদি হবে, তবে কি অহরহই এখানে আসে ভারতীয় লোকজন? আর যদি আসেই তবে কি আসেন তারা ব্যবসায়িক কারণে, নাকি বেশীর ভাগ লোকজন আসেন, স্রেফ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে । আচ্ছা কারণ যা ই হোক, ভারতীয়দের কেমন হাঙ্গামা পোহাতে হয় চায়নার ভিসা পাওয়ার জন্য ? ভূ রাজনৈতিক কারণে চায়না আর ভারতের বৈরিতা তো অনেক পুরানো ব্যাপার । অতএব ভারতীয় নাগরিকদের, চায়নার ভিসা পাওয়া তো সহজ হবার কথা নয় । যেমন সহজ নয় ভারতের লোকের পাকিস্তানি ভিসা পাওয়া কিম্বা পাকিস্তানি লোকের ভারতের ভিসা পাওয়ার।
আচ্ছা উপমহাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত লোভ লালসা, আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক কূপমুন্ডকতার সাথে ব্রিট্‌িশ শয়তানি যোগ হয়ে, সেই সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় থেকেই ভারত আর পাকিস্তানের সম্পর্ক হলো সাপে নেউলে, এটা সকলেই জানে । চায়নার সাথে ভারতের প্রায় একই রকম সাপে নেউলে সম্পর্কের পেছনেও কি একই রকম ধর্মীয় কারণ আছে না কি ? কারণ নানান ঐতিহাসিক কারণে, ভারতে বার শতকের পর থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যা কমে কমে তলানিতে ঠেকলেও, চায়নায় কিন্তু তা হয়নি; বরং চায়নায় আজ বসবাস করছে সবচেয়ে বেশী বৌদ্ধ। সুতরাং চায়নার বৌদ্ধরা, ভারতে তাদের ধর্মাবলম্বী জ্ঞাতিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে ভারতকে দোষারোপ করে তার উপর মনে মনে ক্ষুব্ধ থাকতেই পারে, যার ফল হতে পারে তাদের মাঝের আজকের এই ধর ধর মার মার কাট কাট সম্পর্ক।
আবার উল্টোও তো হতে পারতো । ভারত হতে পারতো চায়নার কাছে পবিত্র দেশ। বৌদ্ধ ধর্মটির উৎপত্তি তো ভারতেই। এছাড়াও আমার স্বল্প জ্ঞানে যতটুকু জানি, তাতে জানি যে হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্মের দার্শনিক দিকটাতে তফাৎ খুবই সামান্য। সেদিক থেকে চিন্তা করলে বরং চায়না আর ভারতের সম্পর্ক ভালও হতে পারতো । তবে কি ব্যাপারটা পেছনে আছে অন্যকিছু?
যতটা মনে পড়ে ভারতের সাথে চায়নার ৫০ দশকের শেষ ভাগে বৈরিতা শুরুর কারণটিও ছিল অনেকটা ধর্মীয়, আর তা হলো তিব্বতি দালাই লামাকে ভারতের আশ্রয় দেয়া । আর এ কারণেই কিনা, চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জনক মাও, দার্শনিক দিক থেকে নিজ দেশে যে কোন ধর্মীয় গোঁড়ামি সহ্য না করলেও, পররাস্ট্রনীতিতে বন্ধু বানিয়েছিল গোঁড়া ধর্মীয় উগ্রতার দেশ পাকিস্তানকে, যার মাশুল কিনা আমরা গুনেছিলাম ১৯৭১।
“কোন ডেজার্ট টেজার্ট দেবে নাকি এরা ফ্রি এখন” ? চায়না ভারত উত্তেজনা বিষয়ক গভির চিন্তায় আমার ছেদ টানল হেলেনের প্রশ্ন -“না মনে হয়, প্রতি বেলায় তো আর ফ্রি ডেজার্ট কি আর দেয়” ? বললো লাজু ।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

x