দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা হ্রাস পাচ্ছে, প্রবাহ বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নিক

শুক্রবার , ৩০ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ
57

অর্থনীতিতে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে রেমিট্যান্সের ভূমিকা। ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর পড়তে দেয় নি রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ। প্রবাসীদের আয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায়ও দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছিল। এরপর থেকে দেশের অর্থনীতিতে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে রেমিট্যান্সের ভূমিকা। রফতানির পরই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় বৃহৎ উৎস প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরেও বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) রেমিট্যান্সের অবদান ছিল প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। ১০ বছরের ব্যবধানে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয়ের ৬২ শতাংশের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। গত ১০ বছরে ধারাবাহিকভাবে কমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা প্রায় ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে আমদানি ব্যয় পরিশোধের হিসেবেও সংকুচিত হচ্ছে রেমিট্যান্সের ভূমিকা পত্রিকান্তরে গত ২১ নভেম্বর এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে আরো বলা হয়, রেমিট্যান্সের ক্রম হ্রাসমান এ অবস্থাকে দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোয় জাতীয়তাবাদী চেতনার পুনর্জাগরণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অস্থিরতার কারণে দেশের প্রধান শ্রমবাজারগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। নতুন শ্রমবাজারও তৈরি হচ্ছে না। দক্ষ জনশক্তি রফতানির অভাবও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি টাকার বিপরীতে ডলারের অতি মূল্যায়ন বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে নিরুৎসাহিত করছে প্রবাসীদের। এর প্রভাব পড়ছে রেমিট্যান্স প্রবাহে। অবদান কমছে অর্থনীতিতে।
প্রতি বছর প্রবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় রেমিট্যান্স না বাড়ার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের তরফ থেকে কারণ অনুসন্ধান করে রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য নানা প্রকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি পায় নি। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে দেশের মোট রফতানি আয়ের ৬২ শতাংশের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এটি কমে গিয়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। চলমান পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া না গেলে অর্থাৎ দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানো না গেলে অর্থনীতিতে বাহ্যিক চাপ মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য সরকারের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবেশের ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় নি। অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসীরা স্বজনের কাছে বিদেশ থেকে দ্রুত অর্থ পাঠাতে সক্ষম হচ্ছেন। এ কারণে অর্থ তোলার এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণসহ নানা জটিলতা দূর করা এবং আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠানো সহজ ও গতিশীল করা জরুরি। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া কঠিন হওয়ায় প্রবাসীদের বড় অংশ হুণ্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমানোর দিকটিও সরকারকে ভাবতে হবে ও প্রণোদনা দিতে হবে। অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার কারণে জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচেচ্ছ। বিদেশে এঙচেঞ্জ হাউজগুলোকে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে দক্ষ করে তোলার সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোয় উদ্বুদ্ধ করা দরকার। একই সঙ্গে অর্থপাচার ও হুণ্ডি বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ ফলদায়ক হবে। সর্বোপরি রেমিট্যান্স প্রেরণের অনানুষ্ঠানিক পথের বিপরীতে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং পথকে প্রবাসীদের জন্য ব্যয় সাশ্রয়ী করাটা ছাড়া অন্য কোন পথ নেই। আমরা দেখছি, রেমিট্যান্সের উৎস দেশগুলোয় অর্থনৈতিক মন্দা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্থিরতার জন্যে দেশের প্রধান শ্রমবাজারগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নতুন শ্রমবাজারও তৈরি হচ্ছে না। এছাড়াও রয়েছে দক্ষ জনশক্তি রফতানির অভাব। অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের চেয়ে কম পরিমাণ জনশক্তি পাঠিয়েও অনেক বেশি রেমিট্যান্স আয় করতে সক্ষম হচ্ছে। এদিকে নজর দেওয়া খুবই প্রয়োজন। দেশে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম ও তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে। এদের কাগিররি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলার দিকে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। জনশক্তি রফতানিতে বৈচিত্র্য আনার বিকল্প নেই। হতাশার ব্যাপার হলো, দেশের দক্ষ জনশক্তির বদলে অদক্ষরাই বেশি যাচ্ছেন বিদেশে। তারা অন্যান্য দেশের দক্ষ কর্মীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম হচ্ছেন না। এমনতর পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে জনশক্তি প্রেরণের ক্ষেত্রে আগে তাদের এইসব দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাটাও জরুরি। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের আয়ের বড় ধরনের অংশগ্রহণ রয়েছে। তাই, আমরা চাই রেমিট্যান্স প্রবাহ কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকে সরকার নজর দিক।

x