দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান

রবিবার , ৬ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৩:১২ পূর্বাহ্ণ
21

জেসমিন সুগন্ধির খোঁজে : আশে পাশের কাউন্টার গুলোতে চোখ বুলিয়ে কোন পারফিউম দেখতে পেলাম না। এ সব কাউন্টারই দেখছি , ত্বক আর চুলের পরিচর্যা করার নানান ধরনের পণ্যে ঠাসা। প্রত্যেক কাউন্টারের সাথেই আছে আবার একটা করে আধাপর্দা ঘেরা জায়গা যেখানে বিউটিশিয়ানরা ব্যস্ত নানান সম্ভাব্য ক্রেতাদের পরিচর্যায়। দেখি অন্যান্য কাউন্টারগুলো জরীপ করে, ভেবে পা বাড়ালাম ভিন্ন স্টোরটির ভিন্ন অংশের দিকে। আমি নিশ্চিত, পারফিউমের কাউন্টার থাকতেই হবে। কারণ একটু আগে দেখা মিউজিয়ামে এখনাকার জেসমিন ফুলের সৌরভের যত গুণগান সম্পর্কে জানলাম; আর জানলাম যে এই জেসমিন সৌরভ সংগ্রহের জন্য এদিকটায় ফরাসী ব্যবসায়িদের আনাগোনার কথা, সেই শত শত বছর আগে থেকেই , তাতে এখানে নানা পদের জেসমিন পারফিউম থাকারই কথা , অতি অবশ্যই । ভাবতে ভাবতে এগুচ্ছি সামনে, এমন সময় লাজু বলল – “এখানে কি আর কোন কিছু দেখার আছে ? যদি না থাকে তবে চলো হোটেলে ফিরে যাই। অনেক তো ঘোরাফেরা হলো আজ সারাদিন। ক’টা বাজে এখন? আর, হেলেন তুমি কি দেখবে নাকি এখানে আরো কিছু? কিনবে নাকি কিছু । আমার দেখা শেষ, এছাড়া রুমে গিয়ে তো সব গোছগাছ করতে হবে , কাল সকালে তো আমরা বেইজিং যাবো ”
না না আমার কেনার কিছু নাই এখানে। চলো ফিরে যাই হোটেলে আজ। বললো হেলেনও।
ওদের কথায়, আমার পারফিউম খোঁজার যে ইচ্ছেটা মনে মনে ঘুরপাক করছিল, ওটা হজম করে ফেললাম । ভাবলাম , এক এতে অকারণ কিছুটা সময়ক্ষেপণ হবে। দ্বিতীয়ত এখানকার পণ্যের ব্যাপারে আমার যেই নেতিবাচক মন্তব্য ওরা বিনাদ্বিধায় মেনে নিয়েছে আমাকে বিশেষজ্ঞের মর্যাদা দিয়ে, এখন যদি সেই আমি এখনকার পারফিউমগুলো মাখতে থাকি গায়ে, তবে আমার ঐ বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠার মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে। দরকার নাই আর ওটার। তারচেয়ে বরং তাড়াতাড়ি যদি ফিরতে পারি , তবে একবার ঘুরে আসা যাবে চমৎকার ঐ গাংচিল রাজ্য, দিয়াঞ্চি লেইকে। অবশ্য আমার মনের ভেতরে দিয়াঞ্চি লেইকে আবারো যাওয়ার যে খায়েসটি আছে তা, আর রাষ্ট্র করলাম না। কারণ জানি সারাদিনের হাঁটার ক্লান্তিতে ঐ পর্যন্ত আবার হেঁটে যেতে কেউ রাজি হবে না। তার উপর গোছগাছের ব্যাপার তো আছেই। ঠিক করলাম কেউ যদি না যায়, না যাবে। আমি একাই যাব না হয়।
মুখে বললাম, একদম ঠিক বলেছ। আমার মনে হয় না এখানে, শপিং ভিন্ন আর কোন কিছু করার আছে। সবই তো দেখে ফেলেছি আমরা যা দেখার। আর যদি না হয়ে থাকে, তবে আবার একটা চক্কর দিয়ে দেখতে পারি নানান রুম গুলোতে, কোন কিছু বাদ পড়লো কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য । “না না তার আর দরকার নেই” সমস্বরে বলে উঠলো লাজু আর হেলেন।
ঠিক আছে, এখনই বেরুবো আমরা , প্রায় তো সাড়ে পাঁচটা বাজে এখন , এখান থেকে হোটেলে কতদূর কে জানে। আর জ্যাম থাকলে তো পৌঁছুতে আরো দেরি হয়ে যাবে। এখন তো নিশ্চিত এখানকার শহরের রাস্তায় আছে ঢাকা শহরের ছুটির দিনের বিকালের মতো ভীষণ জ্যাম। অতএব দ্রুত এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়াটাই সঠিক সিদ্ধান্ত মনে হলো।
তোমরা দাঁড়াও এখানে, আমি দীপ্র আর অভ্র কে খুঁজে ডেকে নিয়ে আসি, এ বলে সামনে তাকাতেই দেখলাম বিপরীত দিকে বেশ দূরের একটা কাউন্টারে দুই ভাই মনোযোগ দিয়ে যেন কি দেখছে। এখান থেকে গলা উঁচু করে ওদের ডাকাটা ঠিক হবে না। কারণ তা অন্যসব লোকজনদের বিরক্তি উৎপাদন করতে পারে। তাই দ্রুত হাঁটা দিলাম পুত্রদ্বয়ের দিকে , যাওয়ার সময় শুধু লাজু আর হেলেন কে বললাম তারা যেন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওখানেই থাকে। না হয় ফিরে আবার ওদের খুঁজতে অযথা সময় ব্যয় হবে।
দুই পুত্রকে বগল দাবা করে ফিরলাম লাজু আর হেলেনের কাছে ; আবারো বললাম আর কোন রুম টুম ঘুরে দেখতে চায় কিনা ওরা , যাতে কোন কিছু বাদ না পড়ে। কোন কিছু বাদ পড়ে গেলে, আর ওটা পরে জানতে পারলে মনে হবে যে হায় টিকিটের পুরো পয়সা বুঝি উসুল করা হলো না। তাই বললাম ওটা। জবাবে সমস্বরে সবাই বলে উঠলো না , আর দেখতে চায় না কেউ, কিছু । হোটেলে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে একাট্টা সবাই । কোন ব্যাপারেই এরকম একশভাগ সহমত পাওয়া যায় না। যার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেক সময়ই ঝামেলায় পড়তে হয় , কিম্বা কারো না কারো বিরাগভাজন হয়ে নিতে হয় সিদ্ধান্ত। কারণ সিদ্ধান্তহীনতায় কোন কাজই হয় না । এমুহূর্তে এরকম নিরঙ্কুশ সহমত পাওয়ায় বুঝলাম যে আসলেই সবাই খুব ক্লান্ত। আর ভাবলাম আহ, জীবনে যদি এরকম নিরঙ্কুশ সহমত পাওয়া যেত ঘন ঘন ঘরে , কর্মক্ষেত্রে তবে কতই না সহজ হয়ে যেত যাপিত জীবন আমার!
সে যাক সবাইকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে দু তিন দরজায় ধাক্কা খেয়ে অবশেষে পেলাম, বের হওয়ার আসল গেইট । ভুল দরজায় ধাক্কা খেতে খেতে ভাবছিলাম, আচ্ছা বের হওয়ার পর, বন্ড মিয়াকে খুঁজে পাবো কিভাবে ? আসল গেট দিয়ে বের হওয়ার পর সে দুশ্চিন্তায় তো পড়তেই হলো না, বরং আনন্দে ভরে উঠলো মন। দেখলাম বেরুনোর গেটের অদূরে, দেয়ালে ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগে মাথা নিচু করে চোখ মোবাইল স্ক্রিনে রেখে, খেলায় বা এস এম এস করা নিয়ে ব্যস্ত বন্ড মিয়াকে । বুঝলাম এখানকার বের হওয়ার রাস্তা তা হলে একটাই। তাই বন্ড মিয়াকেও আমাদেরকে নেয়ার জন্য কোথায় দাঁড়াতে হবে এ বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিতে , খুব ঝামেলায় পড়তে হয়নি। তার উপর বুদ্ধি করে বন্ড মিয়া দাঁড়িয়ে আছে এমন এক মোক্ষম জায়গায় , যাতে দরজা দিয়ে বের হলে অনায়াসে তাকে চোখে পড়ে । অতএব প্রমাণিত হলো , বন্ড মিয়ার কাণ্ডজ্ঞান ভালই আছে । আশেপাশে সবসময়ই বিস্তর বুদ্ধিমান আর অতিবুদ্ধিমান লোক দেখি ; অথচ বিরল্প্রজ হল সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ । এটা মনে আসতেই বন্ড মিয়ার উপর মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠলো আরো। কারণ যদিও ফোনে তার নম্বর আছে আমার, কিন্তু এখান থেকে বেরিয়ে ওকে না পেলে, ফোনে কিভাবে বোঝাতাম যে আমরা , ঠিক কোথায় আছি ? নিশ্চয় বন্ড মিয়াও ব্যাপারটা এভাবেই ভেবেছে । তাই সে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এরকম একটা মোক্ষম জায়গায়।
বন্ড মিয়ার দিকে সপরিবারে এগুতে এগুতে ভাবলাম, এই মোবাইল আর তার সাথে ইন্টারনেটের যোগসাজশের কারণে যতই বলি না কেন , মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের সাথে এ যেমন সত্য , তেমনি সত্য হলো এব্যাপারটা কিন্তু মানুষের একাকীত্বও কমিয়েছে একই সাথে। কিম্বা আর ভালো করে বললে বলতে হয়, এ আবিষ্কারটি মানুষের, অপেক্ষা করার মতো দীর্ঘ বিরক্তিকর সময়কে, নিজ নিজ উপায়ে উপভোগের ব্যবস্থাও করেছে । একসময় যা নাকি করেছিল অল্প কিছু পড়ুয়া মানুষের জন্য, খবরের কাগজ বা গল্পের বই।
পড়ুয়া মানুষ সব সমাজে, সব সময়ই সম্ভবত কম ছিল । অতএব দীর্ঘ ভ্রমণে বা অপেক্ষার সময়ে অল্প মানুষই বই পড়ে অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর কাটাত। বাকি কিছু লোক, যারা স্বভাবে বহির্মুখি ধরনের, তারা অপেক্ষার সময় কাটাতো পাশে কেউ থাকলে তার সাথে টুকটাক আলাপচারিতায়। আর স্বভাবে যারা আড্ডাবাজ বাঁচাল, তারা অপেক্ষার সময়কে উপভোগ্য করে তোলার জন্য আড্ডা মারত অচেনা লোকের সাথেই। কিন্তু বাদবাকীরা হাঁসফাঁস করতো অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর নিয়ে । আর এখন ? কারো হাতে ফোন থাকলে সে বিড়ম্বনা আজ আর সম্ভবত কারো নেই।
এদিকে বন্ড মিয়ার নিকটবর্তী যতই হচ্ছি, ততই ভাবছি, আহা বেচারা বড় মগ্ন হয়ে কিছু একটা করছে মোবাইলে , এখন আমরা গিয়ে হাজির হতেই নিশ্চয়ই তাতে তাল কেটে যাবে। তাতে সে মনে মনে বিরক্তও হতে পারে । কারণ এখন যদি সে কোন খেলায় মগ্ন থাকে , তাহলে দেখা যাবে যে মুহূর্তে তার মগ্নতা ভাঙ্গলাম , ঐ মুহূর্তেই সে হয়তোবা ঐ খেলাটির কোন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে ঢুকবো ঢুকবো করছে। এখন এটা ভেংগে গেলে হয়তো আবারো তাকে এই স্তরে পৌঁছুতে পৌঁছুতে অন্যদিন আবার দীর্ঘ সময় দিয়ে গভীর মনোযোগে খেলতে হবে। আর যদি সে এখন কারো সাথে প্রেমালাপে মগ্ন থেকে থাকে তবে তো ওটাতে হঠাৎ ছেদ পড়লে মেজাজ নির্ঘাত তিরিক্ষি হয়ে যাবে তার । সেক্ষেত্রে এই মুহূর্তেই তার গাড়িতে রওয়ানা দেওয়া আমাদের জন্য কি খুব বিপদজনক হয়ে যাবে না? ভাবলাম , নাহ সাথে সাথেই রওয়ানা দেবো না । একটু এদিক সেদিক হেঁটে না হয় আবার উঠবো গাড়িতে।
হাঁটাহাঁটির কথা মনে হতে তাকালাম বাইরের খোলা জায়গার দিকে। মেঘ এখনো কাটেনি আকাশে , চলছে বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টিও । তবে ঐ বড় ফোঁটার বৃষ্টিটা একটানা পড়ে যাওয়া ঠাস বুনটের বৃষ্টি নয় । থেকে থেকে , থেমে থেমে একটি ফোঁটা আরেকটি ফোঁটার থেকে অনেক দূরে দূরে পড়ছে। যেমন হয় আর কি আমাদের দেশে অকালের বৃষ্টির সময়। বাইরের দিকেই তাকানোর কারণের জন্যই কি না জানি না ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠলো নাকি, কে জানে ? কারণ হঠাৎই শীত শীত লেগে উঠলো একটু, যা এতোক্ষণ লাগছিল না ঐ ডোমের ভেতর মিউজিয়ামে থাকার সময় । অবশ্য তখন তো বাইরের এই শীতল বাতাসের ঝাপটা তো গায়ে লাগছিল না, যা লাগছে এখন । অতএব বোঝা গেল যে ঐ মেঘলা আবহাওয়া, আর বৃষ্টির ফোঁটা দেখার কারণে শুধু মানসিকভাবেই শীত শীত ভাবটি তৈরি হয় নি । এর যৌক্তিক বস্তুগত কারণও বিদ্যমান। মিউজিয়ামের ভেতর ঘরাঘুরির সময় নিজের অজান্তে জ্যাকেটের সামনের চেইন কখন যে খুলে দিয়েছিলাম , তাতো জানি না ; এখন বাইরের এই শীতল হাওয়ার মুখে পড়ে টেনে দিলাম তা । সাথে সাথে দীপ্র আর অভ্রর জ্যাকেটের চেইনও টেনে দিলাম একটু দাঁড়িয়ে । ভালো করে আবারো চারদিকে নজর ফেলতেই , সন্ধ্যার মেঘের আড়ালের সূর্যের মলিন হয়ে যাওয়া মেঘমাখা আলোতে, মন খারাপ করার মতো একটা ভাবের আবেশ যেন দেখতে পেলাম চারদিকে। অকারণে, আকাশের মেঘ কেন যেন মনেও ঢুকে পড়লো, অতএব বিষন্ন হয়ে উঠলাম ভেতরে ভেতরে।
আশার কথা ততক্ষণে চলে এসেছি আমরা সবাই বন্ড মিয়ার কাছে। মনের বিষণ্‌ণতা কাটানোর জন্য, টেলিফোন স্ক্রিনে গভীর মগ্নতা ডুবে থাকা বন্ড মিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম তার অজান্তেই। হেসে বললাম বন্ড মিয়ে খবর কি ? ভালো তো সব খবর?
আমার গলার আওয়াজ আর বাংলা ভাষার মধুর ছন্দ, এ দুটোর মধ্যে ইতোমধ্যে বন্ড মিয়ার মনের ভেতর কোনটা গেঁথে গিয়েছে জানি না। এ দুটোর কোন একটা যে তার মনে গেঁথে গিয়েছে তা নিশ্চিত। কারণ আমার কথা তার কানে যেতেই , আমাদের দিকে না তাকিয়েই চকিতে মোবাইল থেকে চোখ তুলেই ছাউনির বাইরের দিকে চোখ ফেলে , মুখে এক গাল হাসি ঝুলিয়ে, হাতের ইশারায় আমাদের এখানে অপেক্ষা করতে ইশারা করে বলল “ওয়েত ওয়েত” তারপর ঐ ছাউনির তলা থেকে সে সোজা চলে গেল বড় বড় ফোঁটায়, থেকে থেকে পড়া বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে , সামনের দিকে । বুঝলাম যাচ্ছে সে গাড়ি যেখানে পার্ক করা আছে ঐদিকে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

x